ইনি কে পরে জানতে পারবেন। তবে এঁকে ভালভাবে চিনে রেখেছেন তো?
হ্যাঁ স্যার, রেখেছি।
মিঃ জাফরী বলেন—ইনি কাঠের ব্যবসার নামে এখানে কোন চোরা কারবার শুরু করেছেন এবং এর সঙ্গেই যোগাযোগ রয়েছে দস্যু বনহুরের।
তাই নাকি স্যার? বললেন মিঃ হোসেন।
মিঃ জাফরী একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে বললেন–লোকটা নিখুঁত অভিনয় করতে পারে।
মিঃ হারুন বললেন-লোকটা নাকি এদেশে অনেক দিন থেকে ব্যবসা করছে, সে এতদিন পুলিশের সাহায্য কামনা করল না, অথচ আজ….
এটাই তো দস্যু বনহুরের একটা চালাকি!
তাহলে হাবসী মিয়া দস্যু বনহুরের লোক?
এতে কোন সন্দেহ নে। ওর কথাবার্তায় সেই রকমই আমার সন্দেহ হয়েছে। তাহলে ওকে আমাদের এরেস্ট করা উচিত ছিল; বললেন–মিঃ হোসেন।
মিঃ হারুনই মিঃ হোসেনের কথার জবাব দিলেন, বললেন যতক্ষণ উপযুক্ত প্রমাণ না পাওয়া যায় ততক্ষণ কাউকে এরেস্ট করা সম্ভব নয় মিঃ হোসেন।
এমন সময় হাবসী মিয়া হঠাৎ কক্ষে প্রবেশ করেন। একসঙ্গে চমকে উঠলেন মিঃ জাফরী, মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন।
মিঃ হাবসী: মাথার ক্যাপটা খুলে পুনরায় অভিবাদন জানিয়ে বললেন-স্যার, আমার সিগারেট কেসটা ফেলে গেছি। :
সবাই একসঙ্গে তাকালেন টেবিলে। দেখতে পেলেন সোনালী রঙের একটা সিগারেট কেস পড়ে রয়েছে।’
হাবসী মিয়া দ্রুত হস্তে সিগারেট কেসটা হাতে দিয়ে পুনরায় বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
মিঃ জাফরীর সঙ্গে মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন।
১৫.
মনিরার কক্ষে ইতোমধ্যে আর চার-পাঁচজন যুবতী এসেছে। সবাই ভদ্র এবং সম্ভ্রান্ত ঘরের তাতে সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে সুফিয়া নামের মেয়েটিকে না জানি কোথায় চালান করে দেয়া হয়েছে। সেদিনের কথা, মনিরার মনে এখনও গভীরভাবে দাগ কেটে রয়েছে। হঠাৎ একদিন এক মাড়োয়ারী ভদ্রলোকের সঙ্গে বিরাট বপুধারিণী মহিলাটি এসে উপস্থিত হলতাদের মধ্যে নিম্নস্বরে কিছু আলোচনা হলো। মনিরার হৃদয়ে তখন ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়েছিল-কে জানে আজ কার ভাগ্যে কি আছে! মাড়োয়ারী লোকটি শেষ পর্যন্ত সুফিয়াকে আংগুল দিয়ে দেখাল।
তারপর সে কি করুণ দৃশ্য!
