কায়েস বনহুরের নিকটবর্তী হয়ে পুনরায় আনন্দভরা গলায় বলে উঠল–সর্দার, আপনি জীবিত।
বনহুর বলল –কে তুমি?
কায়েস ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল–আমাকে চিনতে পারছেন না সর্দার? আমি–আমি কায়েস–
তুমি কায়েস! সঙ্গে সঙ্গে বনহুরের মুখমণ্ডল গম্ভীর হলো। মনিরার নিরুদ্দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কায়েসের। তার চক্রান্তেই হয়তো মনিরা বিপথে গিয়েছিল। তাই বনহুর ভুলেও কোনোদিন কায়েসের নাম : মুখে আনেনি। রাগে ক্ষোভে অভিমানে বনহুর দগ্ধীভূত হয়েছে তবু কোনদিন মনিরা বা কায়েসের সন্ধান নেয়নি।
রহমান যদি কোনদিন বলেছে মনিরা বা কায়েসের সম্বন্ধে কোন কথা, তাহলে বনহুর ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছে। কোন অনুচর ভয়ে কোনদিন কায়েসের নাম মুখে আনার সাহস পায়নি, আজ সেই কায়েস স্বয়ং দস্যু বনহুরের সামনে হাজির!
বনহুর গর্জন করে উঠল–বদমাশ কোথা থেকে এলি তুই! জানিস তোর জন্য মৃত্যু দণ্ডাদেশ দেয়া রয়েছে?
কায়েসের মুখমণ্ডল বিষণ্ণ হলো, ব্যথাকাতর কণ্ঠে বলল–সর্দার, আমার অপরাধ?
বনহুর আসন থেকে উঠে দাঁড়াল, তারপর বলল–রহমান, ওকে আমার বিশ্রামকক্ষে হাজির করো। কথা শেষ করে বেরিয়ে গেল বনহুর।
দরবারকক্ষে একবার সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিল। রহমান বলল–একে আমার সঙ্গে নিয়ে এসো।
দু’জন অনুচর পুনরায় কায়েসের হাত দু’খানা পিছমোড়া করে বেঁধে নিয়ে চলল।
রহমান বনহুরের কক্ষে প্রবেশ করে দেখল বনহুর ক্ষিপ্তের ন্যায় পায়চারী করে চলেছে।
কায়েস এবং দু’জন অনুচরসহ রহমান প্রবেশ করতেই বনহুর থমকে, দাঁড়াল।
রহমান অনুচরদ্বয়কে বেরিয়ে যাবার জন্য ইংগিত করল।
কায়েস এবং রহমান দাঁড়িয়ে রইলো শুধু। কায়েসের চোখে মুখে এখনও আনন্দের ছাপ, যদিও তার হাত দু’খানা পুনরায় কঠিন ভাবে বেঁধে দেয়া হয়েছে।
বনহুর কঠিন কণ্ঠে বলল–জান তোমাকে এখনই হত্যা করা হবে?
আমি কি অপরাধ করেছি মৃত্যুদণ্ডের পূর্বে তা জানতে চাই। তারও পূর্বে আর একটি কথা আমাকে বলুন, আমাদের বৌ-রাণী কোথায়; তার সন্তান কোথায়?
