হাজতে বন্দী হয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল ড্রাইভার। হায়, কেন সে ভাল মনে করে পুলিশ অফিসে কথাটা জানাতে গিয়েছিল, শেষে কিনা টাকাগুলোও গেল, হাজতেও আসতে হলো।
এবার ড্রাইভার বুঝতে পারল কেউ উপকার করলে তার অপকারের চেষ্টা করা মহাপাপ। ডুকরে কাঁদতে লাগল সে।
১৮.
দাড়ি-গোঁফভরা মুখ, মাথায় এক রাশ এলোমেলো জটধরা চুল। চোখ দুটো কোটরাগত। দেহ কঙ্কালসার। পৃথিবীর বুকে এসে দাঁড়াল কায়েস। প্রাণভরে নিশ্বাস নিল। কতদিন পর সে দুনিয়ার আলো বাতাস গ্রহণ করল।
টলতে টলতে পথ চলছে।
পাশ কেটে চলে যাচ্ছে কত যানবাহন, কত লোকজন।
কেউ তাকাচ্ছে, কেউ তাকাচ্ছে না। কেউ বা পাগল ভেবে ঢিল ছুড়ে মারছে। শরীরে কাপড় নেই বললেই চলে–এক টুকরা ময়লা ন্যাকড়া নেংটির মত করে পরা রয়েছে। একদিন এই কায়েস যে একজন মস্ত বলিষ্ঠ–পুরুষ ছিল, তার শরীরে ছিল অসীম বল, আজ তাকে দেখলে কেউ তা বিশ্বাসই করবে না।
কায়েস ঝিল শহরের পথ ধরে ধীরে ধীরে এগুতে লাগল। ক্ষুধা পিপাসায় অত্যন্ত কাতর সে, এতটুকু খাদ্য আর পানির নিতান্ত দরকার তার। একটা কলতলায় এসে দাঁড়াল।
কতগুলো নারীপুরুষ কলসী এবং মশকে করে পানি ভরছে। কায়েস কতদিন পরিষ্কার পানি পান করেনি। লোলুপ দৃষ্টিতে পানির দিকে তাকিয়ে রইলো। এক তরুণী বলল–এই পাগলা, পানি খাবি?
কায়েসের গলা দিয়ে কথা বের হলো না, মাথা দোলাল সে খাবে।
তরুণী একটা মাটির পাত্রে কিছুটা পানি এনে কায়েসের সামনে রাখল, বলল–খা।
কায়েস এক নিঃশ্বাসে পানিটুকু পান করে এটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। এতক্ষণে যেন কায়েস পুনর্জন্ম লাভ করল। আবার পথ চলতে শুরু করল সে।
কায়েস চলছে আর ভাবছে এখন কোথায় যাবে, কি করবে। ঝিন্দ শহরে সে তেমন করে কারও সঙ্গে পরিচিত নয়, আর যা একটু পরিচয় কারও কারও সঙ্গে ছিল তারাও চলে গেছে এত দিনে নিশ্চয়ই। নতুন করে পরিচয় দিলে এ অবস্থায় তাকে কেউ চিনতেই পারবে না। আজ আবার নতুন করে মনে পড়তে লাগল সর্দারের কথা। দু’চোখ ছাপিয়ে পানি এলো। সর্দারকে তারা প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসে। মনে পড়লো সর্দারপত্নী মনিরার কথা, তাকে খুঁজতেই তো বেরিয়ে ছিল সে, তারপর এই অবস্থা। তিনি এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কে জানে। তার গর্ভে ছিল সর্দারের সন্তান। একটা অভূতপূর্ব আলোড়ন দোলা দিয়ে গেল কায়েসের মনে। মুহূর্তের জন্য কায়েস ভুলে গেল তার ক্ষুধাকাতর অবস্থার কথা। চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল খুশিতে। নিশ্চয়ই মনিবপত্নীর সন্তান জন্মেছে। তিনি যেখানেই থাকুন, সন্তান প্রসব করেছেন তা ঠিক। কিন্তু মেয়ে না ছেলে জন্মেছে কে জানে। কায়েস নিজ মনেই অস্ফুট শব্দ করে উঠল ওরা যেখানেই থাক আমি খুঁজে বের করবই। আবার চলতে লাগল কায়েস।
পথে পথে ঘুরে ঘুরে দিন কাটতে লাগল কায়েসের। দয়া করে কেউ দু’একটা পয়সা ছুড়ে দেয় তার দিকে, তাই দিয়ে কিছু কিনে খায় সে। ফুটপাথের ধারে রাত কাটে আর, দিনের বেলায় কাটে পথে পথে। এমনিভাবে দিন যায়, সপ্তাহ আসে, সপ্তাহ গিয়ে মাস হয়ে এলো। হতাশায় আর ক্লান্তিতে ভরে উঠল কায়েসের মন। কই, এতদিনেও তো তার মনিবপত্নী মনিরা ও তার সন্তানের সন্ধান পেল না। তবে কি তারা বেঁচে নেই?
