লোক দুটি বেরিয়ে গেল।
রহমান বলল—সর্দার, ওদের হাবভাব সুবিধের মনে হচ্ছে না।
হেসে বলল বনহুর-আমাদের হাবভাবই বা এত সুবিধের কোথায়! চল দেখা যাক কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়।
সর্দার, যে লোক দুটি এখন এসেছিল ওদের একজনকে আমি কোথাও দেখেছি বলে মনে হল।
বনহুর বলল–হ্যাঁ, তাকে কান্দাই শহরে দেখেছ, নাথুরামের ওখানে।
হ্যাঁ সর্দার, এবার মনে পড়েছে, নাথুরামের সহকারী-গোবিন্দনাথ ওর নাম না?
ঠিক চিনতে পেরেছ রহমান। শোন, এই যে দেশব্যাপী নারীহরণ শিশুহরণ চলছে, এ সবের দলপতি ছিল নাথুরাম। নাথুরামের মৃত্যুর পর কান্দাই এবং বিভিন্ন দেশ থেকে নারীহরণ এবং শিশুহরণের হিড়িক কমে যায়নি, নাথুরামের অভাবে তার সহকারী গোবিন্দনাথ এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বনহুরের কথায় রহমান বিস্ময়ভরা গলায় বলল-সর্দার, এত খোঁজ আপনি পেলেন কোথায়?
রহমান, অচিরেই আমি আরও এমন খবর তোমাকে দেব, যা শুনে এবং দেখে তুমি শুধু বিস্মিত হবে না, স্তব্ধ হয়ে যাবে। আচ্ছা চল, ওরা হয়তো আমাদের জন্য প্রতীক্ষা করছে।
বনহুর আগে আগে চলল, রহমান তাকে অনুসরণ করল।
বনহুর এসে দাঁড়াতেই তাকে আসন করে দিল একটা লোক। বনহুর বসে পড়ল।
রহমান দাঁড়িয়ে রইল একপাশে।
খেলা শুরু হল।
যে দু’টি যুবতী এতক্ষণ অন্যান্য পুরুষকে খেলায় উৎসাহ দিচ্ছিল। তারা এবার সরে এসে বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হায় দাঁড়াল।
বনহুর চেয়ারসমেত আরেকটু সরে বসল।
যুবতী পুনরায় ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল, এবার বনহুরের চেয়ারের হাতলে এসে বসলো যুবতী।
বনহুর তখন খেলায় মেতে উঠল।
অল্পক্ষণেই চূড়ান্তভাবে জিতে গৈল বনহুর। অবশ্য এর পেছেনে ছিল যুবতীদের অদৃশ্য ইংগিত। যদিও যুবতীদ্বয় তাদের দলকে জয়লাভ করার জন্য নিযুক্ত ছিল, কিন্তু আজ যেন তাদের কি হয়ে গেল, বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে তার সর্বনাশ করতে মন তাদের চাইল না।
বনহুর জিতে যেতেই খেলোয়াড়গণের মধ্য থেকে একজন নেতা ধরনের লোক যুবতীদ্বয়কে লক্ষ্য করে বলল—এবার তোমরা যাও।
যুবতীদ্বয় তাদের কথার চাকর, বিনা অনুমতিতে ওখানে থাকতে পারে না, চলে যাবার সময় ওদের প্রথম মেয়েটা বলল—এটা নাচ দেখাব!
