মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিংয়ের মুখ শুকিয়ে চুন ললো, যখন তারা দেখল-মহারাজার সামনে দণ্ডায়মান নদীতীরের সেই যুবতীটি ও তার পিতা। বুঝতে কিছু বাকী থাকে না তাদের। সকলের অলক্ষ্যে একবার মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নিল ওরা দু’জনে।।
মহারাজ জয়সিন্ধ পুত্র এবং তার বন্ধু কঙ্কর সিংয়ের দিকে তাকিয়ে গর্জন করে উঠলেন—এ কথা সত্য? তোমরা এই যুবতীটিকে হরণের চেষ্টা করেছিলে?
মঙ্গলসিন্ধ পিতার কথায় ফিরে তাকাল যুবতীর দিকে, তারপর একটা ঢোক গিলে বলল—ওকে চিনি না।
বনহুর এগিয়ে এলো, গম্ভীর কণ্ঠে বলল-মিথ্যে কথা! কাল নদীতীরে এই যুবতীকে এরা দু’জনে জোর করে ঘোড়ায় তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল মহারাজ। আংগুল দিয়ে মঙ্গল ও কঙ্করকে দেখিয়ে দিল বনহুর।
ক্রুদ্ধভাবে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল মঙ্গলসন্ধি, কঙ্কর সিংও সকলের অলক্ষ্যে দাঁতে দাঁত পিষল। ওদের যত রাগ গিয়ে পড়ল বনহুরের ওপর।
মহারাজ বলে ওঠেন—নারীহরণের চেষ্টার জন্য আমি তোমাদের দু’জনকে শাস্তি দিচ্ছি। তোমরা দু’জন এই রাজসভায় নাকে কানে খৎ দিয়ে বল, আর অমন কাজ করবে না।!
শেষ পর্যন্ত বাধ্য হলো মঙ্গল ও কঙ্কর রাজসভায় দাঁড়িয়ে নাকে কানে খৎ দিতে।
রাগে-অপমানে মঙ্গলসিন্ধের মুখমণ্ডল কাল হয়ে উঠল, এর চেয়ে তার পিতা যদি তাদের হত্যার আদেশ দিতেন তাতেও দুঃখ ছিল না। প্রকাশ্য রাজসভায় এতগুলো লোকের সামনে এই অপমান মৃঙ্গলসিন্ধ আর কংকর সিংয়ের মনে আগুন জ্বেলে দিল।
মহারাজ জয়সিন্ধ নিজের কন্ঠ থেকে মহামূল্য হার খুলে পরিয়ে দিলেন ভীল সর্দারবেশী দস্যু বনহুরের কন্ঠে । তারপর বললেন— আমার রাজ্যে মা-বোনদের প্রতি যারা অন্যায় আচরণ করে তাদের আমি চরম শাস্তি দিয়ে থাকি, আর যারা তাদের মর্যাদা দেয় তাদের আমি করি শ্রদ্ধা।
মহারাজের এই শ্রদ্ধাপূর্ণ উপহার অবহেলা করতে পারল না বনহুর, মহারাজার হাত চুম্বন করে আনন্দ প্রকাশ করলো সে।
এ দৃশ্য রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধের হৃদয়ে কষাঘাত করল। একটা প্রচণ্ড ঈর্ষার আগুন দগ্ধীভূত করে চলল তাকে!
এরপর মঙ্গল এবং কঙ্কর নতমস্তকে রাজসভা ত্যাগ করল।
০৫.
রাজসভা থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলো বনহুর আর রহমান। আপন মনে কথা বলতে বলতে এগিয়ে চলল তারা। বনহুর আর রহমানের পেছনে কিছুটা দূরত্ব রেখে এগিয়ে আসছে যুবতী ও তার বৃদ্ধ পিতা।
রাজবাড়ি ছেড়ে অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে তারা।
হঠাৎ একটা গুলির শব্দ ও সেই সঙ্গে আর্তনাদ শুনে ফিরে তাকাল বনহুর আর রহমান। একি! পথের বুকে মুখে থুবড়ে পড়ে গেছে যুবতীর পিতা বৃদ্ধ চাষী।
বনহুর আর রহমান দ্রুত এগিয়ে গেল, নিকটে পৌঁছে বিস্ময়ে হতবাক হলো। বৃদ্ধের বুকে একট গুলি এসে বিদ্ধ হয়েছে। রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে পথের খানিকটা অংশ।
বনহুর বলে ওঠে—মঙ্গলসিন্ধ তার অপমানের প্রতিশোধ নিল।
রহমান বললোসর্দার, একি তাহলে রাজকুমার মঙ্গল সিন্ধের কাজ?
