ওরা চলে যেতেই রহমান বলল—সর্দার, এটা কি ভাল হলো?
তা পরে দেখা যাবে। এখন বিশ্রামের নিতান্ত প্রয়োজন, বিশ্রাম কর। বালিশটা টেনে নিয়ে শুয়ে পড়ল বনহুর।
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে রহমান খেয়াল নেই তার।
হঠাৎ একটা নারীকন্ঠের করুণ তীব্র আর্তনাদে ঘুম ভেঙে গেল রহমানের। আজ কয়েক দিনের অবিশ্রান্ত পরিশ্রমে ক্লান্তি আর অবসাদে শরীর অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়েছিল, তাই এমনভাবে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে।
ঘুম ভাঙতেই বিছানায় সজাগ হয়ে উঠে বসল। কক্ষের একপাশে একটা লণ্ঠন জ্বলছিল তারই আলোতে রহমান দেখলো বিছানায় বনহুর নেই।
রহমানের মনের ভেতর চড়াৎ করে উঠল, তাকে না জানিয়ে এভাবে কোথায় গেছে সর্দার! বিছানা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল, দরজার দিকে তাকাতেই দেখতে পেল দরজা খোলা। ব্যাপার কি, এ অন্ধকার রাতে হঠাৎ সর্দার গেল কোথায়! যদিও বনহুর দস্যু তবু রহমান একটু আশঙ্কিত হলো। নতুন স্থান, নতুন পরিবেশ, রাত দুপুরে তাকে না জানিয়ে কোথায় গেল সর্দার? তারপর নারীকন্ঠের তীব্র করুণ আর্তনাদ।
রহমান কান পেতে রইলো, না আর কোন শব্দই সে শুনতে পেল না।
ধীরে ধীরে দরজা দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল।
যদিও রহমান এবং বনহুরের শরীরে ভীল সর্দারের ড্রেস ছিল, কিন্তু নিচে ছোট্ট প্যান্ট পরা ছিল, তাতে লুকানো ছিল ছোরা আর পিস্তল। আর ছিল গুলি। প্রকাশ্যে তাদের পিঠে বাঁধা থাকত তীরধনু।
রহমান প্যান্টের পকেট থেকে ক্ষুদ্র রিভালবারখানা নিয়ে অন্ধকারে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এগুলো।
বাগানবাড়ির পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো রহমান, বড় ঘরটার মধ্যে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই শিউরে উঠল।
কুমার মঙ্গলসিন্ধের সামনে মেঝেতে পড়ে রয়েছে একটি যুবতীর রক্তাক্ত মৃতদেহ।
রহমান তার উদ্যত রিভলবার হাতে খোলা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে কে যেন তার কাঁধে হাত রাখল।
অন্ধকারে চমকে ফিরে তাকালো রহমান, অস্ফুট চাপাকণ্ঠে বলল–সর্দার। খুন!
বনহুর ঠোঁটে আংগুল চাপা দিয়ে বলল–চুপ!
১.১০ ঝিন্দ শহরে দস্যু বনহুর
০১.
