সকলের মনেই দস্যু বনহুরের নামে আতঙ্ক। নারীহরণ, শিশুহরণ, অর্থহরণ সবই নাকি দস্যু বনহুরের কাজ।
বনহুর অজস্র টাকা লুট করে আবার তার ভাণ্ডার পূর্ণ করে তুলল। আবার সে ইচ্ছামত অর্থ ছড়িয়ে দিতে লাগল দীনহীন জনগণের মধ্যে। ইচ্ছমত নষ্টও করতে লাগল সে ঐ সব লুটতরাজের মালামাল।
নূরী অবাক হয়ে বলল, একদিন সে হুর, তুমি আবার এমন ভাবে ক্ষেপে উঠলে কেন? আমার কিন্তু আশঙ্কা হচ্ছে।
হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল বনহুর কিসের আশঙ্কা নূরী?
সাতবার জয়ী হয়ে একবার যদি পরাজিত হও!
বনহুর নূরীর গালে মৃদু টোকা দিয়ে বলল—তোমার মনে এ দুর্বলতা শোভা পায় না নূরী। তুমি কি চাও, আমি পরাজিত হই?
ছিঃ এ কথা তুমি বলতে পারলে হুর! তোমার পরাজয় আমি কামনা করতে পারি! অভিমানে ভরে উঠল নূরীর মুখ।
বনহুর নূরীকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে বলল—নূরী, তুমি রাগ কর না, আমি যে তাহলে দিশেহারা হয়ে পড়ব।
কিন্তু তুমি কেন আবার এভাবে নিজেকে মাতিয়ে তুললে হুর? বেশ তো শান্ত হয়ে এসেছিলে?
বনহুর নূরীকে ছেড়ে দিয়ে বলল—নূরী, তুমি কি চাও, আমি নির্জীবের মত নীরব হয়ে পড়ি?
না, তা চাই না, কিন্তু—
হেসে উঠল বনহুর-নূরী, সিংহশাবক কোনদিন চুপ থাকতে পারে না। ক্তের পিপাসা তাকে চুপ থাকতে দেয় না—
তুমি কি উম্মাদ?
হ্যাঁ হ্যাঁ, নূরী যা বলো তাই।
এত অর্থ তুমি কি করবে হুর?
অর্থ? যে প্রশ্ন তুমি করেছ নূরী তা অতি সত্য। কিন্তু জানতোঅর্থ আমি নিজের জন্য জমা রাখি না। আমার লাখ লাখ অসহায় দীনহীন অভাগা ভাইবোনদের মাঝে বিলিয়ে দেই।
জানি হুর, সব জানি, তবু প্রশ্ন করি।
না নূরী, এ প্রশ্ন তুমি আর আমাকে কর না।
২০.
কায়েস অনেক সন্ধান করেও যখন মনিরা ও তার সন্তানের কোন খোঁজ পেল না তখন হতাশায় তার মন ভেঙ্গে পড়ল। এভাবে পথে পথে ঘুরে আর তার কোন লাভ হবে না। মনে পড়লো রহমানের কথা, মনে পড়লো অন্যান্য সঙ্গীর কথা। তার কান্দাই বনের আস্তানায় ফিরে যাওয়া উচিত। সেখানে রহমান আছে, আরও দলবল আছে। তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে আবার সে ঝিন্দ শহরে আসবে। ঝিন্দে প্রতিটি বাড়ি সে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখবে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে তার সর্বাবপত্নী. মনিরাকে? যদি তারা বেঁচে থাকে নিশ্চয়ই একদিন না একদিন খোঁজ বের করবই।
কায়েস এবার ফিরে চলল কান্দাহ আস্তানায়।
পয়সা ছিল না তার, ভিখারীর বেশে একদিন কান্দাই এসে পৌঁছল।
অতি কষ্টে একদিন সে নিজেদের আস্তানায় আসতেও সক্ষম হল। কিন্তু তার চেহারা এমনভাবে বদলে গেছে যে, তাকে দেখে তার অতি আপনজনও চিনতে পারবে না।
কায়েস যখন তাদের আস্তানায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিল তখন তাকে বনহুরের কয়েকজন অনুচর পাকড়াও করে ফেলল।
গুপ্তচর ভেবে তাকে ওরা, মজবুত করে বেঁধে নিয়ে এলো বনহুরের দরবারে।
বনহুর তখন সুউচ্চ আসনে উপবিষ্ট। সামনে দণ্ডায়মান তার অনুচরগণ। দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে তারা। নতুন কোন জায়গায় হানা দেবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল দস্যু বনহুর।
রহমান তার দক্ষিণ পাশে দণ্ডায়মান।
প্রত্যেকটা অনুচরের হাতে সুতীক্ষ্ণধার বর্শা, বল্লম ও রাইফেল।
এমন সময় দরবারকক্ষে প্রবেশ করল বনহুরের দু’জন অনুচর। কুর্ণিশ জানিয়ে বলল–সর্দার একজন গুপ্তচর ধরা পড়েছে।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলল—গুপ্তচর?
