ছাই হয়ে যাব আরও কয়েকজন তার দর চরমে বামনিরা হাত?
এখানে মনিরা যখন খোদার নিকটে প্রার্থনা করে চলেছে, তখন বনহুর আর নূরী তাদের মনিকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠেছে।
নূরী মনিকে নিয়ে দোলনায় বসে দোল খাচ্ছে আর গুন গুন করে গান গাইছে।
এমন সময় বনহুর পেছন থেকে এসে নূরীর চোখ দুটি টিপে ধরল।
নূরী দক্ষিণ হাতখানা দিয়ে বনহুরের হাত স্পর্শ করে বললো—হুর!
বনহুর নূরীর চোখ ছেড়ে দিয়ে এবার মনির গালে মৃদু চাপ দিয়ে বললকার কোলে বসে দোল খাচ্ছ মনি?
মনি শব্দ করল-মা স্মা-ম্মা…..
বনহুর অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলো, তারপর হাসি থামিয়ে বলল—শুনলে নূরী?
নূরী হৃদয়ে আনন্দ উপভোগ করলেও মুখখানা তার লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। মনিকে বনহুরের কোলে তুলে দিয়ে বলল—নাও।
বনহুর হাত দু’খানা পেছনে রেখে মুখ নেড়ে বলল, ওকে আমি নেব না।
নিতেই হবে। নূরী মনিকে জোর করে দিতে গেল বনহুরের কোলে।
বনহুর পিছু হটতে শুরু করল।
কিন্তু নূরী নাছোড়বান্দা—নিতেই হবে আজ মনিকে।
অগত্যা বনহুর মনিকে কোলে নিয়ে আদর করছিল, নূরী তখন অবাক নয়নে তাকিয়েছিল উভয়ের মুখের দিকে—একি, হুর আর মনির মুখের মধ্যে অদ্ভুত মিল রয়েছে–এমন কেন হয়েছে? নূরী এটা অনেক দিন লক্ষ্য করেছে কিন্তু কিছু বলার সাহস হয়নি। এটা বলাও তার উচিত হবে না, কাজেই নিশ্চুপ থাকে নূরী।
বনহুর মনিকে আদর করছিল, এমন সময় রহমান এসে কুর্ণিশ জানিয়ে বলে সর্দার; জরুরী খবর আছে।
বনহুর নূরীর কোলে মনিকে দিয়ে বলল–চল।
বনহুর আর রহমান বেরিয়ে গেল।
নূরী মনিকে নিয়ে দোলনায় শুইয়ে দিল।
১৭.
গোপন আলোচনাকক্ষে প্রবেশ করল বনহুর ও রহমান। বনহুর আসন গ্রহণ করে বলল—কি খবর রহমান?
সর্দার, আমাদের বিশ্বস্ত অনুচর কোরেশী একটা সন্ধান এনেছে। নারী হরণকারী এবং নারী ব্যবসায়ী একজন কুচক্রী নেতাকে সে আবিষ্কার করেছে। কোরেশীকে ডাকব?
হ্যাঁ ডাক।
রহমান কলিংবেলে হাত রাখতেই এক বলিষ্ঠ লোক কক্ষে প্রবেশ করে কুর্নিশ জানাল।
রহমান বলল-সর্দার, এর নামই কোরেশী।
বল তুমি কি সংবাদ সংগ্রহ করে এনছ?
বনহুর প্রশ্নভরা দৃষ্টি তুলে তাকাল কোরেশীর দিকে।
কোরেশী ওর হস্তদ্বয় মুষ্টিবদ্ধ করে বললসর্দার, একটি কাফ্রি লোক সেই নারীহরণকারী।
বনহুর বললো-সে-ই যে নারীহরণকারী, এ কথা তোমাকে কে বলল?
সর্দার, আপনার নির্দেশ মতই আমরা শহরের বিভিন্ন স্থানে গোপনে ছড়িয়ে রয়েছি। কেউ হোটেলে, কেউ ক্লাবে, কেউ পথে-ঘাটে-মাঠে, এমন কি পুলিশ অফিসেও আমরা রয়েছি।
পুলিশ অফিসে?
হা সর্দার, আমাদের একজন পুলিশ অফিসে ঝাড়দারের ছদ্মবেশে কাজ করে।
আর তুমি?
আমি পুলিশ অফিসারের বাংলোয় কাজ করি।
বনহুর সোজা হয়ে বসল—মিঃ জাফরীর ওখানে?
