মঙ্গলসিন্ধ খুশিভরা দৃষ্টিতে তাকালো বিনয় সেনের দিকে। তার সংগে দৃষ্টি বিনিময় হলো।
০৮.
মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিংয়ের দক্ষিণ হাত হয়ে উঠল বিনয় সেন। সব সময় মঙ্গলসিন্ধের পাশে পাশে থাকে সে।
গোপনে নানা সংবাদ সরবরাহ করে।
বিনয় সেনের সহযোগিতায় মঙ্গলসিন্ধ উপকৃত হলো। কৌশলে বিনয় সেন মহারাজাকে বশীভূত করে আরও অর্থ মঙ্গল সেনের হস্তগত করে নিল। এতে আনন্দের সীমা রইলো না মঙ্গলসিন্ধের।
এখন যত গোপন পরামর্শ হয়, সব সময়ে তাদের দলে থাকে বিনয় সেন।
সেদিন বাগানবাড়ির গোপন কক্ষে আলোচনা হচ্ছিল। মঙ্গলসিন্ধ, কঙ্করসিং আর পূর্বের সেই শয়তান গুঞ্জলোক দু’টি এবং বিনয় সেন।
মঙ্গলসিন্ধ গুণ্ডালোক দু’জনকে লক্ষ্য করে বললআজও তোমরা ঐ ভীল সর্দার দু’জনকে তাড়াতে পারলে না, অকেজো কোথাকার!
গুণ্ডা লোক দুটি হাতজোড় করে বলল কুমার, আমরা চেষ্টার কোন ত্রুটি করি না, কিন্তু আজও তাদের…।
এতগুলো টাকা খেলে তবু কাজ হাসিল করতে পারলে না। অসমর্থ, অক্ষম-আমার টাকা ফেরত দাও।
বিনীত কণ্ঠে গুণ্ডাদের নেতা লোকটা বলল-আর দুটো দিন আমাদের সময় দেন কুমার বাহাদুর!
বেশ দিলাম এরপর আর ক্ষমা করবো না।
কঙ্করসিং মঙ্গলসিন্ধের কথায় যোগ দিয়ে বলে উঠল—একেবারে খতম করে দিতে পারলে মোটা বখশীস মিলবে।
বহুৎ আচ্ছা হুজুর। সালাম জানিয়ে বেরিয়ে গেল গুণ্ডাদ্বয়। বিনয় সেন হেসে বলল কুমার বাহাদুর, ভীল সর্দার দুটিকে যতক্ষণ না তাড়িয়েছেন। ততক্ষণ আপনারা নিশ্চিন্ত নন।
হ্যাঁ বিনয়, তোমার কথা সত্য।
০৯.
সন্ধ্যা থেকে ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ছে।
আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তৎসঙ্গে দমকা হাওয়াও বইছে। গোটা পৃথিবীটা যেন কোন এক রাক্ষসের সঙ্গে সঙ্গে মত্ত–হয়ে উঠেছে।
রাজা জয়সিন্ধের বাগানঝড়ি।
বনহুর আর রহমান পাশাপাশি দুটি বিছানায় শুয়ে আছে। বনহুর বারবার তাকাচ্ছে দেয়ালঘড়ির দিকে। রাত দ্বিপ্রহর।
রহমান জিজ্ঞাসা করল —সর্দার, আপনাকে আজ বেশ উত্তেজিত লাগছে নতুন কোন সংবাদ আছে কি?
বনহুর শয্যায় উঠে বসল–আছে। দু’জন গুণ্ডা আমাদের হত্যা করতে আসছে।
সর্দার।
হ্যাঁ রহমান!
