লোকটা লালসাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসছে।
মনিরা তাকাল দরজার দিকে, দরজা ভেজানো।
ওদিকের টেবিলে কয়েকটা মদের বোতল সাজানো। আর কয়েকটা কাঁচের গ্লাস।
মনিরা একবার বোতলগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখে নিল।
লোকটা এগিয়ে আসছে তার দিকে। কি ভয়ংকর তার চেহারা! লোকটা নিশ্চয়ই মদ খেয়েছে, পা দু’খানা ওর টলছে।
লোকটা যতই এগিয়ে আসছে, মনিরা ততই ঐ টেবিলটার দিকে এগুচ্ছে, যে টেবিলে সাজানো রয়েছে কয়েকটা মদের বোতল।
হঠাৎ মনিরা ছুটে গিয়ে একটা বোতল তুলে নিল হাতের মুঠায়।
মাতালটা তখনও দু’হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে!
মনিরা বোতলটা ছুড়ে মারল লোকটার মাথা লক্ষ্য করে।
মুহূর্তে একটা বীভৎস কাণ্ড ঘটে গেল। মনিরার নিক্ষিপ্ত বোতলটা লোকটার মাথায় লেগে খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়ল।
লোকটার মাথা কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে লাগল।
মনিরা দরজা খুলে ছুটে বেরিয়ে গেল।
মাথায় আহত জায়গাটা চেপে ধরে লোকটাও ছুটলো পিছু পিছু।
মনিরা কিছুদূর এগুতেই দেখল সামনে যমদূতের মত দাঁড়িয়ে হেমাঙ্গিনী; খপ করে ধরে ফেলল সে মনিরাকে!
ততক্ষণে মনিরার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে শয়তান মাতালটা। তার সমস্ত শরীর রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে।
হেমাঙ্গিনী ক্রুদ্ধ সিংহীর ন্যায় গর্জন করে উঠল। একবার নয়, দু’বার তার পাওয়া টাকা হাতছাড়া হয়ে গেল। রাগে মনিরার গলাটা দু’হাতে টিপে ধরলো, দাঁতে দাঁত পিষে বলল–তোকে খুন করব!
লোকটা বলে উঠল—আগে আমার টাকা ফেরত দাও, তারপর ওকে যা খুশি কর!
হেমাঙ্গিনী এবারও বাধ্য হলো লোকটার টাকা ফেরত দিতে।
হেমাঙ্গিনী লোকটার টাকা ফেরত দিয়ে পুনরায় মনিরার গলা টিপে ধরলো। নিশ্চয়ই এবার ওকে হত্যা না করে ছাড়বে না। জোরে, খুব জোরে চাপ দিচ্ছে, মনিরার চোখ দুটো কপালে উঠেছে, এবার হয়তো তার জীবন শেষ!
হঠাৎ হেমাঙ্গিনীর চোখের সামনে ভেসে উঠলো গাদা গাদা টাকার বাণ্ডিল। মনিরাকে হত্যা করলে এতগুলো টাকা তার বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হেমাঙ্গিনীর হাত দু’খানা আপনা আপনি শিথিল হয়ে এলো। মনিরাকে ছেড়ে দিল সে।
এরপর থেকে শুরু হলো মনিরার ওপর নির্মম অত্যাচার। প্রতিদিন তাকে একটা থামের সঙ্গে বেঁধে পঁচিশ ঘা বেত মারা হতে লাগল, আর জিজ্ঞাসা করা হতে লাগল, সে ও-রকম কাজ আর করবে কি না। কিন্তু মনিরা পঁচিশ ঘা বেত খেয়েও বলত—সে ও-কাজ করবে।
হেমাঙ্গিনীর কড়া আদেশ, যতদিন মনিরা স্বীকার না করবে বা রাজী না হবে ততদিন এভাবে-বেত্রাঘাত করা হবে।
রোজ মনিরার ওপর এই অকথ্য অত্যাচার চলতে লাগল।
ইতোমধ্যে আরও চারজন যুবতী পাকড়াও করে আনা হয়েছে। পূর্বের শূন্যতা আবার পূর্ণ হয়েছে। সে এক করুণ দৃশ্য! সব মেয়েই কাঁদছে, মাথা কুটে কাঁদছে। সবাই সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে কন্যা-বধু।
আজকাল হেমাঙ্গিনীর ব্যবসা আরও কেঁপে উঠেছে। শুধু নারী ব্যবসাই নয়, শিশু ব্যবসাও সে শুরু করেছে! বিভিন্ন দেশে তার অনুচর ছড়িয়ে রয়েছে। যেখানে যা সুবিধা করতে পারে সে তাই করছে। ছোট ছোট মেয়েকে চালান দেওয়া হয় এ দেশ থেকে সে দেশে।
নারীদেরও সেই অবস্থা!
