আজ হঠাৎ কেন যেন বনহুরের দৃষ্টি মনির মুখে পড়তেই হৃদয়ে একটা আলোড়ন অনুভব করলো, তাজের পিঠে চাপতে গিয়ে ফিরে এসে মনিকে তুলে নিল কোলে। একটু আদর করে পুনরায় নূরীর কোলে ফিরিয়ে দিয়ে বললো–খোদা হাফেজ!
বনহুর তাজের পিঠে চেপে বসল।
রহমান চেপে বলল তার দুলকির পিঠে।
নূরী নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে রইলো বনহুরের দিকে। বনহুরের অশ্ব তাজ ও রহমানের অশ্ব দুলকি তখন ছুটতে শুরু করেছে।
হঠাৎ মনি শব্দ করে উঠল–বা ব্বা ব্বা—
নূরী চমকে উঠল, মৃদু চাপাকণ্ঠে বলল–কই, তোমার বাব্বা মনি? চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিল মনির গাল দুটো।
বনহুর আর রহমানের অশ্ব তখন অদৃশ্য হয়েছে।
গহন বনের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে দস্যু বনহুর আর রহমান। বলিষ্ঠ দুই ভীল সর্দার যেন শিকারের অন্বেষণে চলেছে, তেজোদ্দীপ্ত মুখমণ্ডল বিশাল বৃক্ষ, বলিষ্ঠ বাহু দেখলেই মনে হয় শক্তিশালী বীর পুরুষ এরা।
২৩.
ঝিলে পৌঁছে বনহুর আর রহমান ভীল সর্দারের বেশেই ঝি রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করল। ঝিন্দ রাজার জন্য উপঢৌকন স্বরূপ বনহুর আর রহমান দুটো হরিণ শিকার করে নিয়ে গিয়েছিল, তাই দিল।
ঝিন্দ রাজা হরিণ পেয়ে অনেক খুশি হলেন। বনহুর আর রহমানকে সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন। এই বিদেশী ভীল সর্দারদ্বয়ের যেন কোন অসুবিধা না হয় সেজন্য জয়সিন্ধ তার লোকদের আদেশ দিলেন।
রাজ-অন্তপুরের একটি কক্ষে বনহুর আর রহমানের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হলো, কিন্তু বনহুর এতে রাজী হলো না, আপত্তি জানিয়ে বলল–মহারাজ, আমরা ভীল জাতি, আমাদের থাকার জন্য ঘরদোর দরকার হবে না, শুধু আপনার রার্জ্যে থাকার অনুমতি চাই।
বৃদ্ধ মহারাজ কিছুতেই সম্মতি দান করলেন না, তিনি বললেন—হাজার হলেও আপনারা আমার অতিথি, কাজেই আপনাদের থাকা ও খাবার ব্যবস্থা আমারই করা দরকার। বেশ, আমার বাগানবাড়ির একটি কক্ষে আপনাদের থাকার সুব্যবস্থা করা হবে।
শেষ পর্যন্ত বনহুর আর রহমান মহারাজ জয়সিন্ধের কথায় রাজী হয়ে গেল।
ফলে ফুলে ভরা সুসজ্জিত বৃহৎ বাগানবাড়ি।
মহারাজ জয়সিন্ধ বৃদ্ধ অবস্থায় বাগানবাড়িতে না এলেও তার পুত্র মঙ্গলসিন্ধ বাগানবাড়ি সরগরম করে রেখেছিল। কাজেই বাগানবাড়ির জৌলুস পূর্বের চেয়ে এখন আরও জাকালো রয়েছে।
বাগানবাড়ির একটি নিভৃত অংশে বনহুর আর রহমানের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। বাগানবাড়ির অদূরে একটা ছোট অশ্বশালা ছিল, সেখানে তাদের অশ্ব দুটি রাখার ব্যবস্থা হয়েছে।
রাজা স্বয়ং এই ভীল অতিথিদ্বয়কে আশ্রয় দিলেন।
সঙ্গে সঙ্গে কথাটা তাঁর পুত্র মঙ্গল সিন্ধের কানে গেল। মঙ্গল সিন্ধ তখন বাগানবাড়ির একটি বড় কক্ষে দলবল নিয়ে বাঈজী নাচে মশগুল।
