কোন লোকের সঙ্গেই তেমন তাঁর পরিচয় নেই। শহরের যার বিশেষ করে কাঠের প্রয়োজন তারই শুধু পরিচয় এই অদ্ভুত ভদ্র লোকটির সঙ্গে।
সওদাগর দু’জনকে দেখতে পেয়ে হাবসী মিয়া সাদর সম্ভাষণ জানালেন। তার বসবার কাঠের ঘরখানায় নিয়ে বসালেন। মোটা পুরু শালকাঠের তক্তা দিয়ে ঘরখানা তৈরি। ঘরের খুঁটিগুলো মোটা গাছের গুড়ি কেটে তৈরি করা হয়েছে। মেঝেতে এবং আশেপাশে বিচ্ছিন্নভাবে এলোমেলো কাঠের টুকরা ছড়ানো।
বনহুর আর রহমান সওদাগরের বেশে হাবসী মিয়ার বৈঠকখানা ঘরে আসন গ্রহণ করল।
হাবসী মিয়া বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন স্যার, আপনাদের কি ধরনের কাঠ বা তক্তার প্রয়োজন?
রহমান বলল–একটা বজরা তৈরির অর্ডার দেব।
হাবসী মিয়া খুশি হলেন–বজরা! আপনারা যে ধরনের বজরার অর্ডার দেবেন আমরা অতি অল্প সময়ে মজবুত করে তৈরি করে দিতে পারব।
এবার বনহুর বলল–আপনার কাছে রুচিমত জিনিস পাব বলেই আমরা অনেক দূরে থেকে এসেছি।
নিশ্চয়ই পাবেন, অবশ্যই পাবেন। আমার কাছে কয়েকটা বজরার ক্যাটালগ আছে, চলুন দেখবেন।
চলুন। বনহুর উঠে দাঁড়াল।
রহমানও বনহুরকে অনুসরণ করল।
হাবসী মিয়া বনহুর এবং রহমানকে তার বজরার ক্যাটালগগুলো দেখালেন।
বনহুর ক্যাটালগে একটা বজরা দেখিয়ে সেই মত একটি বজরা তৈরি করার জন্য অর্ডার দিল।
হাবসী মিয়া খুশিতে আত্মহারা হলেন। যদিও তিনি দৈনিক বহু কাজের এবং কাঠ ও তক্তার অর্ডার পেয়ে থাকেন তবু এমন একটা অর্ডার পাওয়া কম কথা নয়! অনেকগুলো টাকা পেয়ে তার আনন্দের সীমা রইল না।
সওদাগরবৈশি বনহুর এবং রহমান এক সময় বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
ঠিক সেই সময় একটা জীপগাড়ি এসে হাবসী মিয়ার কারখানার সামনে থামল।
বনহুর লক্ষ্য করল–দুজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক জিপগাড়ি থেকে নেমে কারখানায় প্রবেশ করলেন। একজনের চোখে কাল চশমা এবং মুখে দাড়ি রয়েছে। অন্যজনের মুখেও একমুখ পাকা দাড়ি আর গোঁফ। বনহুর আর রহমান আরও অক্ষ্য করল, হাবসী মিয়া এদের দু’জনকেও সাদর সম্ভাষণ
জানিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
বনহুর এবার ড্রাইভারকে গাড়ি ছাড়বার আদেশ দিল।
গাড়ি চলতে শুরু করলে বলল বনহুর রহমান, যে প্রৌঢ় ভদ্রলোক দু’টি এই মুহূর্তে জীপ থেকে নেমে হাবসী মিয়ার কারখানায় প্রবেশ করল তাদের চিনতে পেরেছ?
না সর্দার, ওদের চিনতে পারলাম না।
আমাদের অতি পরিচিত লোক ওরা।
কিন্তু আমি কোথাও ওদের দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না তো?
নিখুঁত ছদ্মবেশ রয়েছে ওঁদের। কিন্তু আমার চোখে ধুলো দেয়া ওদের কাজ না। তাঁদের একজন পুলিশ অফিসার মিঃ হারুন, অন্যজন শঙ্কর রাও, পুলিশ ডিটেকটিভ।
সর্দার, ওরা কেন?
