কি করব আর আমরা, ঐ বেঁটে লোকটাকে অনুসরণ করলাম। এত সহজে আমরা সেখান থেকে যেতাম না! কিন্তু নারীমূর্তির যে রূপ তাই তাড়াতাড়ি সরে পড়ার জন্য পা বাড়ালাম।
বেঁটে লোকটার সঙ্গে এবার যে কক্ষে প্রবেশ করলাম সে অতি মর্মান্তিক স্থান। সেখানে পৌঁছে দেখতে পেলাম আমাদেরই মত আরও অনেক মেয়েকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। সকলেরই মুখমণ্ডল বিষণ্ণ মলিন। চোখ অশ্রু ছলছল। বুঝতে পারলাম ওদেরকেও আমাদের মতই ধরে আনা হয়েছে।
এবার থামল সুফিয়া, কি যেন ভাবল অনেকক্ষণ ধরে, তারপর বললআর কি বলব ভাইজান, এরপর রোজ রাতে লোক আসে আর বেছে বেছে যে মেয়েকে পছন্দ করে তাকে মূল্য দিয়ে কিনে নিয়ে যায়, ঠিক ছাগল-ভেড়ার মত। আমাকে একদিন….
বিনয় সেন বুলে উঠল-থাক, সব বুঝতে পেয়েছি। দাঁতে দাঁত পিষল বিনয় সেন, দক্ষিণ হাতখানা মুষ্টিবদ্ধ হল; চোখ জ্বলে উঠল ধক্ ধ করে।
সুফিয়া অবাক হয়ে তাকাল তার মুখের দিকে, এক অনাবিল আনন্দে ভরে উঠল তার হৃদয়; নিজের ভাইয়ের পাশে যেন সে বসে রয়েছে।
বিনয় সেন সুফিয়াকে লক্ষ্য করে বলল–সুফিয়া, আমি শপথ করছি, যতদিন আমার বোনদের উদ্ধার করতে না পারব ততদিন আমি নিশ্চিত নই।
আনলৈ অস্ফুটধ্বনি করে উঠল সুফিয়া-ভাইজান। বিনয় সেন সস্নেহে সুফিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
১৩.
দস্যু বনহুরের বজরা।
বজরার একটি কক্ষে দুগ্ধফেননিভ শয্যায় অর্ধশায়িত অবস্থায় দস্যু বনহুর। ললাটে তার গভীর চিন্তারেখা, কুটি কুঞ্চিত করে কিছু ভাবছিল সে। কক্ষে একটা উজ্জ্বল আলো জ্বলছে।
এবার শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল বনহুর, দু’ঠোঁটের ফাঁকে একটা সিগারেট, চেপে ধরে তাতে অগ্নিসংযোগ করল, তারপর পায়চারী শুরু করল বজরার মেঝেতে।…
সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলল বনহুর সিগারেটের ধোয়ার বজরার ক্যারিন ধূমায়িত হয়ে উঠল।
এমন সময় নদীতীরে অশ্বপদশব্দ শোনা গেল। বনহুর, হাতের সিগারেটটা বজরার মেঝেতে নিক্ষেপ করে জুতোর গোড়ালি দিয়ে পিষে ফেলল, তারপর জানালা দিয়ে তাকাল, নদীতীরে।
সেই মুহূর্তে বজৱার কক্ষে প্রবেশ করল রহমান, কুর্ণিশ জানিয়ে বলল—সর্দার, তাজ এসে গেছে।
চল।
বনহুর আর রহমান বজরা থেকে নেমে নদীতীরে এসে দাঁড়াল। আকাশে অসংখ্য তারার মেলা। নিস্তব্ধ প্রকৃতি। বনহুর তাজের পিঠে বসল, রহমানও তার অশ্বে উঠে বসল, ছুটতে শুরু করল অশ্ব দুটি। ., বালুকাময় নদীর বেয়ে বনহুর আর রহমান অশ্বপৃষ্ঠে এগিয়ে চলেছে।
বনহুরের দেহে স্বাভাবিক নাগরিক ড্রেস।
রহমানের শরীরেও তাই। কাল অশ্বপৃষ্ঠে সাদা পোশাক পরিহিত যুবকদ্বয় নগরের দিকে এগিয়ে চলেছে।