কথাটা কানে যেতেই দু’চোখ তার ধক করে জ্বলে উঠল। এ বাগানবাড়ির একমাত্র অধিকারী এখন সে। তখনই সে দু’জন সঙ্গীকে আদেশ দিল, যাও-সেই ভীল সর্দারদ্বয়কে ডেকে আন আমার কাছে।
বনহুর আর রহমান সবেমাত্র বিশ্রামের আয়োজন করছিল ঠিক সেই মুহূর্তে দু’জন লোক এসে জানাল –তোমাদের দু’জনকে রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধ ডেকেছেন।
রহমান তাকালো বনহুরের দিকে—
বনহুর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল–গিয়ে বল আমরা ক্লান্ত এখন যেতে পারব না।
লোক দু’জন ফিরে গিয়ে কথাটা জানালো মঙ্গলসিন্ধকে।
রাগে গর্জে উঠল কুমার মঙ্গলসিন্ধ–কি বললে, এত সাহস সামান্য ভীল সর্দারের যে, আমার আদেশ অমান্য করে! যাও পুনরায় গিয়ে বল এখনি আমি তাদের চাই।
আবার লোক দুটি ছুটলো।
বনহুর এবার লোক দুটিকে দেখে সোজা হয়ে বসল, বলল –কি খবর বান্দা?
লোক দুটির একজন বলে উঠল–এখনই যেতে হবে। না গেলে চলবে।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলল–তাকেই আসতে বল, যদি তার বিলম্ব সহ্য না হয়।
এবারও ফিরে গেল ওরা।
ভীল সর্দারদ্বয়ের কথা শুনে রেগে আগুন হলো কুমার মঙ্গলসিন্ধ, ক্রুদ্ধ ভাবে উঠে দাঁড়াল চল দেখে নেব কোন রাজা মহারাজা তারা।
কুমার মঙ্গলসিন্ধ হাজির হলো বাগানবাড়ির সেই কক্ষে, যে কক্ষে দস্যু বনহুর আর রহমানকে থাকতে দেয়া হয়েছে। .
মঙ্গলসিন্ধ ও তার সঙ্গীদ্বয় কক্ষে প্রবেশ করতেই রহমান উঠে দাঁড়াল, বনহুর যেমন শুয়েছিল তেমনি রইলো। কোন অভিবাদন বা সম্ভাষণ জানালো না।
মঙ্গলসিন্ধের চোখে-মুখে তখন মদের নেশা, বনহুরের তাচ্ছিল্য ভাব লক্ষ্য করে হুঙ্কার ছাড়ল আমি ডেকেছিলাম কেন যাওনি?
বনহুর হেসে বলল—বিনা কারণে ডাকলে আমি যাই না।
কি বললে ভীল সর্দার, আমি তোমাকে বিনা কারণে ডেকেছি!
তা নয় তো কি?
আমি জানতে চাই কার হুকুমে তোমরা আমার বাগানবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছ?
বনহুর মৃদু হেসে বলল তোমার পিতার কাছে এ প্রশ্ন করলে জবাব পাবে।
এ বাগবাড়ি আমার।
না, তোমার পিতার। তাঁর আদেশেই আমরা বাগানবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।
তিনি বৃদ্ধ, এখন তাঁর মতিভ্রম ঘটেছে। নইলে সামান্য ভীল সর্দার তার বাগানবাড়িতে স্থান লাভ করে! শোন ভীল সর্দার, যদি তোমরা মঙ্গল চাও,
তবে এক্ষুনি আমার বাগানবাড়ি ত্যাগ কর।
নইলে কি করবে রাজকুমার? বলল বনহুর।
তোমাদের আমি শাস্তি দেব, কঠিন শাস্তি।
অতি উত্তম। এখন বিশ্রাম করতে দাও। যাও, তোমরা। বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলল।
তখনকার মত কুমার মঙ্গলসিন্ধু বিদায় নিতে বাধ্য হল।
চলে যাবার সময় কটমট করে বনহুর আর রহমানের মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বেরিয়ে গেল।
