রহমান বলল——সর্দার, কে ওকে হত্যা করল?
জানি না।
সে কি সর্দার!
হ্যাঁ রহমান, বেচারী আমাকে সাবধান করে দিচ্ছিল-আজ রাতে আমি খুন হবো–
সর্দার।
ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করে হোটেলের ম্যানেজার।
বনহুর তাড়াতাড়ি তাকে নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল বাইরে, ম্যানেজার কিছু বুঝতে পারেনি। তখনকার মত বনহুর নিশ্চিত হল, জিজ্ঞেস করল-হঠাৎ আমার ক্যাবিনে, কি খবর ম্যানেজার সাহেব?
ম্যানেজার একটু আশ্চর্য কণ্ঠে বলল—এদিকে একটা আর্তনাদের শব্দ শোনা গেল, তাই এলাম খবর নিতে।
বনহুর চট করে বলল–না কিছু না! আমার সঙ্গীটার পায়ে চোট পেয়ে কিছুটা কেটে গেছে তাই।
ওঃ একটা স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করে চলে গেল ম্যানেজার।
ফিরে এল বনহুর, রহমানকে লক্ষ্য করে বলল—শিগগির এই লাশ সরিয়ে ফেলতে হবে।
রহমান বলল-কিন্তু কি করে তা সম্ভব সর্দার। হঠাৎ কেউ যদি আবার এসে যায়!
তার পূর্বেই কাজ শেষ করতে হবে।
কিন্তু এখানে থাকাটা কি এখন ভাল হবে সর্দার?
পরে চিন্তা করা যাবে। এস কাজ করা যাক!
বনহুর আর রহমান যুবতীর লাশটা মজবুত করে কম্বলে জড়িয়ে বাথরুমে নিয়ে রাখল। তারপর পানি দিয়ে ক্যাবিনের মেঝেটা ধুয়ে ফেলল পরিষ্কার করে।
গোটা দিনটা কেটে গেল, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। ঝিল শহরের বুকে জ্বলে উঠল অসংখ্য আলোর মেলা। একের পর এক গাড়ি এসে থামতে লাগল জানবাগ হোটেলের সামনে। নানারকমের গাড়ি আর বিচিত্র রকমের মানুষে ভরে উঠল হোটেল জানবাগ।
বনহুরকে রহমান বলল—সর্দার, আজ রাতে এ হোটেল ত্যাগ করতে হবে।
বনহুর বলল–যত সহজ মনে করছ রহমান, তত সহজে এখান থেকে বিদায় নেয়া সম্ভব হবে না।
তাহলে উপায়!
উপায় একটা করতে হবে।
এ খুনের কথা যদি কেউ জেনে ফেলে!
রহমান, তুমি মনে কর এ হত্যার ব্যাপারে হোটেলের কেউ জানে না!
না জানলে খুন হবে কেন, নিশ্চয়ই জানে। তবে এখনও ওরা এ খুন সম্বন্ধে এমন নিশ্চুপ রয়েছে কেন, বুঝতে পারছি না সর্দার।
যুবতীর হত্যারহস্য প্রকাশ পেলে পুলিশের আমদানি হবে এটা এরা চায়। তা ছাড়া নিজেরাই যখন ওকে দুনিয়া থেকে বিদায় দিয়েছে তখন ওদের মাথাব্যাথার কিছু নেই।
তখন ম্যানেজার এসেছিল, সেও তো কিছু বলল না সর্দার।।
সব জেনেই না জানার ভান করল। তুমি কি মনে কর ম্যানেজার যুবতীর হত্যা সম্বন্ধে কিছুই জানে না।
ঐ রকমই তো মনে হল!
ওটা নিছক অভিনয়। চল, দেখা যাক কি হয়!