হ্যাঁ রহমান, এটা তারই কাজ।
যুবতী তখন পিতার বুকে আছড়ে পড়ে কাঁদছে।
অল্পক্ষণেই লোকজন জড়ো হয়ে গেল সেখানে। কিন্তু সেই অজ্ঞাত খুনীর সন্ধান কেউ পেল না।
বাগানবাড়ি। মঙ্গলসিন্ধের আমোদকক্ষ।
মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিং পাশাপাশি আসনে উপবিষ্ট। সামনে দু’জন গুণ্ডা প্রকৃতির লোক দণ্ডায়মান। ভয়ংকর চেহারা, বলিষ্ঠ মাংসপেশী।
লাল টকটকে চোখ দুটো। পরনে টানাডোরা কাটা জামা ও খাকী হাফ প্যান্ট। মাথায় এক আংগুল লম্বা ছাঁটা চুল। দেখলেই মনে হয় শয়তানের সহোদর।
মঙ্গলসিন্ধ বলে উঠল—এ অপমানের প্রতিশোধ আমি চাই। প্রকাশ্য রাজদরবারে আমাকে অপমান! কিছুতেই আমি বরদাশত করতে পারব না।
কঙ্কর সিং বলে ওঠে-সমস্ত দোষ ঐ শয়তান ভীল সর্দারটার। ওর জন্যই তো এ অপমান!
মঙ্গলসিন্ধ বলে উঠল—যেমন করে হোক ঐ ভীল সর্দারের মাথা আমি নেব। নইলে আমার নাম মঙ্গলসিন্ধ নয়।
এবার গুণ্ডালোক দুটিকে দেখিয়ে বলল কঙ্কর-এদের আদেশ করো মঙ্গল, এরাই তোমার কার্য সিদ্ধ করে দেবে, চাই শুধু টাকা!
গুণ্ডাদের মধ্যে বেশি মোটা লোকটা বলে উঠল-হুজুর, শুধু আপনার আদেশের প্রতীক্ষা করছি, হুকুম করুন এখনই ভীল সর্দারের মাথা এনে দিচ্ছি।
মঙ্গলসিন্ধ বলল—কত টাকা নেবে তোমরা?
গুণ্ডাদের হয়ে জবাব দিল কঙ্কর-বেশি না, পাঁচ হাজার দিও।
পাঁচ হাজার, তার চেয়েও বেশি দেব কঙ্কর, তবু ওদের মাথা চাই!
কঙ্কর গুণ্ডাদের দিকে তাকিয়ে একটা ইংগিত করল।
এবার গুণ্ডা লোকটা বলে উঠল—হুজুর, কিছু টাকা অগ্রিম দিতে হবে, গরীব মানুষ আমরা
বেশ এই নাও, এতে এক হাজার টাকা আছে। মঙ্গলসিন্ধ পকেট থেকে একতোড়া নোট বের করে লোকটার হাতে দিল।
লোক দুটি বেরিয়ে গেল এবার।
মঙ্গলসিন্ধ বলল কঙ্কর, বুড়ো বাবা টাকা-পয়সার দিকে এবার কড়া নজর দিয়েছে। সিন্দুকের চাবি এখন তিনি নিজের কাছে রাখেন।
কঙ্কর হেসে উঠল—এই কথা? আচ্ছা তোমাকে একটা বুদ্ধি, ঠাওরে দিচ্ছি।
কঙ্কর মঙ্গলসিন্ধের কানে মুখে নিয়ে ফিস ফিস করে কিছু বলল। মঙ্গলসিন্ধের চোখ দুটো খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
০৬.
গভীর রাত।
রাজপ্রাসাদের পেছন দিকের সিঁড়ি বেয়ে একটা ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে দোতলার দিকে এগুচ্ছে। মহারাজ জয়সিন্ধের কক্ষের জানালা দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল ছায়ামূর্তি, এবার মহারাজ জয়সিন্ধের বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে অন্ধকারে তাকালো চারদিকে, তারপর অতি লুঘু হাতে সন্তর্পণে বালিশের তলা থেকে চাবির গোছা তুলে নিল।
