রহমান যে কক্ষে শুয়েছে সে কক্ষের জানালা দিয়ে বনহুরের কক্ষের কিছুটা অংশ দেখা যায়। বিশেষ করে বনহুরের শয্যার কিছুটা ওর নজরে পড়ে। রহমান আজ সর্দারকে ছদ্মবেশ পরিবর্তন না করেই শয্যা গ্রহণ করতে দেখে একটু আশ্চর্য হয়েছিল। তারপর বুঝে নিয়েছিল নিশ্চয়ই সর্দার এই বেশেই রাত্রিতে বের হয়। সে কারণে সেও ঘুমাতে পারেনি, সর্দার যদি বাইরে বের হয় তবে রহমানও চুপ করে শুয়ে থাকবে না, এটাই ছিল তার মনোভাব এবং সে কারণেই রহমান বারবার জানালায় উঁকি দিয়ে দেখে নিচ্ছিল কি করছে তার সর্দার।
প্রহরের পর প্রহর গড়িয়ে চলেছে।
রোজই বাগানবাড়ির ওপাশ থেকে ভেসে আসে নর্তকীর পায়ের নূপুরের শব্দের সঙ্গে নানা কণ্ঠের হাস্যধ্বনি আর করতালি। আজ কিন্তু বাগানবাড়ি বেশ নীরব রয়েছে। কুমার মঙ্গলসিন্ধ কোথাও গেছে হয়ত, তাই আজ বাগানবাড়ি এমন নিশ্চুপ।
রহমান কখন একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছে খেয়াল নেই ওর। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল তার, একটা মেয়েলি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো তার কানে। সর্দারের কক্ষ থেকে শব্দটা ভেসে আসছে। রহমান চট করে শয্যা ত্যাগ করে জানালার শাসীর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। চমকে উঠল রহমান, মঙ্গলসিন্ধের আমোদকক্ষের নর্তকী তার সর্দারের পাশে বসে, সর্দারের দক্ষিণ হাতখানা নর্তকীর মুঠায় ধরা রয়েছে। আবেগভরা কন্ঠে কি যেন বলছে নর্তকী। ওর গলায় আওয়াজ শুনা যাচ্ছে কিন্তু কথাগুলো স্পষ্ট শুনা যাচ্ছে না।
নর্তকী বনহুরের কাঁধে মাথা রাখল।
বনহুর কি যেন বলছে, ঠিক বুঝা না গেলেও এটুকু শুনতে পেল রহমান, তুমহারে লিয়ে মাইভি বহুৎ পেরেশান… এরপর আর কিছুই বোঝা গেল না।
নর্তকী বাহু দু’টি দিয়ে সর্দারের কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরেছে।
রহমান আর দাঁড়াতে পারল না—একটা লজ্জা তাকে সরিয়ে নিল জানালা থেকে।
সর্দারের হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
তবে কি সর্দার ভুলে গেল তার কর্তব্য! একটা নারীর মোহ তাকে অভিভূত করে ফেললো! রহমানের মনে গভীর একটা অভিমান চাড়া দিয়ে উঠল!
নিজের শয্যায় পুনরায় শুয়ে পড়ল। এ কারণেই বুঝি মঙ্গলসিন্ধ সর্দারকে ভিন্ন কামরায় শোবার ব্যবস্থা করেছিল। রহমানের মনে পড়ল, সেদিন রাতে নর্তকী যে মদের পাত্র তার সর্দারের সম্মুখে বাড়িয়ে ধরেছিল তার মধ্যে মেশানো ছিল হয়ত মারাত্মক বিষ। আজও নর্তকী কোন মন্দ অভিসন্ধি নিয়ে তার সর্দারের নিকটে এসেছে, এটা সত্য। রহমান আবার শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল, ধীরে ধীরে দাঁড়াল সেই জানালার পাশে।
একি, সর্দার আর নর্তকী দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে।
রহমান মুহূর্ত বিলম্ব না করে, দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। বনহুর আর নর্তকীর পেছনে দাঁড়াল, বলল-সর্দার!