প্রচন্ড আক্রোশে হুঙ্কার ছাড়ে বনহুর–চুপ কর বদমাশ। ও নাম আর। আমার সামনে উচ্চারণ করিস না। পাপিষ্ঠা–রাগে ক্রোধে ফোঁস ফোঁস করতে থাকে বনহুর। দু’চোখে যেন আগুন ঝরে পড়ে।
রহমান নতমস্তকে দাঁড়িয়ে রইলো, বনহুরের দিকে তাকাবার সাহস হলো না তার।
কায়েস যখন বলে উঠছিল–বৌরাণী কোথায়, তার সন্তান কোথায়, তখন বিস্ময়ভরা চোখে রহমান তাকিয়ে দেখছিল একবার কায়েসের মুখে, একবার বনহুরের মুখে। বৌরাণী হারিয়ে গেছে, কার সঙ্গে গেছে, কোথায় গেছে এসবের কিছুই জানে না সে। তার আবার সন্তান–এসব কি শুনছে রহমান! এতদিনে রহমান বুঝতে পারলো, তার সর্দারের মনের মধ্যে একটা গভীর বেদনা নীরবে লুকিয়ে আছে, যা আর কেউ জানে না। এবার বুঝতে পারলো সে আর একমাত্র জানে কায়েস। রহমান নিশ্চুপ পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলো। মনের মধ্যে নানা রকম প্রশ্ন উঁকি দিয়ে যাচ্ছে–তবে কি তাদের প্রিয় বৌরাণী–ঐ রকম কিছু ঘটেছে যা সর্দার আজও কারও কাছে প্রকাশ করেনি বা করতে পারেনি। এমন কি তাকেও কোনদিন এ সম্বন্ধে কোন কথা বলেনি।
রহমান পুনরায় তাকাল কায়েসের দিকে।
কায়েস তখনও উফুল্ল মুখে বনহুরের দিকে তাকিয়ে আছে।
বনহুর অধর দংশন করে বলল–শয়তান, বল–মনিরা কি করে ঐ পাপিষ্ঠ মুরাদের হাতে গিয়ে পড়ল।
অবাক হয়ে তাকাল কায়েস, বলল–বৌরাণী তবে নরাধম মুরাদের কবলে পড়েছিল? আপনি ঠিক জানেন সর্দার?
কেন, তুই জানিস না! নেকামি করছিস?
না সর্দার, আমি শপথ করে বলছি বৌরাণী কোথায় গেছে, কে তাকে : হরণ করে নিয়ে গেছে, এসবের কিছু জানি না।
আমার কাছে মিথ্যা কথা! জানিস মিথ্যা কথার শাস্তি কি?
জানি সর্দার আমি যা বলছি তার একটি বর্ণও মিথ্যা নয়। সর্দার, আজ আমার এ অবস্থা কেন? আজ আমি মৃত্যুপথের যাত্রী–শুধু বৌরাণীর জন্যই আজ আমার এ অবস্থা–তার সন্ধানে গিয়েই আমি বন্দী হয়েছিলাম–
বনহুর এতক্ষণে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকাল কায়েসের মুখে, একটা ব্যাকুল আগ্রহফুটে উঠল তার চোখে।
কায়েস বলে চলেছে। বনহুর নিরুদ্দেশ হবার পর থেকে সব কথা একটি পর একটি বলছে–সর্দার, আপনাকে নদীবক্ষে ত্যাগ করে যখন আমরা ফিরে গেলাম তখন বৌরাণীকে কিছুতেই নিয়ে যাওয়া যায় না, আত্মবিসর্জন দেবেন সিন্ধি নদী বক্ষে। অতি কষ্টে নানা উপায়ে তাকে এক রকম বন্দিনী অবস্থায় নিতে হলো। কিন্তু ঝিন্দ শহরে পৌঁছে তাঁর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়ল। সর্দার কি বলবো, আপনার শোকে তিনি পাগলিনী প্রায় হয়ে পড়লেন। আহার দ্রিা কিছুই ছিল না তার। অহরহ শুধু নীরবে বসে কাদতেন। এক সময় তিনি ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সব সময় মাথাধরা গা বমি বমি করত—কিছু খেলে অমনি বমি করতেন। আমি তার এমন অবস্থা দেখে চিন্তিত হলাম–
বনহুর গভীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে কায়েসের মুখের দিকে। তার দু’চোখে ফুটে উঠেছে রাজ্যের আকুলতা।
রহমানের অবস্থাও তাই, নিশ্চুপ হয়ে শুনছে সে ওর কথা। কায়েস বলে চলেছে–ডাক্তার ডাকলাম, ডাক্তার বৌরাণীকে পরীক্ষা করে বলল–বৌরাণীর গর্ভে সন্তান আছে। সর্দার সেকি আনন্দ। ভুলে গেলাম আপনাকে হারানোর ব্যথা। বৌরাণীর গর্ভে আমাদের সর্দারের সন্তান—এ যে কত খুশির কথা–বলতে বলতে কায়েসের চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
