হ্যাঁ কুমার বাহাদুর।
কেন আমি বন্দী জানতে পারি?
রাজার আদেশেই আমি আপনাকে বন্দী করতে এসেছি।
আমার অপরাধ?
অপরাধ বাগানবাড়িতে জল সর্দার নিহত।
ভীল সর্দারের খুনের সঙ্গে আমি জড়িত এ কথা কে বলল তাকে?
শুধু জড়িতই নন আপনিই তাকে হত্যা করেছেন বলে মহারাজ সন্দেহ করছেন।
বুঝেছি!
আপনাকে বন্দী করে কারাগারে নিয়ে যাবার জন্য আদেশ হয়েছে। সেনাপতির ইংগিতে সৈনিকগণ রাজকুমারের হাতে হাত কড়া পরিয়ে দিল।
যদিও রাজকুমারের হাতে হাতকড়া পরাতে সেনাপতির মনে ব্যথা জাগছিল তবু বাধ্য হয়েই’এ কাজ করতে হল।
মঙ্গলসিন্ধ বন্ধী হয়ে আহত সিংহের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। অজ্ঞাত গুলিটাই তার সবকিছু মাটি করে দিয়েছে।
সেনাপতি মঙ্গলসিন্ধকে রাজ কারাগারে বন্দী করে রাখলেন।
১২.
সুন্দর বজরায় সুসজ্জিত একটা কক্ষে, সুফিয়া বসেছিল। অদূরে দাঁড়িয়ে বিনয় সেন, সুফিয়াকে লক্ষ্য করে বলল শোন, এখানেই আমি থাকি, তুমিও এখানেই থাকবে।
কিন্তু….
কিন্তু কি বোন?
আমার বাবা-মার কাছে কোনদিন আর ফিরে যেতে পারব না?
কেন পারবে না, তুমি নিশ্চিত থাক আমি তোমাকে কান্দাইয়ে পৌঁছে দের বোন।
বিনয় সেনের মধুর কণ্ঠস্বরে সুফিয়ার হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ যেন মানুষ নয়-দেবতা!
সুফিয়া বলে—আপনাকে আমি ভাই বলে ডাকব।
বেশ, ডেক!
বসুন ভাইজান আপনি আমার পাশে, সত্যি আপনাকে আমি কি বলে ধন্যবাদ জানাব….
বিনয় সেন সুফিয়ার পাশে বসে পড়লআক, বোন হয়ে বড় ভাইকে ধন্যবাদ জানাতে হবে না।
সুফিয়া আনমনে কিছুক্ষণ বজরার মুক্ত জানালা দিয়ে বাইরে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
বিনয় সেন বলল–কি ভাবছ সুফিয়া?
ভাবছি অসৎসঙ্গে বাস করেও কি করে আপনি এত মহৎপ্রাণ হতে পেরেছেন!
তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছি বলেই যে আমি মহৎপ্রাণ বা উদার ব্যক্তি, এ কথা ভাবা ভুল সুফিয়া। আমি অসৎসঙ্গে বাস করে অসৎব্যক্তিই বনে গেছি, কিন্তু….
না না, ওকথা আমি বিশ্বাস করি না। একটা নারীকে একা অসহায় অবস্থায় পেয়েও যে ব্যক্তি তাকে বোনের সম্মান দিতে পারে সে যে কতবড় উন্নত প্রাণ তা আমার এই ক্ষুদ্র হৃদয়ে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি।
সুফিয়া, তোমার চিন্তাধারা চিরদিন যেন অক্ষয় থাকে। আচ্ছা সুফিয়া, একটা কথা আমি তোমায় জিজ্ঞাসা করব, ঠিক জবাব দেবে?
একটা কেন, হাজার কথা জিজ্ঞাসা করুন ভাইজান, আমি তার জবাব দেব।
আমার হাত জন ফিরে এল তখন নিস্তার কিছু স্মরণ নেই।
আচ্ছা, তোমাকে যারা চুরি করে এনেছিল তারা কে বা কারা এ সম্বন্ধে কিছু আমাকে জানাতে পার?
