আচ্ছা হুজুর, তাই হবে। কিন্তু কথাটা আগে হেমাঙ্গিনী দেবীকে জানাতে হবে হুজুর, নইলে আমাদের জান থাকবে না।
তাই নাকি?
হ্যাঁ হুজুর, মেয়েছেলে তো নয় সে, একেবারে মরদের বাবা!
সে আবার কি রকম?
হুজুর, হেমাঙ্গিনী দেবী মেয়েলোকের ব্যবসা করে কিনা, তাই তার ওখানে কোন অপরিচিত লোককে নিয়ে যাওয়া মানা আছে। তবে আপনার জন্য কোন চিন্তা নেই, আপনি তো আর পুলিশের লোক নন।
না না, আমাকে সন্দেহ করার কোন কারণ নেই। আমি সেখানে যাব এবং পছন্দমত মেয়ে বেছে নিয়ে নগদ টাকা গুণে দেব।
আচ্ছা হুজুর, আপনি কিছু ভাববেন না, আমি কয়েকদিনের মধ্যে আপনাকে সেখানে নিয়ে যারার ব্যবস্থা করছি।
টাকার তোড়াটা পকেটে রেখে চলে যাচ্ছিল গুণ্ডা দু’জন, বিনয় সেন পিছু ডাকে-এই শোন!
বলুন হুজর!
আমি যে তোমাদের দিয়ে অনেক নতুন মেয়ের সন্ধান নিচ্ছি একথা কুমার বাহাদুর যেন জানতে না পারে, বুঝেছ?
বুঝেছি হুজুর, বুঝেছি।
হ্যাঁ, আমার মনমত মেয়ে পেলে তোমাদের অনেক টাকা বখশিস দেব।
আচ্ছা হুজুর। কুর্ণিশ জানিয়ে পুনরায় তাদের গন্তব্যপথে পা বাড়াল ওরা।
বিনয় সেনের চোখ দুটো হঠাৎ আগুনের ভাটার মত জ্বলে উঠল, পকেটে হাত দিয়ে রিভলবারটা মুঠোয় ধরলো সে।
বাগানবাড়ির বাঈজী কক্ষ থেকে তখন একটা নারীকণ্ঠের করুণ তীব্র আর্তনাদ ভেসে আসছিল।
বিনয় সেম মুহূর্ত বিলম্ব না করে রিভলবার হাতে ছুটে চলল। দ্রুতগতিতে। অন্ধকার রাতের আবরণে গা ঢাকা দিয়ে বিনয় সেন বাঈজী কক্ষের একটা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
কক্ষে উজ্জ্বল আলো জ্বলছিল, সে আলোতে অর্ধমুক্ত জানালা পথে দেখল বিনয় সেন—সেই অসহায় যুবতীটাকে ক্ষুধার্ত শার্দুলের মত আক্রমণ করেছে মংগলসিন্ধ।
যুবতীর এলোমেলো চুল, শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটিয়ে, জামার হাতা ছিড়ে কাঁধের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে।
মাতাল মংগলসিন্ধ জাপটে ধরেছে মেয়েটাকে।
মেয়েটা প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে। তীব্রকণ্ঠে চিৎকার করছে সে-বাঁচাও বাঁচাও…..
কিন্তু এই বাগানবাড়ির পাষাণ প্রাচীরে ঘেরা বদ্ধকক্ষে কে তাকে বাঁচাতে আসবে!
সিংহের মুখে হরিণশিশুর মত ছটফট করছে মেয়েটা!
বিনয় সেন দাঁতে অধর দংশন করল, পরমুহূর্তেই তার হাতের রিভলবার গর্জে উঠল।
সংগে সংগে তীব্র আর্তনাদ করে যুবতীটাকে ছেড়ে দিল মংগলসিন্ধ, তারপর ধপ করে বসে পড়ল মেঝেতে।
মংগলসিন্ধের আর্তনাদে পাশের কক্ষ থেকে শশব্যস্তে ছুটে এলো কঙ্করসিং। মেঝেতে বসে থাকা মংগলসিন্ধকে দেখতে পেয়ে টলতে টলতে এগিয়ে গেল তার দিকে, জড়িত কণ্ঠে বলল-কি হল বন্ধু? গুলির শব্দ আর তার সঙ্গে তোমার আর্তনাদ আমাকে বড়ই বিচলিত করেছে বন্ধু। একি, রক্তে যে ভেসে যাচ্ছে! কঙ্কর সিং মঙ্গলসিন্ধের পায়ের কাছে বসে পড়ল।..