ঐ মহিলা সুফিয়াকে জোরপূর্বক মাড়োয়ারী লোকটির হাতে তুলে দিল।
সুফিয়া যখন তার সঙ্গে ধস্তধস্তি শুরু করল তখন দু’জন বলিষ্ঠ লোক এসে সুফিয়াকে শক্ত দড়ি দিয়ে মজবুত করে বাঁধলো, ঠিক মনিরাকে যেমন করে একদিন বেঁধেছিল।
সুফিয়ার সে কি কান্না, মনিরার বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু কি করবে সে। নিজেও যে সে অসহায়! …
সুফিয়াকে বেঁধে নিয়ে যাবার পর মনিরা বুঝতে পারল বেশি টাকা দিতে লোকটা অসমর্থ হওয়ায় সে আজ বেঁচে গেল। কারণ সুফিয়ার দাম তার চেয়ে কম ছিল।
ইতোমধ্যে আরও দু’জন মেয়েকেও চালান দেয়া হয়েছে। মনিরা নিজের ভাগ্যের কথা অহরহ চিন্তা করে। কি দুর্ভাগ্য তার! সে বন্ধ কক্ষে একটি ছোট আসন সংগ্রহ করে নিয়েছে, তাতেই বসে সে সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা এবং গভীর রাতে খোদার কাছে প্রার্থনা করে—হে দয়াময়, তুমি আমাকে বাঁচিয়ে নাও-আমার স্বামী, আমার পুত্র সব তুমি কেড়ে নিয়েছ তাতে দুঃখ নেই। আমাকে সর্বহারা করেছ তাতে আমি মর্মাহত নই, তুমি শুধু আমার ইজ্জত রক্ষা কর।
মনিরা বুদ্ধিমতী হয়েও আজ বুদ্ধিহীন। এখান থেকে পালাবার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেছিল, নানা রকম ফন্দি এঁটেছিল কিন্তু সব ব্যর্থ হয়েছে। এখন তাকে আর সেই পূর্বের কক্ষে বন্দী করে রাখা হয়নি, অন্য একটা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মনিরার সেই কক্ষে এখন আরও কয়েকটি মেয়ে বন্দিনী রয়েছে।
মনিরা বুঝতে পেরেছে এই নরপিশাচী মহিলা শুধু বাঈজী নয়, সে-এক নারী ব্যবসায়ীও। জঘন্য এই মহিলার আচরণ। অতি সাংঘাতিক সে! মনিরা লক্ষ্য করেছে, এই নরপিশাচীর নিকটে বহু দেশের লোকের আমদানি হয়। ভদ্র সাধু সেজে সবাই এখানে আসা-যাওয়া করে থাকে। বাইরের লোক কিছুই টের পায় না। এই বিরাট বপুধারিণী মহিলা হেমাঙ্গিনী শুধু নারীব্যবসাই করে না, শিশু-ব্যবসাও করে।
দূর দূর দেশ থেকে তার অনুচরগণ ভদ্রঘরের সন্তানদের চুরি করে এখানে পাঠিয়ে দেয়। এখান থেকে ওদের চালান করা হয় ভিন্ন ভিন্ন। জায়গায় এবং দেশ হতে দেশান্তরে।
মনিরা শিক্ষিতা যুবতী, সব বুঝে সে। কিন্তু কি করবে, কোন উপায় নেই নিজেদের রক্ষা করার।
শয়তানী হেমাঙ্গিনী শৃগালিনীর ন্যায় ধূর্ত, মনিরা একটু বেশি বুদ্ধিমতী তাই তাকে আরও কড়া পাহারায় রেখেছে। কোন সময় যেন সে অন্য কোন যুবতীর সঙ্গে কথা বলতে না পারে সেজন্য কঙ্কাল ধরনের মহিলাটিকে নিয়োজিত রেখেছে। কঙ্কালিনী মহিলা তার কোটরাগত জ্বলজ্বলে চোখ দিয়ে সব সময় তার দিকে তাকিয়ে থাকে। রাতে ঘুমিয়েও যেন শান্তি নেই মনিরার। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে দেখতে পায় মনিরা সেই কঙ্কালিনী মহিলা কক্ষের এক কোণে বসে পিটপিট করে তাকাচ্ছে। ভাবে মনিরা সর্বনাশ, একি মানুষ না ভূত, কোন সময় ঘুম নেই তার চোখে!
দিনের পর দিন কেটে যায়, বদ্ধকক্ষে কঙ্কালিনীর দৃষ্টির আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবার উপক্রম হয় মনিরার।
ইতোমধ্যে আরও কয়েকজন লোক এসেছিল, তাকে দেখে পছন্দ করে দাম দর করেছিল, কিন্তু হেমাঙ্গিনী তার দর চরমে বাড়িয়ে দিয়েছে, কাজেই ইচ্ছা সত্ত্বেও কেউ মনিরাকে ক্রয় করতে সক্ষম হয়নি। মনিরা হাত তুলে খোদার নিকট প্রার্থনা করেছে-দয়াময়, তুমি এমনি করেই আমাকে বাঁচিয়ে নিও।