আমরা যে কারণে হাবসী মিয়ার ওখানে গিয়েছিলাম ওরাও ঠিক সে কারণে বুঝেছ?
হাবসী মিয়াকে আপনার কেমন লোক বলে মনে হলো সর্দার?
খুব ভাল লোক।
তাহলে সে এ নারীহরণ ব্যাপারে জড়িত নয়?
না, হাবসী মিয়া সম্পূর্ণ নির্দোষ। নারীহরণ বা ছেলেমেয়ে চুরি এর কোনটাই সে করে না।
সর্দার, তাহলে অতগুলো টাকা—
নষ্ট হলো, এই তো?
হ্যাঁ সর্দার, অযথা বজরার বায়না বাবদ এতগুলো টাকা না দিলেও চলতো না কি?
চলতো কিন্তু এতদূর তলিয়ে তাকে বুঝতে পারতাম না। তাছাড়া বজরার তো প্রয়োজনই রয়েছে একটা নিয়ে নেয়া যাবে।
রহমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল–পুলিশের লোকও তাহলে হাবসী মিয়াকে সন্দেহ করেছে?
হ্যাঁ, রহমান তারা শুধু হাবসী মিয়াকে নারীহরণকারী বলেই সন্দেহ করেছে।
কথাগুলো বেশ নীচুস্বরে হচ্ছিল, যাতে ড্রাইভার শুনতে না পায়।
বনহুর আর রহমান যখন গাড়ি ত্যাগ করলো তখন তারা ড্রাইভারকে অনেকগুলো টাকা বখশিস দিল।
ড্রাইভার অবাক কণ্ঠে বলল–স্যার, এত টাকা দিচ্ছেন কেন?
রহমান হেসে বলল–তোমার কাজে সন্তুষ্ট হয়েছিলাম।
ড্রাইভার বলল—আপনারা কে? নিশ্চয়ই কোন মহান ব্যক্তি আপনারা?
এবার বনহুর কথা বলল–ঠিক তার উল্টা-দস্যু বনহুর!
ভয়কম্পিত কণ্ঠে বলল ড্রাইভার–দস্যু বনহুর।
হ্যাঁ, যাও।
ড্রাইভার জানে, দস্যু বনহুর লোকের কাছ থেকে টাকা কেড়ে নেয়, সে আবার টাকা দেয়, এত দয়ালু দস্যু বনহুর।
ড্রাইভার একবার হাতের টাকাগুলো, একবার দস্যু বনহুরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল।
বনহুর আর রহমান একটু হেসে তাদের গন্তব্যপথে পা বাড়াল।
বনহুর আর রহমান দৃষ্টির আড়ালে অদৃশ্য হতেই ড্রাইভার গাড়িতে ষ্টার্ট দিল। একটা আলোড়ন শুরু হয়েছে ড্রাইভারের বুকের মধ্যে। দস্যু বনহুরকে সে স্বচক্ষে দেখেছে, তার গাড়িতেই দস্যু বনহুর চেপেছিল, এর চেয়ে আশ্চর্যের কথা আর কি আছে? কোথায় কাকে বলবে, কার কাছে বললে সে তৃপ্তি পাবে ভাবতে লাগল। মনে পড়ল কিছুদিন পূর্বের সেই সরকারি ঘোষণার কথা-দস্যু বনহুরকে যে মৃত বা জীবিত পাকড়াও করে আনতে পারবে তাকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে।
ড্রাইভারের দু’চোখে বিদ্যুৎ খেলে গেল, তখনই গাড়ি নিয়ে ছুটলো পুলিশ অফিসের দিকে।
সে পুলিশ অফিসে গিয়ে বলল–হুজুর, একটা খবর আছে, দস্যু বনহুরকে আমি স্বচক্ষে দেখেছি এবং আমার গাড়িতে সে চেপেছিল।
ড্রাইভারের কথা শুনে পুলিশের লোকের সন্দেহ হলো। নিশ্চয়ই এ দস্যু বনহুরের দলের কোন লোক। পুলিশ, ওকে গ্রেফতার করে ফেলল এবং তল্লাশি করে অনেক টাকা উদ্ধার করল ওর জামার পকেট থেকে।
