গাড়িখানা চলে যেতেই বনহুর হেসে বলল–রহমান, মৃত্যুর প্রথম আলিঙ্গন থেকে প্রথম মুক্তিলাভ।
তাইতো সদার, আর একটু হলেই গাড়িটা আমাদের চাপা দিয়েছিল আর কি–
আবার চলতে শুরু করল ওরা।
বনহুর বলল—ভেবেছিলাম ঝিন্দে এসে নিশ্চিন্তে মনিরার সন্ধান করব কিন্তু তা হলো কই।
রহমান বলে উঠল—কে এই দুশমন, যে প্রথম দিনেই আমাদের পিছু লেগেছে?
অপেক্ষা কর রহমান, শিগগিরই জানতে পারবে।
এখন কোথায় চলছেন স্যার?
কোন একটা ভাল হোটেলে।
হোটেলে কেন, সর্দার, আমরা তো–
হ্যাঁ, মহারাজ জয়সিন্ধের অতিথিরূপে আমরা বেশ আরামেই আছি, কিন্তু আমাদের আর একটা আশ্রয়ের প্রয়োজন, সেখানে আমরা ভীল সর্দার নই; সভ্য নাগরিক। রহমান, একটা কথা–যতক্ষণ আমাদের বজরা সিন্ধি নদী অতিক্রম করে ঝিন্দ শহরে পৌঁছতে সক্ষম না হয়েছে, ততক্ষণ আমাদের কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না।
গোটা দিনটাই বনহুর আর রহমান ভীল সর্দারের বেশে ঝিন্দ শহরের অলিগলি বহু জায়গায় ঘুরে বেড়াল। মাঝে মাঝে কোন হোটেল বা রেস্টুরেন্টে উঠে কিছু কিছু খাওয়া-দাওয়া করে নিল।
সন্ধ্যার পূর্বে বাগানবাড়িতে ফিরে এলো তারা।
বাগানবাড়িতে প্রবেশ করতেই একটা নূপুরধ্বনি তাদের কানে এসে পৌঁছল।
বনহুর বলল চলো রহমান, মঙ্গলসিন্ধের আমোদ কক্ষে যাই, একটু নাচগান দেখে আসি।
হ্যাঁ রহমান, এসো।
বনহুর আর রহমান মঙ্গলসিন্ধের আমোদ কক্ষের দরজায় এসে দাঁড়াল।
কক্ষে তখন পুরদমে নাচগান চলছে।
একদল মাতালের সঙ্গে রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধ তাকিয়ায় ঠেশ দিয়ে বসে, আছে। সামনে কয়েকটা বোতল এবং কাঁচপাত্র।
বনহুর আর রহমানকে দেখতে পেয়ে মঙ্গলসিন্ধ সোজা হয়ে বসল, চোখেমুখে ফুটে উঠল একটা বিদ্রুপভরা হাসির আভাস। মঙ্গলসিন্ধ তার বিশিষ্ট বন্ধু কঙ্কর সিংকে লক্ষ্য করে মৃদু করে কিছু বলল।
কঙ্করসিং উঠে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বনহুর ও রহমানকে অভ্যর্থনা জানাল,–এসো এসো ভীল সর্দার, বস।
বনহুর আর রহমান একবার দৃষ্টি বিনিময় করে নিল। বনহুর এগিয়ে গিয়ে আসন গ্রহণ করল। রহমান তাকে অনুসরণ করল।
একটা নর্তকী তখন নেচে চলেছে।
একপাশে কয়েকজন বাদ্যকর বসে বাজনা বাজাচ্ছিল।
বনহুর আর রহমান বসলো ওপাশে ভিন্ন একটা জায়গায়।
নর্তকীর নাচ-গানে মুগ্ধ হলো বনহুর। সে আপন মনে নর্তকীর নাচ দেখতে লাগল। অপূর্ব, অদ্ভুত সে নাচ।
রহমানের চোখে যুদিও নর্তকীর দিকেই সীমাবদ্ধ ছিল কিন্তু তার দৃষ্টিছিল মঙ্গলসিন্ধের মুখে এবং কক্ষের সকলকেই সে দেখছিল।
মঙ্গলসিন্ধের ইঙ্গিতে একজন লোক ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এটাও লক্ষ্য করল রহমান।
বনহুর আজ তন্ময় হয়ে গেছে ঝিন্দ নর্তকীর নাচ দেখে। নানারকম অঙ্গিভঙ্গি করে নেচে চলছে নর্তকীটি।