ঝিন্দ শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে একটা হোটেল। নাম তার ‘জানবাগ। হোটেলটি দিনের বেলায় আঁকাল না হলেও রাতের বেলা একেবারে গুলজার হয়ে ওঠে। দিনের বেলা জানবাগে কেমন ঝিম ঝিমান ভাব থাকে। আর রাতের বেলা তার উলটো।
গাড়িতে গাড়িতে ভরে ওঠে জানবাগের সম্মুখভাগ। কত রকমের গাড়ি–নতুন পুরো ছোট-বড় হরেক রকমের গাড়ি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। শহরের এবং দেশ-বিদেশের বহু রকমের লোকের হয় আমদানি। সম্রান্ত বংশীয় লোকেরা এদিকে খুব কমই আসে। তবু একেবারে য়ে আসে না তা নয়। মাঝে মাঝে দেখা যায় অতি ভদ্রসন্তানও জনবাগে এসে উপস্থিত হয়েছে।
গভীর রাত।
জানবার্গ হোটেল এখও নিশ্চুপ হয়ে পড়েনি। আলোয় আলোময় গোটা হোটেল। হোটেলে ভেতর থেকে তখনও হাসি-গান আর বোতলের টুনটান শব্দ ভেসে আসছে। তার সঙ্গে ভেসে আসছে জড়িত কুণ্ঠস্বর।
জানবাগের সামনে এসে দাঁড়াল দু’জন অশ্বারোহী।
দস্যু বনহুর আর রহমান। অশ্ব থেকে নেমে সোজাঁ তারা হোটেল জানবাগে প্রবেশ করল।
হোটেলে একপাশে তখন তাস পেটাপেটি চলছে, জুয়া খেলছে লোকগুলো। দুটো যুবতী এত রাতেও জুয়াড়ীদের মনে উৎসাহ জুগিয়ে চলেছে। যুবতীদ্বয় সিগারেট থেকে রাশিকৃত ধূম্রনির্গত করে ছড়িয়ে দিচ্ছিল জুয়াড়ীদের মুখে।
হোটেলের ম্যানেজার একটা চেয়ারে বসে বসে ঝিমুচ্ছিল। দু’ একটা ভদ্রসন্তান এখনও দু’একটা টেবিলে আঁকড়ে বসে আছে। সামনে বিলেতী মদের খালি বোতল আর গ্লাস। হয়তো নেশার মাত্রা বেশি হওয়ায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও বসে রয়েছে। কেউ কেউ জড়িত কণ্ঠে গান ধরেছে।
অপরিচিত যুবকদ্বয়কে হোটেলে প্রবেশ করতে দেখে একটা বয় ম্যানেজারকে বলল—স্যার, নতুন লোক এসেছে।
ম্যানেজার চোখ মেলে তাকিয়ে হাই তুলল. অরপর.আসন ত্যাগ করে এগিয়ে এলকি চাই?
বনহুর বলল—আমরা বিদেশী, এই হোটেলে কয়েক দিন থাকতে চাই।
বেশ থাকবেন। তারপর বয়কে লক্ষ্য করে বলল ম্যানেজারএঁদের ক্যাবিনে নিয়ে যাও।
বনহুর পুনরায় বলে উঠল—আমাদের সংগে দুটো অশ্ব-আছে।
ওঃ আচ্ছা, তাদের জন্য আমি আমাদের ঘোড়াশালে জায়গা করে দেব।
বনহুর আর রহমান বয়ের সংগে তাদের নির্দিষ্ট ক্যাবিনে চলে গেল।
বনহুর ও রহমান চলে যেতেই ম্যানেজার এগিয়ে গেল। যে দলটা গোল টেবিলের পাশে বসে তাস খেলছিল, ফিস ফিস করে তাদেরকে কিছু বলল।
সংগে সংগে দু’জন উঠে দাঁড়াল, যে কক্ষে বনহুর আর রহমান বিশ্রামের আয়োজন করছিল সেই কক্ষে প্রবেশ করে বলল–চর্লিয়ে সাব থোরা খেলোগে?
বনহুর তাকাল লোক দু’টির দিকে, তারপর বলল-বহুৎ আচ্ছা, তুম যাও মায় আতা হুঁ।
