এটা আমার বাবার দোষ। বুড়োর ভীমরতি ধরেছে। শুধু তাই নয়, কঙ্কর, বারা আজকাল রাজকোষ থেকে আমার ভাতার পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছে।
কি বললে, তোমার প্রাপ্য টাকা থেকে তুমি বঞ্চিত। যাই বল কুমার, তুমি বলেই বুড়ো রাজাকে আজও তোয়াজ করে চলছ। কেন, রাজ্য চালাবার বয়স কি তোমার হয়নি?
কি করব বল, পিতা গুরুজন–কাজেই তিনি বেঁচে থাকা পর্যন্ত আমাকে এসব সহ্য করেই চলতে হবে। তাছাড়া আর একটা নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে।
কি সমস্যা কুমার?
বাগানবাড়িতে আমরা আমোদ-প্রমোদ করি, এ কথা তিনি জানতে পেরে আমার নিকটে কৈফিয়ত তলব করেছিলেন।
কি জবাব দিয়েছ বন্ধু?
আমরা ক’জন বন্ধু-বান্ধব মিলে একটু গান-বাজনা করি, এটাই কি আপনার সহ্য হয় না, তাহলে আমি দেশ ত্যাগী হবো।
কি বললেন মহারাজ?
একমাত্র সন্তান আমি, দেশ ত্যাগী হলে চোখে অন্ধকার দেখবে, কাজেই বুঝতে পারছো……
বেশ, বেশ বন্ধু,
নর্তকী তখন দুটি কাঁচপাত্রে মদ ঢেলে এগিয়ে ধরে কুমার মঙ্গল সিন্ধ আর কঙ্কর সিংয়ের দিকে।
০২.
কেঁদে কেঁদে মনিরার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। সুঙ্গী মেয়েদের অবস্থা তার মনে ভীণ ভয় লাগিয়ে দিয়েছে। কারণ তার কক্ষে একটা একটা করে অনেকগুলো মেয়ে এসে জড়ো হয়েছিল। সকলের কি মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছে, সব দেখেছে মনিরা। এখন বাকী সে আর একটি মেয়ে—এ মেয়েটি সবচেয়ে বেশি কুৎসিত বলে তার জন্য গ্রাহক হয়নি, আর মনিরা সবচেয়ে সুন্দরী বলে তাকেও কেউ কিনতে পারেনি। মনিরার। মূল্য অন্যান্য যুবতীর তুলনায় চারগুণ বেশি কাজেই মনিরা রয়েই গেছে।
কিন্তু প্রতিমুহূর্তে সে অপেক্ষা করছে, কোন সময় তার অবস্থাও সঙ্গীনিদের মত হবে। তার সম্মুখেই কত মেয়েকে হাত-পা-মুখ বেধে চালান করা হলো। কতজনকে নানা রকম শাড়ি গয়না অলঙ্কারের লোভ দেখিয়ে। নিয়ে যাওয়া হলো। কতজনকে চাবুক মেরে আঘাতের পর আঘাত করে। পাঠিয়ে দেয়া হলো। মনিরা জানে, কোথায় তাদের পাঠানো হচ্ছে। কোথায় তারা চলে যাচ্ছে। যারা যাচ্ছে তারা আর কোনদিন ফিরে আসবে না আসতে পারে না।
অহরহ চোখের পানি আজ মনিরার সম্বল। আজ মনে পড়ে স্বামীর কথা মনে পড়ে শিশু নূরের কথা। মনে পড়ে স্বামীর স্নেহময় আদর-যত্নের কথা।
প্রাণের মায়া মনিরার পূর্ব থেকেই ছিল না, আজও সে করে না। শুধু চিন্তা ইজ্জতের। প্রদীপের ক্ষীণ আলোর মত একটা আশার স্বপ্ন এখনও মনিরার মনে জেগে রয়েছে। একদিন তার স্বামীর ভুল ভাঙবে বুঝতে পারবে তার মনিরা সত্যি অসতী নয়। এ বিশ্বাস যেন তার অটুট থাকে, এটাই শুধু কামনা করে সে।
তাই মনে-প্রাণে সদা খোদাকে স্মরণ করে—হে দয়াময় খোদা, তুমি আমার ইজ্জত রক্ষা কর। আমাকে তুমি পাপিষ্ঠদের হাতে থেকে বাঁচিয়ে নাও।