ওদিকে যুবতী ছাড়া পেয়ে মুক্ত দরজা দিয়ে দ্রুত ছুটে চলল কিন্তু বাগানবাড়ির বাইরে বের হবার পূর্বে কয়েকজন পাহারাদার যুবতীটাকে ধরে ফেলল।
যুবতী আর্তকণ্ঠে বলল ছেড়ে দাও, আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও। যুবতী পাহারাদারগণের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করে দিল।
পাহারাদারগণ ইতোপূর্বে গুলির শব্দও শুনতে পেয়েছিল এবং পর পরই যুবতীটাকে পালাতে দেখে পাকড়াও করে ফেলেছিল।
যুবতী এবং পাহারাদারগণ যখন ধস্তাধস্তি করে চলেছে ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ছায়ামূর্তি ঝাপিয়ে পড়ল তাদের মাঝখানে। প্রচণ্ড এক একটা ঘুষি লাগাতে শুরু করল ছায়ামূর্তি পাহারাদারগণের নাকে-মুখে পেটে।
অল্পক্ষণের মধ্যেই পাহারাদারগণ যে-যেদিকে পারল ছুটে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাল।
ছায়ামূর্তি শুধু দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে।
অদূরে দাঁড়িয়ে যুবতী হাঁপাচ্ছে। রাত্রির অন্ধকারে সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না কে এই অজানা বন্ধু। কে এই মহান ব্যক্তি, এই মহাবিপদ মুহূর্তে বাঁচিয়ে নিল তাকে। ভয়ও হচ্ছে যুবতীর এমন শক্তিমান কে হতে পারে, অতগুলো পাহারাদারকে যে হটিয়ে দিতে পারল!
যুবতী ভাবছে কিন্তু এভাবে কতক্ষণ বাগানবাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকবে তারা। ছায়ামূর্তি এগিয়ে এলো যুবতীর পাশে, বলল-শিগগির পালাতে হবে, নইলে আবার ওরা এসে যেতে পারে!
এতক্ষণে সাহস হলো যুবতীর, ছায়ামূর্তি ভূত-প্রেত বা ঐ ধরনের কিছু নয়—সে মানুষ। তাছাড়া ছায়ামূর্তির কণ্ঠস্বর যুবতীর মনে আশ্বস্তি এনে দিল। বলল যুবতী-আপনি কে? আমাকে এই বিপদের সময় বাঁচিয়ে নিলেন?
ছায়ামূর্তি ব্যস্তকণ্ঠে বললবলব পরে, এখন চল পালাতে হবে এখান থেকে।
যুবতী বলল-চলুন, কোথায় যাব…
ছায়ামূর্তি যুবতীর হাত ধরে একরকম টেনেই নিয়ে চলল বাগানবাড়ির পেছন দিকে। ছুটতে ছুটতে বড় ক্লান্ত হয়ে পড়ছে যুবতী। একটার পর একটা বিপদ চলছে, তদুপরি গোটা দিন খাওয়া হয়নি। বারবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল যুবতী।
ছায়ামূর্তি অন্ধকারে ধরে ধরে নিয়ে চলল যুবতীকে।
ততক্ষণে বাগানবাড়ির মধ্যে বেশ হট্টগোল শুরু হয়েছে। আলো জ্বেলে উঠছে একটার পর একটা।
ছায়ামূর্তির মুখের দিকে তাকাল যুবতী–বিস্ময়ভরা কন্ঠে বলল–আপনি!
ছায়ামূর্তি মুখের আবরণ ইতোমধ্যে খুলে ফেলেছিল, বলল-হাঁ, আমাকেই তুমি কিছু পূর্বে কুমার বাহাদুরের বাগানবাড়ির কক্ষে দেখেছিলে, আমার নাম বিনয় সেন!