হাঁ পারি। আমিও সেই কথা আপনাকে বলতে চাচ্ছিলাম। শুনুন ভাইজান, একদিন আমি আমার এক বান্ধবীর বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ি ফিরে আসছিলাম–পথের মধ্যে হঠাৎ কয়েকজন লোক আমাকে আক্রমণ করে, গাড়ির ড্রাইভারকে আহত করে আমাকে নিয়ে পালায়। তারা আমার হাত-পা মুখ এমনভাবে বেঁধে ফেলেছিল যে, আমি অনেক চেষ্টা করেও নিজকে ওদের কবল থ্রেকে রক্ষা করতে পারলাম না। আমাকে একটা ট্যাক্সিতে তুলে নেয়া হল—তারপর আর কিছু স্মরণ নেই আমার! আবার যখন আমার জ্ঞান ফিরে এল তখন নিজেকে একটা নৌকার মধ্যে দেখলাম। আমার হাত পা মজবুত করে বাঁধা রয়েছে। চোখ মেলতেই দেখলাম কয়েকজন ভীষণ চেহারার লোক নৌকার মুখে বসে আছে, লোকগুলো আমাকে দেখে ফিসফিস করে কি যেন বলাবলি করতে লাগল মি পাশ ফিরলাম, সংগে সংগে বিস্ময়ে হতবাক হলাম-আমার পাশেই আরও কয়েকজন মেয়েকে আমারই মত হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে দেখলাম।
বিনয় সেন তন্ময় হয়ে সুফিয়ার কথাগুলো শুনে যাচ্ছিল। চোখ দুটো তার জ্বলে উঠল।
সুফিয়া তখনও বলে চলেছেতারপর আমাদের নৌকা একদিন এই শহরে পৌঁছল। ইতোমধ্যে সবগুলো মেয়েরই জ্ঞান ফিরে এসেছিল। সবাই মাথা কুটে কাদাকাটি করতে লাগল কিন্তু পাষাণহৃদয় লোকগুলোর প্রাণে এতটুকু মায়া হল না। ঘাটে নৌকা পৌঁছানোর পর রাতের অন্ধকারে আমাদের গাড়িতে করে একটা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। তখনও আমাদের হাতগুলো বাঁধা ছিল, পায়ে কোন বাঁধন ছিল না।
বিনয় সেন অস্ফুট কন্ঠে বলল–তারপর?
তারপর আমাদের সবাইকে সেই বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল। রাতের অন্ধকার হলেও আমরা বুঝতে পারলাম শহরের বাইরে কোন পুরোন বাড়ি সেট।।
এখন দেখলে চিনতে পারবে সে বাড়িটা? প্রশ্ন করল বিনয় সেন।
সুফিয়া বলল-না ভাইজান, চিনতে পারব না। কারণ যে অবস্থায় আমি সেই বাড়িতে প্রবেশ করেছিলাম তা ছিল অতি মর্মান্তিক অবস্থা, আমরা সহজে বাড়িটার ভেতরে প্রবেশ করতে চাচ্ছিলাম না, তাই আমাদের কঠিনভাবে যন্ত্রণা দেওয়া হচ্ছিল।
তারপর?
তারপর কি বলব ভাইজান; আমাদের কয়েকজনকে যখন অন্দর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল তখন আমাদের অবস্থা অবর্ণনীয়। কিন্তু যেখানে আমাদের হাজির করা হল সে এক ভয়ংকর স্থান। কথাটা বলে হাঁপাতে লাগল সুফিয়া। একটু থেমে পুনরায় বলতে শুরু করল-দেখলাম আমাদের সামনে একটা বিরাটদেহ নারীমূর্তি, যেন রাক্ষসী—চোখ দুটো তার আগুনের ভাটা। অনেকক্ষণ ধরে দেখল তারপর একগাদা নোট গুণে দিল যারা আমাদের সকলকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের একজন সর্দার গোছের লোকের হাতে। লোকগুলো টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেল। এবার রাক্ষসী নারীমূর্তি আমাদের নিয়ে যাবার জন্য তার একজন অনুচরকে ইংগিত করল। অদূরে একটা অদ্ভুত বেঁটে মোটা লোক দাঁড়িয়েছিল, সে নাকি সুরে বলল-চল তোমরা!
