বলেই চলেছে কায়েস–এরপর থেকে আমি বৌরাণীকে সব সময় ভালভাবে দেখাশোনা করতে লাগলাম। প্রতীক্ষা করতে লাগলাম সেই নতুন অতিথির যে আমাদের বৌরাণীর গর্ভে বিরাজ করছে কিন্তু সে আশা আমার সফল হলো না সর্দার–আমি ক’দিনের জন্য বাইরে গিয়েছিলাম কিন্তু ফিরে এসে দেখি সব শূন্য—বৌরাণী নেই। বাড়ির কেউ তার সন্ধান দিতে পারল না। কিছুদিন পূর্বের একটি ঘটনার জন্য আমার মনে আশংকা হলো। একদিন একটি সিনেমা হলে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক বৌরাণীকে দেখে মেয়ে বলে আঁকড়ে ধরল এবং এমন সব কথাবার্তা বলতে লাগল যা আমার মনে সন্দেহ জাগিয়েছিল। সর্দার, বৌরাণীকে আমি জোর করে সিনেমায় নিয়ে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম দিনরাত বসে বসে কাঁদাকাটা করেন বাইরে বেরুলে মনটা একটু ভাল হবে। আমার মনে হয়, সেই বৃদ্ধবেশি কোন শয়তান তাকে নিজের ব্যবহার দ্বারা মুগ্ধ করে–
এতক্ষণে বনহুর কথা বলল–হ্যাঁ সে বৃদ্ধ অন্য কেউ নয়, নরাধম পাষণ্ড শয়তান মুরাদ।
সর্দার, বৌরাণী তবে মুরাদের হাতে বন্দী?
এক সময় ছিল আজ আর নেই। আমি মুরাদকে হত্যা করেছি—
বৌরাণী—বৌরাণী কোথায় তবে সর্দার?
বনহুর দৃষ্টি নত করে নিল, তারপর ব্যথিত কণ্ঠে বলল——জানি না।
কায়েস আর্তনাদ করে উঠল–বৌরাণী এবং তার সন্তান–কারও কথাই আপনি জানেন না সর্দার?
কায়েস, জানি না তারা এখন কোথায়। সর্দার, বৌরাণীর কি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে? ব্যাকুল আগ্রহে প্রশ্ন করল কায়েস।
বনহুর একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল–তাও জানি না।
এবার রহমান বলে উঠল–সে কি সর্দার, বৌরাণীর কি সন্তান ওগ্রহণ করেছে তাও জানেন না? তার সঙ্গে নাকি আপনার সাক্ষাৎ ঘটেছিল?
হ্যাঁ ঘটেছিল, কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য। আমি দূর থেকে শুধু তার সন্তানকে দেখেছিলাম।
কায়েস অস্ফুট শব্দ করে উঠলো–নিজের সন্তানকে আপনি দেখেও দেখেননি!
কায়েস, আমি তাকে ভুল বুঝেছিলাম। শয়তান মুরাদ মরার সময় আমার মনে বিষবাণ নিক্ষেপ করে গিয়েছিল, তাই আমি মনিরাকে ভুল বুঝেছিলাম কায়েস, তাকে ভুল বুঝেছিলাম–বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে বনহুরের কণ্ঠ।
রহমান এবং কায়েস বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে। বনহুরের চোখে মুখে একটা অসহ্য বেদনার ছাপ ফুটে উঠল। দক্ষিণ বাহু দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল বনহুর।
এতদিনে রহমানের কাছে সর্দারের মনোভাব প্রকাশ হয়ে পড়ে। কেন সর্দার ফিরে আসার পর এমন মৌন হয়ে পড়েছিল। সব সময় গভীরভাবে কি চিন্তা করত, হঠাৎ আবার কেনই বা এমন ভীষণভাবে ক্ষেপে উঠেছে। পূর্বের চেয়ে আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে সর্দার এখন–সব আজ পরিষ্কার হয়ে যায় রহমানের কাছে। শান্তকণ্ঠে বলল রহমান সর্দার, বৌ রাণী এখন কোথায় আছে বলতে পারেন?