হেমাঙ্গিনীর সহকারিগণের সংখ্যা এখন অনেক বেশি। ব্যবসা চলছে। পুরাদমে।
০৩.
অশ্বপৃষ্ঠে দস্যু বনহুর আর রহমান ঝিল শহরের শেষ সীমান্তে ভাগিন্দী, নদীর তীরে এসে দাঁড়াল। তাদের বজরা আজ পৌঁছে গেছে। বনহুর আর রহমান নিজেদের বজরায় এসে উপস্থিত হলো।
বনহুর নিজের অনুচরগণের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করল। পথে তাদের কোন অসুবিধা বা কোন বিপদ এসেছিল কিনা তাও জেনে নিল।
না, কোন অসুবিধা বা বিপদের সম্মুখীন হয়নি তার অনুচরগণ। বনহুর আশ্বস্ত হলো।
বনহুর বজরায় প্রবেশ করে নিজের গোপন অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পরীক্ষা করে নিল।
বনহুর আর রহমান যখন বজরা থেকে ফিরে এলো তখনও তাদের শরীরে পূর্বের সেই ভীল সর্দারের ড্রেস। বাগানবাড়িতে প্রবেশ করে নিজের বিশ্রামকক্ষে প্রবেশ করল তারা।
বনহুর আর রহমান একই কক্ষে ঘুমাতো।
সেদিন বাইরে থেকে ফিরতেই একজন রাজকর্মচারী বলল–ভীল সর্দার, আপনাদের কুমার মঙ্গলসিন্ধ পৃথক পৃথক কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন।
রহমান অবাক কণ্ঠে বলল—কেন?
রাজকর্মচারী বলল—আপনাদের যাতে কোন অসুবিধা না হয়, সেই কারণে এরকম সুব্যবস্থা করা হয়েছে।
রহমান আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, বনহুর বাধা দিয়ে বলল–তোমাদের কুমার বাহাদুরকে আমার ধন্যবাদ জানাবে। তার এই সুব্যবস্থার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।
রাজকর্মচারী চলে গেল।
রহমান তাকাল বনহুরের দিকে—সর্দার!
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলল–যাও রহমান, তোমার নিজ বিশ্রাম-কক্ষে যাও।
রহমান কোনদিন তাদের সর্দারের কথার প্রতিবাদ করেনি। আজও সে পারল না, চলে গেল তার নিজের বিশ্রামকক্ষে। যদিও রহমান নিজের কক্ষে গিয়ে শয্যা গ্রহণ করল, কিন্তু মন তার সদা আশঙ্কাগ্রস্ত রইলো। নিশ্চয় এর পেছনে কোন কারণ রয়েছে।
বনহুরও নিজের কক্ষে প্রবেশ করল।
অন্যদিন হলে বনহুর তার ভীল সর্দারের ছদ্মবেশ ত্যাগ করে’ শয্যা গ্রহণ কল্পত। আজ সে ঐ বেশে শয্যায় গিয়ে বসল। একটা নতুন কোন কিছুর প্রতীক্ষা করতে লাগল সে।
রাত বেড়ে আসছে।
বনহুর বিছানায় শুয়ে নিশ্চুপ চোখ বন্ধ করে রয়েছে।
পাশের ঘরে রহমানও বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে, আর মাঝে মাঝে উঠে নিজের জানালা দিয়ে সর্দারের কক্ষে উঁকি দিয়ে দেখে নিচ্ছে।