একটু পরে লোকটা ফিরে এলো, হাতে তার নতুন একটা মদের বোতল। কিন্তু রহমান সূক্ষভাবে লক্ষ্য করল, বোতলটা নতুন হলেও বোতলের ছিপি সম্পূর্ণ আলগা।
রাজকুমার জয়সিন্ধের ইঙ্গিতে বোতলটা কঙ্করসিংয়ের হাতে দিল লোকটা।
কঙ্কর সিং একটা কাঁচের পাত্র হাতে তুলে নিয়ে বোতল থেকে খানিকটা তরল পদার্থ ঢেলে নর্তকীর দিকে বাড়িয়ে ধরল।
নর্তকী মাচতে নাচতে এগিয়ে এলো কঙ্কর সিংয়ের নিকটে, নাচের ভঙ্গীমায় হাতখানা সে বাড়িয়ে দিল তার দিকে।
কঙ্কর সিং মদের পাত্রটা নর্তকীর হাতে দিয়ে তার কানে মুখ নিয়ে চাপা কণ্ঠে বলল-দক্ষিণ ধারের ভীল সর্দারকে দাও।
নর্তকী মদের পাত্র হাতে নিয়ে ঘূর্ণি হাওয়ার মত ঘুরপাক খেয়ে এগিয়ে চলল। প্রথমে সে রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধের সম্মুখে মদের পাত্রটা এগিয়ে ধরল। মঙ্গলসিন্ধ মদের পাত্র যেমনি হাত বাড়িয়ে নিতে গেল অমনি নর্তকী সুকৌশলে সরে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ভীল সর্দার বেশি বনহুরের সম্মুখে। মদের পাত্রটা এগিয়ে ধরল তার দিকে।
বনহুর অন্যমনস্কভাবে নর্তকীর হাত থেকে মদের পাত্রটা হাতে নিতে গেল।
অমনি রহমান হাত বাড়িয়ে নর্তকীর হাত থেকে মদের পাত্রটা নিয়ে নিল হাতে।
কক্ষে সবাই একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিল।
বনহুর অবাক হয়ে তাকাল রহমানের মুখের দিকে। হঠাৎ তার এ আচরণের জন্য বিস্মিত হলো সে।
রহমান মদের পাত্রটা হাতে নিয়ে নিজের মুখে দিতে গেল, অমনি হাত ফসকে পড়ে গেল মেঝেতে।
কাঁচের টুকরোগুলো খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়ল চারদিকে।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর উঠে দাঁড়াল।
বনহুর উঠে দাঁড়াতেই রহমানও উঠে পড়ল।
নর্তকী চকিতে একবার রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে নিল। সেও উঠে দাঁড়াল চট করে। তারপর ধনহুরের দক্ষিণ বাহুর উপর মাথা রেখে বলল–তুম হারামা পিয়ার হো।
বনহুরের ঠোঁটের ফাঁকে ফুটে উঠল বাঁকা হাসির রেখা, বলল—তুমবি মেরা পেয়ার।
নর্তকী আর ঘনিষ্ঠভাবে বনহুরকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছিল, বনহুর পূর্বের ন্যায় হেসেই বলল–ফির মোলাকাত হোকি। বনহুর বেরিয়ে গেল, রহমান তাকে অনুসরণ করল।
বনহুর আর রহমান বেরিয়ে যেতেই মঙ্গলসিন্ধ কঙ্কর সিংকে লক্ষ্য করে বললো–দেখেছ?
কঙ্কর সিং ঠোঁট উলটে অবজ্ঞাভরে বলল–দেখেছি।
মঙ্গলসিন্ধ বলল–কি মনে হলো?
অদ্ভুত চিজ বলে মনে হলো কুমার। কিন্তু উদ্দেশ্য মহৎ বলে মনে হলো না।
আমারও সেই রকম সন্দেহ হচ্ছে।
মনে হচ্ছে নয় কুমার, একেবারে বাগানবাড়িতে যাকে তাকে স্থান দেওয়া মোটেই উচিত হয়নি।