হ্যাঁ সর্দার। লোকটা আমাদের আস্তানায় প্রবেশের চেষ্টা করছিল।
রহমান বলে উঠল—এত সাহস তার!
বনহুর বলল–গুপ্তচর মৃত্যুভয়ে ভীত হয় না রহমান। প্রাণ দিয়ে ওর সংবাদ সংগ্রহ করে থাকে।
রহমান বলে উঠল, নিশ্চয়ই পুলিশের গুপ্তচর হবে।
বনহুর বলল—নিয়ে এস তাকে।
অনুচরদ্বয় চলে গেল, একটু পরে জীর্ণশীর্ণ কঙ্কালসার কায়েসকে পিছমোড়া করে বেঁধে দরবারকক্ষে নিয়ে এলো।
কায়েস দরবারকক্ষে প্রবেশ করতেই বিস্ময়ে অস্ফুটধ্বনি করে উঠলসর্দার! দু’চোখে আনন্দের দ্যুতি খেলে গেল ভুলে গেল তার হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রয়েছে। ছুটে এগিয়ে যেতে গেল সে, অমনি ধপাস করে পড়ে গেল মেঝেতে। কায়েস বুক দিয়ে এগুতে লাগল। তার সর্দার জীবিত রয়েছে, এ যে সে কল্পনাও করতে পারেনি। আনন্দে বুক তার স্ফীত হয়ে উঠছে।
কায়েসের অদ্ভুত আচরণে বনহুর এবং তার অনুচরগণ আশ্চর্য হলো। রহমান বলল একি ব্যাপার সর্দার?
কায়েস তখনও বনহুরের আসনের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে এগুচ্ছে।
বনহুর তার একজন অনুচরকে আদেশ করল ওর হাত পায়ের বাঁধন খুলে দাও।
সঙ্গে সঙ্গে আদেশ পালন করা হলো।
কায়েস বন্ধনমুক্ত হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল, কিন্তু তার দৃষ্টি সর্বক্ষণ বনহুরের দিকে রয়েছে। কায়েস যেন হারানো ধন ফিরে পেয়েছে। লম্বা চুল, দাড়ি-গোঁফে ভরা মুখখানা তার খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
রহমান বলল–সর্দার, লোকটাকে পাগল বলে মনে হচ্ছে।
কায়েস ততক্ষণে বনহুরের আসনের দিকে অনেকটা এগিয়ে এসেছে।
দু’জন অনুচর ওকে ধরে ফেলল–এখানে দাঁড়াও।
কায়েস ক্ষীণকণ্ঠে বলল–না, আমাকে সর্দারের কাছে যেতে দাও। ছেড়ে দাও তোমরা আমাকে যেতে দাও।
বনহুর এবার বলল–আসতে দাও ওকে।
এবার আর কেউ তাকে বাধা দিল না, সে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে হাজির হলো বনহুরের আসনের সম্মুখে।
রহমানের মুখমণ্ডল রাগে গম্ভীর হয়ে উঠেছে, নিশ্চয়ই লোকটা কোন অভিসন্ধি নিয়ে এসেছে। তাদের সর্দারকে হত্যা করে নিজে মৃত্যুবরণ করতেও ভীত নয়। রহমান নিজেকে সেভাবে প্রস্তুত করে সতর্ক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
