এমন সময় মঙ্গলসিন্ধ ও তার বন্ধু কঙ্কর সিং দু’জন দুটি অশ্বে নদীর তীর গিয়ে দাঁড়াল।
যুবতীগণ নদীবক্ষে আপন মনে সাঁতার কাটলেও তারা দেখতে পেল রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধ এবং কঙ্করসিংকে। তাড়াতাড়ি ওরা নিজেদের কাপড় সংযত করে নিয়ে ঘাটের পাড়ে এসে দাঁড়াল। ভয়-বিহবল আর সঙ্কুচিতভাবে যুবতীগণ এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল।
মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিংয়ের মধ্যে ইংগিতপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় হয়ে গেল। কঙ্কর সিং চট করে অশ্ব থেকে নেমে এগিয়ে গেল যুবতীদের দিকে।
যুবতীরা তখন সবাই এক জায়গায় জটলা পাকিয়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়েছে।
কঙ্কর সিংকে লক্ষ্য করে মঙ্গলসিন্ধ আংগুল দিয়ে একটা সুন্দরী যুবতীকে দেখিয়ে দিল।
কঙ্কর সিং খপ করে তার হাত ধরে হিড় হিড় করে টেনে আনল মঙ্গলসিন্ধের অশ্বের পাশে।
সঙ্গে সঙ্গে যুবতীরা তীব্র আর্তনাদ করে উঠল। একসঙ্গে সবাই বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার শুরু করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুর আর রহমান অদূরস্থ একটা পথ ধরে কোথাও যাচ্ছিল। যুবতীদের আর্তনাদ তাদের কানে এসে পৌঁছল।
রহমান বলে উঠলসর্দার, নিশ্চয়ই নদীতীরে যুবতীর দল স্নান করছিল, হয়তো কুমীরে কাউকে নিয়ে গেছে……
বনহুর বলে উঠল-চলো দেখি!
বনহুর আর রহমান,দ্রুত ছুটে গেল নদীতীরে। কিন্তু নদীতীরে পৌঁছে বিস্ময়ে চমকে উঠলো, রহমান আর বনহুরের চোখ দুটো জ্বলে উঠল ধ করে। কঠিন হয়ে উঠলো তার মুখমণ্ডল; দক্ষিণ হাত মুষ্টিবদ্ধ হলো।
মঙ্গলসিন্ধ অশ্বপৃষ্টে বসে একটা যুবতীর দক্ষিণ হাত টেনে ধরেছে আর কঙ্কর সিং যুবতীটিকে অশ্বপৃষ্ঠে তুলে দেবার জন্য চেষ্টা করছে। যুবতীটি প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে ওদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নেবার জন্য ধস্তাধস্তি করছে।
আর অন্যান্য যুবতী আর্তকণ্ঠে চিৎকার করছে—বাঁচাও বাঁচাও……
বনহুর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে ঝাপিয়ে পড়ল কঙ্কর সিংয়ের ওপর। প্রচণ্ড এক ঘুষি বসিয়ে দিল ওর নাকে। সঙ্গে সঙ্গে কঙ্কর সিং মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে।
মঙ্গলসিন্ধের দু’চোখ হতে আগুন ঠিকরে বের হতে লাগল। মুখের শিকার নষ্ট হলে যেমন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে হিংস্র বাঘ, ঠিক তেমনি হলো তার অবস্থা।
যুবতীটি ছাড়া পেয়ে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল।
কঙ্কর সিং এবার গায়ের ধূলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল, কোন কথা বলার সাহস হলো না তার।
মঙ্গলসিন্ধ রাগে গজগজ করছে, কিন্তু সেও কিছু উচ্চারণ করল না। মঙ্গলসিন্ধ অশ্বপৃষ্ঠে ছিল।
কঙ্কর সিং এবার নিজের অশ্বপৃষ্ঠে চেপে বসল, একবার তীব্র কটাক্ষে বনহুর আর রহমানের দিকে তাকিয়ে মঙ্গলসিন্ধের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করল। তারপর দ্রুত চলে গেল সেখান থেকে রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিং।
বনহুর আর রহমান এবার যুবতীটির দিকে তাকাল।
সেই যুবতীটিও তখন নিজের দলের মধ্যে গিয়ে পঁড়িয়েছে। ওরা সবাই কৃতজ্ঞতাপূর্ণ চোখে তাকিয়ে আছে, কেউ কোন কথা বলতে পারল না।
বনহুর আর রহমান নিজেদের গন্তব্যপথে পা বাড়াল।
রাজসভায় মহারাজ জয়সিন্ধ বসে রাজকার্য পরিচালনা করছিলেন–সেখানে উপবিষ্ঠ রাজ-পরিষদগণ! এমন সময় পূর্বদিনের সেই যুবতী এবং তার বৃদ্ধ পিতা রাজসভায় এসে হাজির হলো।
প্রথমে বাধা দিচ্ছিল রাজকর্ম চারিগণ।
রাজা আদেশ দিলেন–আসতে দাও।
যুবতী এবং তার পিতা এসে হাত জুড়ে দাঁড়াল। বৃদ্ধ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল—মহারাজ, একি অন্যায় অত্যাচার। বিচার করুন মহারাজ, বিচার। করুন…..