একদিন মনিরা গভীর রাতে বসে বসে নামায পড়ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করল বিশাল বপু মহিলাটি।
মনিরাকে নামায পড়তে দেখে রাগে বোমার মত ফেটে পড়ল। তখনই হাতে তালি দিল, সঙ্গে সঙ্গে বেঁটে মত লোক সেই কক্ষে প্রবেশ করল।
লোক দুটি আদেশের প্রতীক্ষা করতে লাগল।
বিশাল বপুধারিনী হেমাঙ্গিনী বললো—একে নিয়ে চলো।
মনিরা তখন নামায শেষ করে উঠে দাঁড়িয়েছে। অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকাল হেমাঙ্গিনী আর ঐ জমকালো বেঁটে লোক দু’টির দিকে।
হেমাঙ্গিনী গর্জে উঠল-লিয়ে চল্ বেটারা, হা করে কি দেখছি।
মনিরার দেহে প্রাণ নেই যে, অন্যান্য যুবতীর মর্মবিদারক দৃশ্যগুলো তখন তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। বুঝতে পারল আজ তার পালা, এই বুঝি তার জীবনের শেষ মুহূর্ত।
বেঁটে লোক দুটি মনিরাকে তখন এটে ধরে ফেলেছে। সেকি ভীষণ শক্তি তাদের দেহে। যেন অসুরের বল।
মনিরাকে যখন লোক দুটি জোর করে ধরলো তখন মনিরার সঙ্গিনী সেই কুৎসিত মেয়েটি হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল, ছুটে গিয়ে ওদের দু জনকে ছাড়িয়ে দিতে গেল।
সেই সময় হেমাঙ্গিনী হাতের বেত দিয়ে সপাং করে একটা আঘাত করল মেয়েটার শরীরে।
আর্তনাদ করে উঠল মেয়েটা।
হেমাঙ্গিনী প্রচণ্ড এ ধাক্কায় ফেলে দিল ওকে মেঝেতে।
এবার মনিরাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে চলল বেঁটে লোক দু’টি।
হেমাঙ্গিনী চলল সবার আগে।
কোথা দিয়ে কোথায় যে তাকে নিয়ে এলো মনিরা বুঝতেই পারল না। একটা মস্তবড় সুসজ্জিত কক্ষ। বৈদ্যুতিক আলো জ্বলছে। মনিরাকে সেই কক্ষে ঠেলে দিয়ে লোক দুটো চলে গেল সামনে দাঁড়িয়ে হেমাঙ্গিনী।
কক্ষের ভিতরে ঢুকতেই শিউরে উঠল। একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের মাঝখানে, চোখেমুখে তার লালসাপূর্ণ কুৎসিত চাহনি—হেমাঙ্গিনী বলে উঠল–এই সেই মেয়ে দেখুন।
লোকটা মনিরাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলল খাসা চেহারা, কিন্তু–
আর কিন্তু নয়, দেখুন যদি পছন্দ হয় তবে ঐ পুরোপুরিই দিতে হবে।
তা টাকার জন্য বাধবে না, যা চাও পাবে।
পছন্দ তাহলে হয়েছে?
চমৎকার চেহারা!
হ্যাঁ, হাজারে এমন একটা পাওয়া মুশকিল—বলল হেমাঙ্গিনী।
লোকটা এগিয়ে গিয়ে হেমাঙ্গিনীর কানে কানে কি যেন বলল, তারপর একতোড়া নোট হেমাঙ্গিনীর হাতে খুঁজে দিল।
হেমাঙ্গিনী একটু হেসে বেরিয়ে গেল।
মনিরার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। হায়; এ মুহূর্তে তাকে কে বাঁচাবে, কে তাকে রক্ষা করবে! মনিরা লোকটার দিকে তাকাল। আর একদিন সে এমনি অবস্থায় পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত খুন করতে বাধ্য হয়েছিল সে; কিন্তু আজ সে কি উপায়ে নিজেকে রক্ষা করবে, কোথায় লুকাবে