বনহুর চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। ব্যথাকরুণ দৃষ্টি নিয়ে তাকালো রহমানের মুখে, বলল–জানি না। তবে যতদূর সম্ভব সে এখনও ঝিল। শহরেই আছে।
কোথায় আছে, কেমন আছে তাও জানেন না? কায়েস প্রায় কেঁদে ফেলল।
রহমান বলল–সর্দার, আর বিলম্ব করা উচিত নয়, আজই আমরা ঝিন্দ শহর অভিমুখে রওয়ানা দেব। না জানি বৌরাণী কোথায় আছেন, কেমন আছেন। বিশেষ করে তিনি মেয়েলোক। কোলে তাঁর কচি সন্তান।
হ্যাঁ রহমান, তাই কর, তাই কর–কিন্তু সে বেঁচে আছে কিনা কে জানে!
বনহুর নিজের কক্ষে বসে গভীরভাবে মনিরার কথা চিন্তা করছিল। কি অন্যায় সে করেছে মনিরার ওপর! তাকে পেয়েও হারিয়েছে, একটা মিথ্যা সন্দেহে তার প্রতি কি নির্মম আচরণ করেছে। কি অন্যায়ই না সে করেছে। মনিরা তার এ কঠিন ব্যবহার কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না—অভিমানিনী মনিরা হয়তো আত্মহত্যা করেছে। না না, তা পারবে না–কোলে যে কচি শিশু–তার স্বামীর সন্তান। মিথ্যা কলঙ্কের ভয়ে এত বড় সত্যকে সে নষ্ট করতে পারে না। কিন্তু ঝিল শহর তার একেবারেই অপরিচিত কেউ তাকে চেনে না, জানে না। সেও কাউকে জানে না, শোনে না; কোন জায়গা চেনে না। এখন ঝিন্দ শহরে কোথায় তাকে খুঁজবে, কোথায় পাবে—
হঠাৎ বনহুরের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে যায়, কক্ষে প্রবেশ করল নূরী, কোলে তার মনি।
নূরী বনহুরকে লক্ষ্য করে বলল—দেখ হুর, মনি কেমন হাসছে।
বনহুর অন্যমনস্কভাবে তাকালো মনির দিকে, তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আর একটি কচি মুখ। আনমনা হয়ে গেল বনহুর।
নূরী অভিমানভরা কন্ঠে বলল–কি হলো আজ আবার তোমার?
কুঞ্চিত করে একটু হাসল বনহুর–কেন?
মনে হচ্ছে কিছু যেন হয়েছে।
তুমি দেখছি গণনা জান।
সত্যি হয়েছে কিনা বল?
হয়েছে, আমাকে আজই ঝিন্দে যেতে হবে।
সিন্ধি নদীর ওপারে?
হ্যাঁ, নূরী, সিন্ধি নদীর ওপারে–যাক, চলো একটু গল্প করা যাক।
মনিকে আজ তুমি আদর করছ না কেন?
মনির গালে মৃদু টোকা দিয়ে বলল বনহুর–এই তো করছি।
আবার বনহুর আর নূরী মেতে উঠল মনিকে নিয়ে।
২২.
ঝিন্দ শহরে যাবার জন্য নূরী বনহুরকে নিজের হাতে সাজিয়ে দিল। একজন ভীল সর্দারের বেশে, সজ্জিত হলো বনহুর।
রহমানও বনহুরের মতই ভীলের সাজে সজ্জিত হলো। স্থলপথেই বনহুর এবং রহমান ঝিন্দ রওয়ানা দিল। অবশ্য একখানা বজরা জলপথে চলল তাদের জিনিসপত্র ও অন্যান্য অনুচর নিয়ে।
ভীল সর্দারের বেশে সজ্জিত হয়ে তাজের পাশে গিয়ে দাঁড়াল বনহুর আর রহমান।
নূরী এসে দাঁড়াল তার পাশে, কোলে মনি।