মহারাজ চিরদিনই প্রজাদের হিতাকাক্ষী। বৃদ্ধের চোখের পানি তার অন্তরে আঘাত করল, বললেন-কে তোমাদের প্রতি অন্যায় অত্যাচার করেছে, বল?
বৃদ্ধ পুনরায় কাঁদ কাঁদ স্বরে বলল—মহারাজ, যদি অভয় দেন তবে বলতে পারি।
মহারাজ জয়সিন্ধ অত্যন্ত নিষ্ঠাবান রাজা, এ কথায় তিনি বৃদ্ধাকে অভয় দিয়ে বললেন—তুমি স্বচ্ছন্দে বল।
বৃদ্ধ হাত জুড়ে বিনীত কণ্ঠে বলল–মহারাজ, আমার কন্যা এবং তার কয়েকজন সঙ্গিনী নদীতে স্নান করছিল। এমন সময় বৃদ্ধ ভয়বিহ্বল চোখে তাকাতে লাগল চারদিকে, এমন সময়—আপনার-থেমে পড়ল বৃদ্ধ।
মহারাজ জয়সিন্ধ বললেন–বল, কি বলতে চাও তুমি?
মহারাজ, আপনার পুত্র ও তার বন্ধু কঙ্কর নদীতীরে পৌঁছে আমার কন্যাকে জোরপূর্বক হরণ করার চেষ্টা করছিল।
ভয়ঙ্করভাবে গর্জন করে উঠলেন রাজা জয়সিন্ধ—এ কথা সত্য?
এবার যুবতী বলে উঠলহাঁ, মহারাজ এ কথা সত্য। সেই মুহূর্তে দু’জন ভীল সর্দার সেখানে উপস্থিত হয়ে আমাকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নেয়।
মহারাজ জয়সিন্ধ বলে উঠলেন—কে সেই মহান ভীল সর্দারদ্বয়?
বৃদ্ধ বলে উঠল তারা আপনার অতিথি ভীল সর্দারদ্বয়।
মহারাজার চোখেমুখে একটা কৃতজ্ঞতার ছাপ ফুটে উঠল। তার মহান অতিথিদ্বয়ের মহৎ উপকারের জন্য হৃদয়ে গর্ব অনুভব করলেন। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, সেনাপতি গুপ্ত সেনকে লক্ষ্য করে বললেনসেনাপতি, এক্ষণি মঙ্গল ও তার বন্ধু কঙ্করকে ডাকুন, আমি এর বিচার করব। আর শুনুন, বাগানবাড়ি থেকে আমার ভীল অতিথিদ্বয়কে ডেকে আনবেন।
সেনাপতি তখনই বেরিয়ে গেল।
অল্পক্ষণ পরে রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিং সহ সেনাপতি গুপ্তসেন ফিরে এলেন। তাদের পেছনে পেছনে প্রবেশ করল বনহুর আর রহমান।
ভীল সর্দারের বেশে বনহুরকে বড় সুন্দর লাগছিল। মাথায় পালকের মুকুট, বাজু এবং গলায় কাল ফিতার চওড়া তাবিজ বাধা, কানে বালা, হাতেও বালা। পিঠের সঙ্গে তীরধনু বাঁধা রয়েছে।