ঘাবড়াবার বান্দা রহমান নয়, তবে নিজেদের রক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে তো।
বনহুর বাইরে অন্ধকারে তাকিয়ে কি যেন লক্ষ্য করল। তারপর দ্রুতহস্তে নিজের বালিশগুলো বিছানায় চাদর ঢাকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। রহমানকেও ইংগিতে সেই রকম কাজ করার জন্য আদেশ দিল।
এবার বনহুর তার নিজের শয্যার নিচে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। রহমানকে আদেশ দিল দরজার আড়ালে দাঁড়াতে।
হঠাৎ দমকা হাওয়ায় জানালা খুলে গেল। রহমান আরও জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল।
মুক্ত জানালা দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করলো যমদূতের মত দু’টি লোক। একজনের হাতে সুতীক্ষ্ণ ঝকঝকে ছোরা–অন্য জনের হাতে একটি তেলপাকা বাঁশের লাঠি।
রহমানের শরীর ফুলে উঠল রাগে কিন্তু সর্দারের বিনা আদেশে সে তো কিছুই করতে পারবে না। কাজেই নিশ্চুপ রইলো।
লোক দু’টির একজন গিয়ে দাঁড়াল রহমানের বিছানার পাশে। লোকটা হাতের লাঠি উঠিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। নড়ে উঠলে বা জেগে গেলে লাঠির আঘাতে ধরাশায়ী করবে।
দ্বিতীয় লোকটা সুতীক্ষ্ণ ধার ছোরা বাগিয়ে বনহুরের বিছানার দিকে। এগিয়ে চলল।
রুদ্ধ নিঃশ্বাসে রহমান দাঁড়িয়ে রইলো।
লোকটা পা টিপে টিপে এগুচ্ছে। তার চোখমুখে খুনের একটা হিংস্রভাব ফুটে ওঠেছে।
এবার লোকটা একেবারে বনহুরের শয্যার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠিই সেই মুহূর্তে দমকা হাওয়া ভীষণভাবে বইতে শুরু করল। বাইরে গাছপালাগুলো যেন ভেঙ্গে মুচড়ে যাচ্ছে। পাশেই কোথাও বাজ পড়ল।
লোকটা মুহূর্ত বিলম্ব না করে হাতের ছোরাখানা সজোরে বসিয়ে দিল বনহুরের শয্যায় শায়িত লম্বা বালিশে। পর মুহূর্তেই সে তার সঙ্গীকে নিয়ে দুর্যোগময় রাত্রির অন্ধকারে অদৃশ্য হলো।
বনহুর এবার তার শয্যার নিচে থেকে বেরিয়ে এলো। রহমানও এসে দাঁড়াতোর অদূরে।
বনহুর হেসে উঠল–হাঃ হাঃ হাঃ! ভীল সর্দার আজ নিহত হলো রহমান। তারপর এগিয়ে গিয়ে নিজের শয্যার বালিশ থেকে ছোরাখানা টেনে তুলে নিয়ে ফেলে দিল দূরে।
রহমান বলল–সর্দার, ইচ্ছা করলেই তো ওদের আমরা খতম করে দিতে পারতাম।
পারতাম, কিন্তু তা হবে না। আমি চাই আজ থেকে ভীল সর্দারের মৃত্যু হলো। এবার শোনো রহমান?
বলুন সর্দার….
তুমি এক্ষণি রাজপ্রাসাদে যাও, মহারাজার সংগে সাক্ষাৎ করে জানাও তোমার সংগী খুন হয়েছে। কে বা কারা তাকে খুন করেছে এ কথা তুমি জান না। এরপর তুমি তার কাছে বিদায় চেয়ে নেবে এবং যত শীঘ্র পার বজরায় ফিরে যাবে।
আর আপনি?
আমি রাজপ্রাসাদেই থাকব। যখন সময় পাব বা প্রয়োজন মনে করব, বজরায় গিয়ে তোমাদের সংগে সাক্ষাৎ করব। যাও, এই মুহূর্তে গিয়ে রাজপ্রাসাদে সংবাদ দাও তোমার সংগী খুন হয়েছে।
আচ্ছা সর্দার। কিন্তু……
আর কিন্তু নয়।
আপনি…
আমি এক্ষুণি চলে যাচ্ছি।
কোথায়?
পরে জানতে পারবে।
১০.
দুর্যোগপূর্ণ রাত্রি হলে কি হবে মঙ্গলসিন্ধের বাগানবাড়ির কক্ষে তখন পুরোদমে নাচগান চলছে! কড়কড় শব্দে বাজ পড়ল। বাগানবাড়ির অদূরে গাছপালা মড়মড় শব্দে ভেঙ্গে পড়ল তবু বাঈজীর চরণের নূপুরধ্বনি থামল না।
