এবার ছায়ামুর্তি সিন্দুকের পাশে দাঁড়াল। চাবি দিয়ে খুলে ফেলল সিন্দুকের তালা। তারপর ক্ষিপ্রহস্তে কয়েক তোড়া নোট তুলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল, সঙ্গে সঙ্গে পা বাড়াল সামনের দিকে।
অমনি ছায়ামূর্তির সামনে একটা জমকালো মূর্তি এসে দাঁড়াল, অন্ধকারেও তার হাতের অস্ত্রটা চকচক্ করে উঠল।
চমকে দাঁড়িয়ে পড়লো ছায়ামূর্তি, দু’চোখে তার ভয় ও বিস্ময়। অন্ধকার। হলেও চিনতে বাকী রইলো না জমকালো মূর্তির হাতে রয়েছে সুতীক্ষ্ণধার ছোরা।
জমকালো মূর্তি ছোরাখানা ছায়ামূর্তির বুকে চেপে ধরে বাম হাত মেলে
ধরল।
ছায়ামূর্তি যেমন নীরবে টাকার তোড়াগুলো পকেটে রেখেছিল, তেমনি নীরবে বের করে দিল জমকাল মূর্তির হাতে।
জমকালো মূর্তি টাকা নিয়ে নিমেষে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ছায়ামূর্তি কিছুক্ষণ থ’ মেরে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর দ্রুত পেছনের সিঁড়ি বেয়ে ফিরে চলল।
রাজ প্রাসাদের বাইরে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, ছায়ামূর্তি সেই গাড়িতে চেপে বসল।
গাড়ি অদৃশ্য হতেই, সেখানে এসে দাঁড়াল জমকালো মূর্তি। অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল সে–হাঃ হাঃ হা–হাঃ হাঃ হাঃ–
০৭.
ক্ষিপ্তের ন্যায় পায়চারী করছে মঙ্গলসিন্ধ।
একপাশে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে কঙ্করসিং। ভ্ৰকুঞ্চিত করে বলল কঙ্করসিং কার এত সাহস যে তোমার বুকে ছোরা ধরে টাকাগুলো আত্মসাৎ করে নিল।
মঙ্গলসিন্ধ এবার দাঁড়াল, দাঁত দিয়ে অধর দংশন করে বলল—সে যেই হোক আমি তাকে খুঁজে বের করবই।
এমন সময় মহারাজার বিশ্বস্ত কর্মচারী বন্ধু রায় এবং নতুন কর্মচারী বিনয় সেন এসে কুর্ণিশ জানাল রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধকে।
মঙ্গলসিন্ধ পিতার কর্মচারীদ্বয়কে এ অসময়ে এখানে দেখে একটু অবাক হবার ভান করে বলল-কি সংবাদ বন্ধু রায়?
রাজকুমার, খুব দুঃসংবাদ!
দুঃসংবাদ!
হ্যাঁ রাজকুমার, দুঃসংবাদ। আজ রাতে রাজকক্ষ থেকে এক লাখের বেশি টাকা চুরি হয়ে গেছে।
মিছামিছি চমকে ওঠার ভান করে মঙ্গলসিন্ধ একবার বাঁকা চোখে কঙ্কর সিংয়ের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে নিয়ে বলে উঠল-রাজকক্ষে চুরি! বল কি বন্ধু রায়?
হ্যাঁ কুমার, মহারাজ যখন নিদ্রা যাচ্ছিলেন তখন তাঁর বালিশের তলা থেকে চাবি নিয়ে এই চুরি হয়েছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠল মঙ্গলসিন্ধ—আশ্চর্য! এবার চোখ দুটো ধদ্ধ করে জ্বলে উঠল তার, দাঁতে দাঁত পিষে বলল…… কে এই দুর্দান্ত বদমাইস যে ছোরা দেখিয়ে……
আপনি ভুল করছেন কুমার, ছোরা দেখিয়ে নয়…..