রাজী হয়ে গেল লোকটা, অনেকক্ষণ নীরস খেলার মাধ্যমে হাঁপিয়ে উঠছিল ওরা বলল-আচ্ছা, নাচ দেখাও একটা।
যুবতী সঙ্গে সঙ্গে নাচতে আর গাইতে শুরু করলো।
যুবতী সুন্দরী বটে, নাচটাও তার সুন্দর।
বনহুরকে লোকগুলো পুনরায় খেলার জন্য বললো।
যুবতীটি তখন নাচতে নাচতে গান গাইছে। অপূর্ব সুন্দর গানের সুর। মুগ্ধ হল বনহুর, নির্বাক নয়নে তাকিয়ে রইল তার দিকে। ওদিকে লোকগুলো খেলার জন্য বারবার তাকে পীড়াপীড়ি করছে।
যুবতী নাচের মধ্যে ইংগিতে তাকে পুনরায় খেলার জন্য নিষেধ করতে লাগল।
চতুর লোকগুলো যুবত্নীর ইংগিতভরা নাচ বুঝতে পারল, ধমক দিয়ে নাচ থামিয়ে দিয়ে বলল–যাও।
যুবত্রীদ্বয় চলে গেল।
বনহুরও উঠে দাঁড়াল, দু’হাতে টাকাগুলো তুলে পকেটে রাখলো।
অন্যান্য খেলোয়াড় তাকাল তাদের দলপতির মুখের দিকে। হুকুম পেলেই আক্রমণ করবে। কিন্তু দলপতি কি যেন ভেবে তখন নিশ্চুপ থাকার জন্য ইংগিত করল।
বনহুর টাকাগুলো পকেটে রেখে চলে গেল নিজেদের নির্দিষ্ট কামরায়। রহমানও সর্দারকে অনুসরণ করল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই ডোর হয়ে গেল।
সেদিনের মত কোন ঘটনাই ঘটল না হোটেলে।
বনহুর আর রহমান আজ বের হল না শহরে।
বেলা দ্বিপ্রহরের নির্জন ক্যাবিনে বনহুর শুয়ে শুয়ে কিছু ভাবছে। রহমান বাইরে গেছে কোন কারণে।
এমন সময় পূর্বদিনের সেই যুবতী অতি লঘু পদক্ষেপে কক্ষে প্রবেশ করল।
বনহুর ফিরে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হল, কিন্তু মনোভাব গোপন করে বলল—এস।
যুবতী চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল–আপনারা ভদ্রলোক হোটেলে থাকবেন না, এখানে সব সময় বিপদ ঘটতে পারে। আজই চলে যান, দোহাই আপনাদের চলে যান! .
হেসে বলল বনহুর–কেন এত ভয় পাচ্ছ! এ হোটেলে এত ভয়ই বা কিসের!
যুবতী এবার বসে পড়ল, বনহুরের বিছানায়, অতি ঘনিষ্ট হয়ে বসল, তারপর বলল আপনাকে ওরা ভাল নজরে দেখছে না। হোটেলের ম্যানেজার আপনার পেছনে ওদের লেলিয়ে দিয়েছে, ওরা আজ রাতে আপনাকে……
যুবতীর কথা শেষ হল না, একটা তীব্র আর্তনাদ করে উবু হয়ে পড়ে গেল মেঝেতে।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর ধরে ফেলল যুবতীটাকে। রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে তার বুকের বাম পাশটা। একটা পিস্তলের গুলি চলে গেছে যুবতীর বক্ষ ভেদ করে।
যুবতী বনহুরের মুখের দিকে তাকাল, যন্ত্রণায় মুখটা বিকৃত হয়ে উঠল, অতি কষ্টে একটা কথা সে উচ্চারণ করল—আজ রাতে–আপনাকে ওরা–খু–আর বলতে পারল না যুবতী, ঢলে পড়ল বনহুরের হাতের ওপর।
বনহুরের দস্যু প্রাণও ব্যথায় গুমরে কেঁদে উঠল। তারই মঙ্গলের জন্য একটা নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরে গেল।
বনহুর এবার কালবিলম্ব না করে কম্বলটা দিয়ে যুবতীর রক্তাক্ত মৃতদেহটাকে ঢেকে রেখে উঠে দাঁড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করলো রহমান!
রহমানকে দেখে বনহুর স্থির হয়ে দাঁড়াল।
রহমান বনহুরের মুখোভাব লক্ষ্য করে এবং মেঝেতে কম্বল ঢাকা. কিছু দেখতে পেয়ে বিস্মিত হল, চাপাকণ্ঠে বললসর্দার, এর নিচে কি?
বনহুর বলল-কালকের সেই যুবতীর মৃতদেহ। সর্দার! চমকে উঠল রহমান।
বনহুর তখনও নিশ্চুপ, ব্যথায় মনটা তার টনটন করছিল, কণ্ঠ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না।