বনহুর আর রহমান হোটেল কক্ষে প্রবেশ করতেই নজর পড়ল অদূরে উপবিষ্টা পূর্বদিনের সেই যুবতী দু’জনের আরেকজন। চেহারা কেমন যেন বিমর্ষ মলিন, চোখমুখে ফুটে উঠেছে একটা ভয়ার্ত ভাব। সকলের অজ্ঞাতে যুবতী বারবার তাকাচ্ছে বনহুরের দিকে।
বনহুর একবারমাত্র তাকিয়ে যুবতীর দিকে পেছন ফিরে একটা চেয়ার দখল করে নিয়ে বসল। তাকে বাঁচাতে চেয়ে নিরপরাধ একটা জীবন বিনষ্ট হয়েছে। আর নয়, ঐ যথেষ্ট। যুবতী যেটুকু বলে গেছে তাই আত্মরক্ষায় তাকে সতর্ক রাখবে।
বনহুর আসন গ্রহণ করতেই রহমান বনহুরের পেছনে একটি চেয়ারে বসে পড়ল। এদিকে মুখ করে বসলে সর্দারের দৃষ্টির আড়ালে যা ঘটে বা হয়। সেটা দেখতে পাবে সে! সতর্ক দৃষ্টি মেলে চারদিকে লক্ষ্য রাখল সে।
হোটেল কক্ষ নানা ধরনের মানুষে ভরে উঠল।
নারীপুরুষ সবাই এসেছে।
হঠাৎ চমকে উঠল বনহুর, হোটেলকক্ষে প্রবেশ করল একটি বিশাল বপুধারিণী নারীমূর্তি। তেলের পিপে বললে ভুল হবে না।
রহমান মুখে রুমাল চাপা দিয়ে হাসল, সর্দারের দিকে তাকিয়ে দেখল-কিন্তু একি, সর্দারের চোখে একটা তীব্র চাহনি, রহমানও, এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে লাগল মহিলাটিকে।।
অন্যান্য মহিলার মতই তার হাতে একটি ব্যাগ। কিন্তু ভ্যানিটি ব্যাগ নয়, একটা মস্তবড় চামড়ার ব্যাগ।
মহিলাটি হোটেলকক্ষে প্রবেশ করতেই হোটেলের কর্মচারিগণ শশব্যস্তে তাকে অভ্যর্থনা জানাল। ম্যানেজার সোজা গিয়ে মহিলাটির হাত চুম্বন করল।
মহিলা এসবে খুশি হল না তেমন। একবার হোটেলকক্ষের চারদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভেতরের কক্ষে অদৃশ্য হল।
বনহুর পকেট থেকে সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে উঠে দাঁড়াল, এগিয়ে গেল মদের দোকানটার পাশে, বলল ম্যাচটা, পাও তো?
মদের বোতল নিয়ে প্রতীক্ষা করছিল দোকানী, তাড়াতাড়ি পকেট হাতড়ে ম্যাচটা বের করে বাড়িয়ে ধরুল বনহুরের দিকে।
বনহুর ম্যাচটা হাতে নিয়ে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে একমুখ ধোয়া ছাড়ল, তারপর বাঁকা চোখে মদের দোকানীর দিকে তাকিয়ে বলল যে সম্রাজ্ঞী এলেন উনি কে?
দোকানী চাপা গলায় বলল—এই হোটেলের মালিক।
হোটেলের উপযুক্ত মালিকই বটে! বনহুর কথাটা বলে নিজের আসনে গিয়ে বসল।
ততক্ষণে পূর্ব দিনের সেই বিমর্ষমনা যুবতী নাচতে শুরু করেছে।
এদিকে তখন পুরোদমে নাচগান চলছে, হোটেলের প্রত্যেকে নিজ নিজ কাজে মত্ত, ঠিক তখন সকলের অজ্ঞাতে বনহুর, উঠে দাঁড়াল, দ্রুত এগিয়ে চলল সে কক্ষের দিকে, যে কক্ষে একটু পূর্বে ভীমকায় মহিলাটি প্রবেশ করেছে।
বনহুর সেই কক্ষের পাশের কক্ষে প্রবেশ করতেই তার কানে ভেসে এলো হাঁড়ির মত যেন কোন মহিলার কণ্ঠস্বর।
দেয়ালে কান লাগিয়ে দাঁড়াল বনহুর।
পাশের ঘর থেকে শোনা গেল হেঁড়ে গলায় মহিলার সুমিষ্ট ভাষণ-কুমার বাহাদুর জখম হয়েছে, কবে সারবে না সারবে তার জন্য আমি এহক ভাগিয়ে দেব? এমন মেয়েই নয় হেমাঙ্গিনী।