হ্যাঁ হ্যাঁ ভুলে গেছি….তা আমাকে কেন মহারাজ স্মরণ করেছেন বুঝতে পারছি না।
এবার নতুন কর্মচারী বিনয় সেন বলে উঠল—মহারাজ এতগুলো অর্থ হারিয়ে একটু বিব্রত হয়ে পড়েছেন। পুত্রসঙ্গ তার মনে হয়তো কিছুটা সান্তনা যোগাবে।
মঙ্গলসিন্ধ নতুন কর্মচারীটির মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
বঙ্কু রায় বলল কুমার, ইনি রাজবাড়ির নতুন কর্মচারী, নাম বিনয় সেন।
বিনয় সেন বিনীতভাবে পুনরায় কুর্ণিশ জানাল।
মঙ্গলসিন্ধ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বিনয় সেনের আপাদমস্তক লক্ষ্য করল। সৌম্য সুন্দর সুপুরুষ যুবক বিনয় সেন! মাথায় কোঁকড়ানো একরাশ চুল। গভীর নীল উজ্জ্বল দুটি চোখ। দীপ্ত সুন্দর মুখমণ্ডল। প্রশস্ত বক্ষ, বলিষ্ঠ দেহ, শরীরে রাজকীয় পোশাক!
মঙ্গলসিন্ধ যখন বিনয় সেনকে লক্ষ্য করছিল তখন সে মৃদু মৃদু হাসছিল, অতি স্বাভাবিক সুন্দর সে হাসি!
মঙ্গলসিন্ধের ভাল লাগল যুবক বিনয় সেনকে। এবার সে বন্ধু রায়কে বলল যাও তোমরা। আমি আসছি!
বিদায় গ্রহণকালে পুনরায় কুর্ণিশ জানাল বন্ধু রায় ও বিনয় সেন।
মঙ্গলসিন্ধ কঙ্কর সিংকে বল-সবতো শুনলে কঙ্কর? পিতা আমাকেই হয়তো সন্দেহ করে বসেছেন। নইলে তার কক্ষে প্রবেশের সাহস কার আছে!
কঙ্কর সিং বলল—মিথ্যা ভয়ে ভীত হচ্ছ মঙ্গল! তুমি সরল ভাব নিয়ে যাও সেখানে, তুমি যেন কিছুই জান না এভাবে কথাবার্তা বলবে।
আমার গলাটা কেঁপে যাবে না তো!
এত দুর্বল মন তোমার! রাজকুমার হয়ে এত ভীতু তুমি! সত্যি টাকাটা তো আর তুমি নাওনি।
কিন্তু…..
আর কিন্তু নয় মঙ্গল, যাও।
মঙ্গলসিন্ধ বেরিয়ে গেল।
মহারাজার বিশ্রামকক্ষ।
সিন্দুক থেকে একসঙ্গে এতগুলো টাকা চুরি কম কথা নয়। তাছাড়া রাজকক্ষ থেকে চুরিমহারাজ জয়সিন্ধ উত্তেজিতভাবে পায়চারী করে চলেছেন।
একপাশে দাঁড়িয়ে রাজার বিশ্বস্ত অনুচরগণ, এমনকি মন্ত্রী সেনাপতি পরিষদ সবাই দণ্ডায়মান। বন্ধু রায় ও বিনয় সেনও রয়েছে সেখানে। মহারাজ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–আমার কক্ষে প্রবেশ করে এমন লোক কে আছে। রাজ্যে?
সেনাপতি বলে উঠলেন—এত পাহারা সত্ত্বেও চোর স্বচ্ছন্দে এসেছিল এবং কার্যোদ্বার করে সরে পড়েছে।
এমন সময় রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধ রাজকক্ষে প্রবেশ করে পিতাকে কুর্ণিশ জানিয়ে বলল—একি সংবাদ শুনলাম বাবা!
মহারাজ গম্ভীর দৃঢ়কণ্ঠে বললো-মংগল, যা শুনেছ তা যতখানি দুঃখের তার চেয়ে ভয়ঙ্কর, আমার রাজ্যে কে এমন আছে যে আমার কক্ষে প্রবেশে সক্ষম হলো?
এ কথা আমিও ভাবছি।
ভাবছি নয়, তাকে তোমাদের আবিষ্কার করতে হবে। এবং সে কারণেই তোমাকে ডেকেছি।
মঙ্গলসিন্ধু বলে উঠল—বাবা, আপনার আদেশ আমার শিরোধার্য। আমি শপথ করছি কে এই লোক তাকে খুঁজে বের করবোই।
মঙ্গলসিন্ধের কথায় যোগ দিয়ে বলে উঠল বিনয় সেন—কুমার, আমি আপনাকে এ ব্যাপারে যথাসাধ্য সাহায্য করবো।