বনহুর আর রহমান নিজেদের কামরায় ফিরে এলো।
যার যার বিছানায় আশ্রয় গ্রহণ করল তারা। রহমান শয্যায় বসে বললসর্দার, যুবতীটাকে হত্যা করা হয়েছে।
হ্যাঁ রহমান, আমার মনে হয় এমনি প্রতি রাতে ওখানে একটা নারী হত্যা হয়ে থাকে।
রহমান অস্ফুট কণ্ঠে বলল–কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য।
ভাগ্যিস তুমি ভিতরে লাফিয়ে প্রবেশ করনি রহমান।
সর্দার আর একটু হলেই আমি ভিতরে প্রবেশ করে কুমার মঙ্গলসিন্ধকে তার উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে দিতাম।
ভুল করতে রহমান। কারণ এখনও আমরা কোন সিন্ধান্তেই উপনীত হতে সক্ষম হইনি। বিশেষ করে এখনও আমাদের অনেক জানার বাকী রয়েছে।
না জানি বৌরাণী কোথায়।
হ্যাঁ রহমান। একটু থেমে পুনরায় বলে উঠল বনহুর–কি অবস্থায় আছে সে বেঁছে আছে কিনা, তাই বা কে জানে। রহমান যদি তার কিছু হয়ে থাকে সে জন্য দায়ী আমি আমি। আমারই ভুলের জন্য একটি সুন্দরী ফুলের মত জীবন–
রহমান হলে উঠে–সর্দার, আমার মন বলছে, তিনি বেঁছে আছেন, ভালই আছেন–
তোমার কথা যেন সত্য হয় রহমান। বনহুর চাদরটা গায়ে টেনে শুয়ে পড়ল।
রহমানও শয্যা গ্রহণ করল।
কিন্তু কারও চোখে ঘুম নেই—একটু পূর্বে যে দৃশ্য তারা দেখেছে তা অতি জঘন্য–অতি মর্মান্তিক। এ দৃশ্য দেখার পর কারও চোখে ঘুম আসতে পারে না।
মহারাজ জয়সিন্ধের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছিল বনহুর-আর রহমান ভেবেছিল সত্যি এ এক মহৎ রাজার দেশে তারা এসেছে। এ রাজ্য থেকে তারা অতি সহজেই তাদের অভিসন্ধি পূরণ করতে সক্ষম হবে।
বনহুর আর রহমানের ঝিন্দ আগমনের উদ্দেশ্যই মনিরাকে এবং তার সন্তানকে খুঁজে বের করা। অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না বনহুরের মনে। মনিরাকে খুঁজে পেলেই তারা ফিরে যাবে নিজ আস্তানায়। সৎ মনোভাব নিয়েই বনহুর আর রহমান ঝিন্দের মহারাজ জয়সিন্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিল যাতে তাদের আগমনে ঝিন্দবাসীদের মনে কোন সন্দেহ জাগতে না পারে।
কিন্তু প্রথম রাতেই বনহুর আর রহমান বুঝতে পারল তাদের এ আগমন যত সহজ ও স্বাভাবিক ভেবেছিল তা নয়। বিরাট একটা রহস্যজাল ছড়িয়ে রয়েছে এ রাজ্যের মধ্যে। কৌশলে এ রহস্য জাল তাকে গুটাতে হবে—এর গুপ্ত রহস্য ভেদ করতে হবে।
বনহুরের শরীরের মাংসপেশীগুলো তার চিন্তাধারার সংগে সংগে স্ফীত হয়ে উঠলো। ধমনীর রক্ত হয়ে উঠল উষ্ণ। চোখ দুটো জ্বলে উঠল ধক ধক করে। দাঁতে দাঁত পিষে বলল—নরপিশাচ মঙ্গলসিন্ধ তোমার সঙ্গে আমার বুঝাপড়া হবে।
বনহুর বুঝতে পেরেছে, রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধ শুধু অমানুষ নয়, সে . একজন দুশ্চরিত্র এবং নারী হত্যাকারী।
বাকী রাতটুকু নানা চিন্তায় কাটল বনহুরের।
ভোরে শয্যা ত্যাগ করে বললো বনহুর রহমান, তৈরি হয়ে নাও, বাইরে বের হব।
রহমান বলল–আমি প্রস্তুত সর্দার।
বনহুর আর রহমান ভীল সর্দারের নিখুঁত ছদ্মবেশ ধারণ করে বাগান বাড়ি থেকে বের হলো। রাজপথ ধরে হেঁটে চলল তারা।
মাত্র কিছুদূর এগিয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ট্যাক্সি সাঁ করে চলে গেল তাদের পাশ কেটে। বনহুর দ্রুতহস্তে রহমানকে একটু পাশে ঠেলে দিয়ে নিজেও সরে দাঁড়িয়েছিল, নইলে তক্ষুণি তাদের চাপা দিয়ে চলে যেত গাড়িটা।
