মঙ্গলসিন্ধ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে আসর জমিয়ে বসেছিল, এমন সময়, কঙ্করসিং এবং বিনয় সেন বৃষ্টিতে ভিজে হাজির হলো। মঙ্গলসিন্ধের দলে যোগ দিয়ে আসর সরগরম করে তুলল। মদ পান আর তালিতে মুখর হয়ে উঠল বাগানবাড়ির রঙমহল।
ওদিকে প্রকৃতি ভীষণভাবে তর্জন গর্জন শুরু করেছে। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বাজ পড়ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করল ভীল সর্দারের হত্যাকারী গুণ্ডা দু’জন।
মঙ্গলসিন্ধ ইংগিতে গুণ্ডাদ্বয়কে নিকটে আহ্বান জানাল। বলল–খবর কি?
প্রথম গুণ্ডা বলে উঠল-সাবাড় কড়ে দিয়েছি কুমার বাহাদুর!
মঙ্গলসিন্ধ খুশিভরা কন্ঠে বলল—একেবারে খতম?
হ্যাঁ!
কঙ্করসিং বলল–দু’জনকেই করেছ?
প্রথম গুণ্ডা-না, যাকে বলেছিলেন তাকেই হত্যা করেছি।
বিনয় সেন বলে উঠল–শুভ সংবাদ!
মঙ্গলসিন্ধ বলল–ভুল করোনি তো?
প্রথম গুণ্ডা বলে উঠল–না হুজুর, ভুল করিনি। আমরা আগে সব জেনে নিয়েই কাজ করেছি।
বেশ করেছ। পকেট থেকে একগাদা নোট বের করে মঙ্গলসিন্ধু গুণ্ডাদ্বয়ের হাতে গুঁজে দিল।
বিনয় সেনের মুখে ফুটে উঠল একটু বাঁকা হাসির রেখা!
বেরিয়ে গেল গুণ্ডাদ্বয়।
মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্করসিং আনন্দ সূচক শব্দ করে উঠল। মঙ্গলসিন্ধ বলল-পথের কাটা দূর হলো!
কঙ্কর বলে উঠল—সাপ মেরে লেজ জিইয়ে রাখলে মঙ্গল, ওকেও খতম করা উচিত ছিল।
মঙ্গলসিন্ধ বলল–কি দরকার। আসল আপদ দূর হয়েছে, ওটাকে আর কেয়ার করি না।
আবার শুরু হলো বাঈজী নাচ।
মঙ্গলসিন্ধের আনন্দ আর ধরছে না। মদের পাত্র হাতে উঠিয়ে নিয়ে একের পর এক উজার করে চলল।
মঙ্গলসিন্ধের সংগে আনন্দে যোগ দিয়ে কঙ্করসিং মাথা দোলাচ্ছে আর করতালি দিচ্ছে।
বিনয় সেনও তাদের সংগে যোগ দিয়েছে।
বৃষ্টি ধরে এসেছে এখন। তবু আকাশে মেঘের ভীষণ ঘনঘটা রয়েছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, কিন্তু বাজ পড়েছে না। গাছপালী দুলছে কিন্তু মুচড়ে ভেঙ্গে পড়ছে না।
প্রকৃতি অনেকটা শান্ত আকার ধারণ করেছে।
এমন সময় দু’জন ভীমকায় লোক একটা যুবতীকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল। যুবতীর হাত-পা-মুখ কাপড় দিয়ে মজবুত করে বাঁধা। এতটুকু নড়ার শক্তি নেই যুবতীর।
এলোমেলো চুল, ছিন্নভিন্ন বস্ত্রাঞ্চল। যুবতীটাকে মেঝেতে রেখে লোক দুটো সোজা হয়ে দাঁড়াল।
মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিংয়ের চোখেমুখে তখন মদের নেশা। মঙ্গলসিন্ধের ইংগিতে বাঈজীর নাচ বন্ধ হলো। বাঈজী একবার রাগতভাবে মঙ্গলসিন্ধ এবং কঙ্কর সিংয়ের মুখে তাকিয়ে সরে গেল সেখান থেকে।
মঙ্গলসিন্ধ বলল-এনেছ?