যেখানেই কোন যুবতী বা নারী দেখতে কায়েস সেখানে গিয়েই দাঁড়াত মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকত লক্ষ্য করত তার সর্দারের পত্নীর মত দেখতে কিনা।
এমনি লুকিয়ে লুকিয়ে যুবতীদের দেখতে গিয়ে বহুদিন কায়েসকে হতে হয়েছে লাঞ্ছিত, অপমানিত, শয়তান-বদমাস নামে অপবাদ নিতে হয়েছে। তাকে। তবু দুঃখ নেই তার এতটুকু, মনের যত ব্যথা কষ্ট মুছে ফেলে সে আবার ছুটে যেত কোন যুবতী বা মহিলা দেখলেই। হয়তো দু’চার ঘা-চড়থাপ্পড় খেতে হতো তাকে।
কায়েস যখন মনিবপত্নী এবং তার সন্তানের সন্ধানে ঝিল শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন সেই মনিবপত্নী এক নারী ব্যবসায়ীর চোরাকক্ষে বন্দিনী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। আর তার সন্তান দিন দিন শশীকলার মতই বেড়ে উঠছে নূরীর কোলে।
১৯.
আজকাল আবার বনহুর তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। কাজ আর কাজ নিয়ে মেতে উঠেছে। শহরে আবার দেখা দিয়েছে চাঞ্চল্য। শুধু একটি শহর, বা কয়েকটি গ্রামের মধ্যেই বনহুর তার দস্যুবৃত্তি সীমাবদ্ধ রাখল না, সব জায়গায়ই চলল তার অভিযান। আবার সে মেতে উঠল নব উদ্যমে।।
নগরবাসীর মনে আবার ত্রাহি ত্রাহি ভাব জাগল। পুলিশমহল ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল। পুলিশদের কড়া পাহারা সত্ত্বেও এখানে সেখানে চললো লুটতরাজ।
শহরের সবচেয়ে বড় ব্যাংকে হানা দিয়ে দস্যু বনহুর এক লাখ টাকা নিয়ে উধাও হল। পরদিনই পুলিশ সুপার মিঃ আহমদের বাড়িতে হানা দিয়ে বহু অলঙ্কার ও নগদ কয়েক হাজার টাকা নিয়ে যায় বনহুর। এবার সে পূর্বের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে।
মিঃ আহমদের বাড়িতে ডাকাতি হওয়ায়, পুলিশমহল পর্যন্ত ঘাবড়ে যায়। নানাভাবে, নানা কৌশলে দস্যু বনহুরকে গ্রেফতারের জন্য তৎপর হয়
সবাই।
শহরের এবং গ্রামাঞ্চলের বিশিষ্ট লোকজন সবাই নিজেদের রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
দরজায় বন্দুকধারী পাহারাদার। বাড়ির আশেপাশে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করেও কেউ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছে না। বিছানায় শুয়ে সদা ভয়কম্পিত হৃদয়ে সময় কাটায়-কবে কখন না জানি দস্যু বনহুর এসে হাজির হবে।
