আপনি ওদের লোক হয়ে….
যাক এখানে বেশি দেরী করা উচিত হবে না, শিগির বাগানবাড়ির দেয়াল টপকে ওপারে পৌঁছতে হবে।
যুবতী হতাশ কণ্ঠে বলল-তাহলে উপায়? আমি তো অত উঁচুতে উঠতে পারব না।
আমি তোমাকে সাহায্য করব–এসো-বিনয় সেন হাঁটু গেড়ে বসল-আমার কাঁধে পা রেখে দেয়ালের উপর উঠে পড়।
যুবতী নীরবে দাঁড়িয়ে রইল, একটা ভদ্রলোকের কাঁধে পা রাখা সম্ভব নয় তার পক্ষে।
বিনয় সেন ব্যস্তকণ্ঠে বলে উঠল–ভাববার সময় নেই বোন, তুমি শিগগির আমার কাঁধে পা রেখে প্রাচীরের উঠে বস।
অজানা-অচেনা একটা যুবকের মুখে মধুর এ বোন সম্বোধন যুবতীর হৃদয়ে. সুধা বর্ষণ করল। অন্ধকারেও যুবতী ভাল করে তাকাল বিনয় সেনের দিকে, তারপর তার কথামত কাজ করল সে।
১১.
বাগানবাড়ির বাইরে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যুবতী। বিনয় সেন জিজ্ঞাসা করল—কোথায় তোমাকে পৌঁছে দিতে হবে?
যুবতী ব্যথারুণ কণ্ঠে বলল–জানি না।
বিনয় সেন বিষ্ময়ভরা গলায় বলল—সেকি, কোথায় যাবে জান না?
না। এদেশে আপনজন আমার কেউ নেই। ওরা আমাকে কান্দাই শহর থেকে ধরে এনেছে। কান্দাইয়ের পুলিশ সুপার মিঃ আহমদের মেয়ে আমি–
বিনয় সেন অস্ফুট কন্ঠে বলে উঠল–পুলিশ সুপার মিঃ আহমদের মেয়ে তুমি!
হ্যাঁ। আমাকে ওরা চুরি করে এনেছে।
আচ্ছা চল আমার সঙ্গে, চিন্তিত হবার কিছু নেই।
আপনি কুমার বাহাদুরের লোক, আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে আপনি যদি বিপদে পড়েন?
সেজন্য তোমার ভাবার কিছুই নেই সুফিয়া, এস আমার সংগে।
বিনয় সেন আর সুফিয়া হেঁটে এগিয়ে চলল।
রাত ভোর হবার পূর্বেই তাদেরকে শহরের বাইরে পৌঁছতে হবে।
ওদিকে রিনয় সেনের সংগে সুফিয়া যখন পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলেছে, তখন রাজপ্রাসাদের বাইরে মহা হৈ চৈ শুরু হয়ে গেছে। ভীল সর্দারেরবেশে রহমান হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছে-খুন–খুন–আমার বন্ধু খুন হয়েছে!
পাহারাদারগণ রহমানকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, রাত ভোর হতে দাও, রাজাকে বলে একটা ব্যবস্থা কর।
অগত্য ভীল সর্দারবেশী রহমান সিংহদ্বারের পাশে বসে রইল।
ভোর হল।
রাজা জয়সিন্ধ রাজদরবারে এসে বসলেন।
প্রথমেই দরবারকক্ষে হাজির হলো ভীল সর্দারবেশী রহমান–মহারাজ, সর্বনাশ হয়েছে, আমার বন্ধু খুন হয়েছে আপনার বাগানবাড়িতে। আমরা ঘুমিয়েছিলাম, সেই সময় কে বা কারা তাকে খুন করে পালিয়েছে!