চমকে ফিরে দাঁড়াল বনহুর।
নর্তকী আরও বেশি চমকে উঠলো, বাগানবাড়ির অন্ধকারে তাকাল সে রহমানের মুখের দিকে।
বনহুর বুঝতে পারল, রহমান তাকে বাইরে যেতে নিষেধ করছে। একটু হেসে বলল—এক্ষুণ আসছি রহমান, একে একটু পৌঁছে দিয়ে আসি।
সর্দার, আমিই তো রয়েছি। এসো-নর্তকীকে লক্ষ্য করে বলল রহমান।
অগত্যা নর্তকী রহমানের সঙ্গে যেতে বাধ্য হলো।
বনহুর ফিরে এলো নিজের কামরায়।
মঙ্গলসিন্ধ পায়চারী করছে, চোখে তার ক্রুদ্ধ ভাব।
কঙ্কর সিং একপাশে দাঁড়িয়ে, হাতে তার সুতীক্ষ্ণধার ছোরা। ছোরাটা সে হাতের মধ্যে নাড়ছে। বিদ্যুতের আলোতে ঝকঝক উঠছে ছোরাটা।
সামনে নর্তকীটি, নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আছে সে।
মঙ্গলসিন্ধ গর্জন করে উঠল—এটুকুই তুমি পারলে না সিমকী। তোমাকে দিয়ে আমার কিছু হবে না।
নর্তকী সিমকী হাত জুড়ে বলল-মেরী কোই কসুর নেহি কুমার বাহাদুর। ও তো মেরী সাথ আতে থে। লেকিন উসকা সাথ যো আদমী হ্যায় ও সব কুছ বরবাদ কিয়া…..
কঙ্কর রক্তচক্ষু বিস্ফারিত করে বলে উঠলকুমার, আজ সুযোগ নষ্ট হলো, এরপর যেন না হয়।
মঙ্গলসিন্ধ কঙ্কন সিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল-তুমিই তো আমার ভরসা কঙ্কর!
তাহলে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার, ভীল সর্দারের তাজা রক্ত আমি নিঃশেষ করে দেব।
মঙ্গলসিন্ধ এবার বলল-হা, ঐ লোক দু’টিই যেন আমার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার নর্তকীকে লক্ষ্য করে বলল সে–তুমি এখন যেতে পার সিমকী।
সিমকী সালাম জানিয়ে বেরিয়ে গেল।
মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিংয়র মধ্যে শুরু হলো গোপন আলোচনা। ভীল সর্দারদ্বয়কে কি করে তাড়ানো যায়, এ নিয়ে চলল তাদের নানারকম পরামর্শ।
প্রথম থেকেই মঙ্গলসিন্ধের চক্ষুশূল হয়ে এসেছে এই ভীল সর্দারদ্বয়।
এদের চালচলন আর কথাবার্তা মঙ্গলসিন্ধের মনে সৃষ্টি করছে একটা বিষকর জ্বালা। সামান্য ভীল সর্দার হয়ে প্রথম দিনই তার কথা অমান্য করেছে—এ কম অপরাধ নয়! তাছাড়া ভীল সর্দারের অপরূপ সৌন্দর্য রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধের মনে ঈর্ষার সৃষ্টি করছে।
এদের আগমনে মঙ্গলসিন্ধ আর তার বন্ধু কঙ্করসিং মোটেই খুশি হতে পারেনি। বাগানবাড়িতে তারা যা খুশি তাই করে যাচ্ছিল তাদের কাজে বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ভীল সর্দার দু’জন, ইচ্ছামত তাদের বাসনা সিদ্ধ হচ্ছে না এখন।
০৪.
সেদিন দ্বিপ্রহরে নদীতীরে কয়েকজন যুবতী আপন মনে, স্নান করছিল। কেউ সাঁতার কাটছিল, কেউ বা গুণ গুণ করে গান গাইছিল। কেউ হাত নেড়ে নদীর পানি নিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছিলো আর একজন যুবতীর গায়ে।