হ্যাঁ, আমি সেখানে বাবুর্চির কাজ করি সর্দার।
বেশ! সেখান থেকে তুমি কি করে নারীহরণকারীর সন্ধান পেলে? প্রশ্ন করল বনহুর।
আজ সেখানে ঐ লোকটা এসেছিল।
কোন লোকটা?
সেই কাফ্রি ভদ্রলোক।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলল-সেই যে নারীহরণকারী এবং নারী ব্যবসায়ী, এ কথা কেমন করে জানলে?
সর্দার, লোকটা চলে যাবার পর পুলিশ অফিসারদের মধ্যে যে আলোচনা হলো আমি লুকিয়ে থেকে সব শুনেছি। ঐ লোকটাই নাকি এ দেশে কাঠের ব্যবসার নামে নারীহরণ ব্যবসা চালাচ্ছে। কিন্তু সর্দার, পুলিশ সন্দেহ করছে ঐ কাফ্রি নাকি আপনার দলের লোক।
বনহুর হেসে বলল তুমিও যেমন সন্দেহ করেছ ঠিক তেমনি মিথ্যা সন্দেহ করে চলেছে পুলিশ অফিসারগণ। কাফ্রি ভদ্রলোক যেমন আমার কোন অনুচর বা দলের লোক নয়, তেমনি সে নারীহরণকারী নাও হতে পারে। তবু তোমরা সেই কাফ্রি ভদ্রলোকে লক্ষ্য রাখবে।
কোরেশী বলল-আচ্ছা সর্দার। কুর্ণিশ জানিয়ে বেরিয়ে গেল সে।
বনহুর এবার রহমানের মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল-রহমান, তাজকে প্রস্তুত কর।
তাজের পিঠে বনহুর এবং অন্য একটি অশ্বপৃষ্ঠে রহমান। দুজনের শরীরেই সাধারণ সওদাগরী ড্রেস। বনপ্রান্তর ছাড়িয়ে ওরা দু’জন শহরে এসে পৌঁছল। কেউ দেখলে ওদের চিনতে পারবে না এমন নিখুঁত ছদ্মবেশ হয়েছিল ওদের।
শহরে পৌঁছার পূর্বেই তাজ এবং দ্বিতীয় অশ্বটি বনের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে বনহুর আর রহমান একটি ট্যাক্সি ডেকে চেপে বসল।
রহমান ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বলল-কাঠের ব্যবসায়ী হাবসী মিয়ার বাড়ি চলো।
হাবসী মিয়াকে শহরের প্রায় সব যানবাহন চালকই জানে, কাজেই ড্রাইভার অতি সহজেই তাদের নিয়ে উপস্থিত হলো তার বাড়িতে।
বাড়ির অনতিদূরে হাবসী মিয়ার বিরাট কাঠের কারখানা। আফ্রিকার বন থেকে হাবসী মিয়া নানা রকমের কাঠ এনে এ দেশে কারবার করে থাকেন।
বাড়ি বলতে তার এমন সুন্দর বাড়ি কিছু নয়। কাঠ-কাঠরা দিয়ে থাকার মত খানিকটা জায়গা করে নিয়েছেন হাবসী মিয়া সেখানেই তিনি বাস করেন তাঁর কয়েকজন কর্মী নিয়ে। তার বেশির ভাগ কর্মী কাফ্রি।
এদেশের কারবার জমিয়ে হাবসী মিয়া বেশ মোটা টাকা করে ফেলেছেন। কোটিপতি বলা চলে। কিন্তু লোকটাকে দেখলে তেমন টাকাওয়ালা বলে মনে হয় না। ঢিলা পাজামা আর পাঞ্জাবী পরেন। মাথায় একটা সাদা টুপি এবং পায়ে কুমীরের চামড়ার জুতা। অদ্ভুত চেহারা এই হাবসী মিয়ার।
টাকা পয়সা ছাড়া হাবসী মিয়া কিছুই বুঝেন না। কোন ফাংশন বা পার্টিতে তাকে কোনদিন দেখা যায়নি। লোকসমাজে কেউ তাঁকে দেখতে পায় না, লোকটা সদা কাজ আর কাজ নিয়েই থাকেন। এমন কি হাবসী মিয়া এত টাকা-পয়সাওয়ালা মানুষ হয়েও একটা চটের বিছানায় দিব্যি আরামে নাক ডাকিয়ে ঘুমান।