মহারাজ জয়সিন্ধের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। বিস্ময়ে অস্ফুট ধ্বনি করলেন মহারাজ-আমার অতিথি খুন! এত সাহস কার যে আমাকে এমন একটা অভিসম্পাতের মুখে ফেলল। মহারাজ জয়সিন্ধ ক্ষিপ্তের ন্যায় পায়চারি করতে লাগলেন। তিনি: অতিথিদের সম্মান বুঝতেন, সকলের আগে অতিথি সেবাই ছিল তার প্রধান ধর্ম।
মহারাজা জয়সিন্ধকে অত্যন্ত উত্তেজিত হতে দেখে ভীল সর্দারবেশী রহমান বলে উঠল–মহারাজ, যা হবার হয়েছে। যে গেছে সে আর ফিরে আসবে না। কাজেই আমি আমার বন্ধুর লাশসহ বিদায় চাই।
মহারাজ জয়সিন্ধ কি আর করবেন–মনের ব্যথা মনে চেপে ভীল–সর্দারকে বিদায় দিলেন।
ভীল সর্দার বিদায় গ্রহণ করতেই একজন রাজকর্মচারী রাজ দরবারে প্রবেশ করে কুর্ণিশ জানাল।
মহারাজার মন তখন বিমর্ষ, ভীল সর্দার বিদায় জানিয়ে বিষণ্ণ মনে তার কথা ভাবছেন, রাজকর্মচারীকে জিজ্ঞেস করলেন-কি খবর মোহন্ত?
মোহন্ত বলে উঠলেন মহারাজ, সর্বনাশ হয়েছে; রাজকুমার আহত হয়েছেন!
মহারাজ জয়সিন্ধ অবাক কণ্ঠে বলেন-রাজকুমার আহত হয়েছে।
হ্যাঁ মহারাজ।
জয়সিন্ধ এবার আপন মনেই বলে উঠলেন-ভীল সর্দার নিহত রাজকুমার আহত—এসব কি শুনছি মোহন্ত?
তাই তো দেখছি মহারাজ।
কুমার এখন কোথায়?
তিনি এখন রাজঅন্তঃপুরে।
কি করে সে আহত হল?
মহারাজ, তিনি শিকারে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়েছেন।’
কালই তাকে সন্ধ্যায় আমি দেখেছি, রাতে সে কোথায় শিকারে গিয়েছিল?
মোহন্ত বোবা বনে গেল। তাকে যা শিখিয়ে দিয়েছিল তাই সে বলেছে। হঠাৎ কোন বুদ্ধি তার মাথায় আসছিল না, মহারাজ জয়সিন্ধ ধমক দিলেন-চুপ করে আছ কেন, বল রাতে সে কোথায় গিয়েছিল?
মোহন্ত আমতা আমতা করে জবাব দিল বোধ হয় বাগানবাড়িতে!
হ্যাঁ এবার আমার কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেছে। এবার বুঝতে পেরেছি আমার অতিথি ভীল সর্দারকে বাগানবাড়িতে কে হত্যা করেছে!
না না মহারাজ, কুমার বাহাদুর তাকে হত্যা করেনি। তাকে হত্যা করেনি।
তোমার কোন কথাই শুনতে চাই না, যাও–রাজদরবার থেকে বেরিয়ে যাও। পরক্ষণেই সেনাপতিকে লক্ষ্য করে বললেন রাজা জয়সিন্ধসেনাপতি, এই মুহূর্তে রাজকুমার মঙ্গল সিন্ধকে বন্দী করে কারাগারে আবদ্ধ করুন।
সেনাপতি উঠে বিনীত কণ্ঠে বলেন—মহারাজ, না জেনে কুমার বাহাদুরকে এভাবে
যা বললাম আদেশ পালন করুন। বিচারকালে সব চিন্তা করব।
সেনাপতি রাজাদেশ পালন করার জন্য রাজদরবার ত্যাগ করেন।
কয়েকজন সশস্ত্র, সৈনিকসহ-কুমার মঙ্গলসিন্ধের কক্ষে প্রবেশ করলেন সেনাপতি এবং অসুস্থ কুমারকে শয্যায় শায়িত দেখে বিনীত কণ্ঠে বললেন—কুমার বাহাদুর আপনি বন্দী!
মঙ্গলসিন্ধ পায়ের ব্যথায় কাতর ছিল, সেনাপতিকে সশস্ত্র সৈনিক সহ তার কক্ষে প্রবেশ করতে দেখেই অনুমানে বুঝতে পেরেছিল নিশ্চয়ই কোন বিশেষ কারণে তারা এ কক্ষে প্রবেশ করেছে। সেনাপতির কণ্ঠে অর বন্দী হবার সংবাদ জানতে পেয়ে বিস্ময়ভরা গলায় বলল আমি বন্দী।