হ্যাঁ হুজুর এনেছি। বড় বদমাইস ছুকরি, আনতে বড় তকলিফ হয়েছে।
মঙ্গলসিন্ধ একটা উৎকট শব্দ করে উঠল। তারপর ইংগিত করল যুবতীর হাত-পা আর মুখের বাঁধন খুলে দিতে।
কক্ষে অন্য যারা ছিল সবাই বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল।
বিনয় সেনও উঠে দাঁড়াল, চলে যাবার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াতেই মঙ্গলসিন্ধ বলল—আরে, তুমিও যে চললে, এসো এসো….
বিনয় সেন থমকে দাঁড়াল, একবার তাকিয়ে দেখল যুবতীটিকে। নীড়হারা কপোতর মত থরথর করে কাঁপছে সে।
যুবতীর হাত-পা মুখের বাঁধন খুলে দেয়া হলো। যুবতী বন্ধনমুক্ত হতেই সোজা হয়ে বসলো। ভয়বিহবল দৃষ্টি মেলে তাকাল চারদিকে।
কঙ্কর সিং বলে উঠল–একেবারে খাসা মাল?
মঙ্গলসিন্ধের দু’চোখ হতে লালসা ঝরে পড়ছে। যে গুণ্ডদ্বয় মেয়েটাকে নিয়ে এসেছে তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠল–কুমার বাহাদুর, এর চেয়ে শতগুণ সুন্দরী একটা মেয়ে আছে। কিন্তু…..
কিন্তু কি বলে ফেল বাবা? জড়িত কন্ঠে বলল মঙ্গলসিন্ধ।
মেয়েটার মূল্য এগুলোর চেয়ে দশগুণ বেশি।
তাতে কি আসে যায়, হেমাঙ্গিনীকে বললা যত চায় তাই দেব, টাকার জন্য ভাবতে হবে না।
আচ্ছা কুমার বাহাদুর।
বেশ, তাহলে যাও এবার তোমরা।
গুণ্ডা দু’জন বেরিয়ে গেল।
বিনয় সেন হঠাৎ বলে উঠলকুমার বাহাদুর, আমার শরীরটা ভাল বোধ করছি না, আজ বিদায় চাই।
মঙ্গলসিন্ধ টলতে টলতে এগুচ্ছিল যুবতীটার দিকে। বিনয় সেনের কথায় বলে ওঠে-এই খাসা মাল ছেড়ে চলে যাবে? আচ্ছা—যাও তবে।
কঙ্কর সিং তখন ঢেকুর তুলছিল হেউ হেউ করে, এবার বলল—যেতে দাও বন্ধু, সবাইকে চলে যেতে দাও….
বিনয় সেন বেরিয়ে গেল।
দুর্যোগের ঘনঘটা কিছুটা কমে এলেও এখনও প্রাকৃতিক অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়নি। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, ঝড়ের বেগ কমে এলেও দমকা হাওয়া বইছে। বৃষ্টির জলে বাগানবাড়ির পথঘাট একাকার হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, তারই আলো বৃষ্টির জলে পড়ে ঝকমক করে উঠছে।
আলখেল্লা গায়ে গুণ্ডা দু’জন এগিয়ে চলছে।
হঠাৎ তাদের সামনে পথরোধ করে দাঁড়াল বিনয় সেন।
চমকে উঠল গুণ্ডা—দাঁড়িয়ে পড়তেই বিদ্যুতের আলোতে চিনতে : পারল তারা বিনয় সেনকে। একজন বলে উঠল–আপনি!
বিনয় সেন একতোড়া নোট বের করে মেলে ধরলো তাদের সম্মুখে, তারপর বলল—আমাকে হেমাঙ্গিনীর নিকটে নিয়ে যেতে হবে। এই নাও তার জন্য প্রথম বখশিস।
প্রথম গুণ্ডা বলল+আপনি কেন কষ্ট করবেন হুজুর, আমরা আপনাদের বান্দা থাকতে–যা বলবেন তাই করব। হাত বাড়িয়ে টাকার তোড়াটা নিল সে, তারপর বলল-ক’টা মেয়ে চান তাই এনে দিতে পারব।
বিনয় সেনের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বলল–পারবে?
পারব।
বিনয় সেন লোক দু’টিকে সঙ্গে করে বাগানবাড়ির অদূরে আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। এবার বিনয় সেন গুণ্ডা লোক দুটিকে লক্ষ্য করে বলল–দেখ আমি চাই নিজে গিয়ে যে মেয়েটাকে পছন্দ হয় তাকেই যত টাকা লাগে তাই দেব! আর তোমরাও মোটা বখশিস পাবে।
