মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে পড়ল বনহুরের মুখমণ্ডল! কুঞ্চিত করে মুখ ফিরিয়ে নিল।
মরিয়ম বেগম বললেন—কি, অমন চুপ করে রইলি কেন?
তোমার মনিরা মরে গেছে মা।
মরে গেছে। আমার মনিরা বেঁচে নেই? বলিস কি মনির? আকস্মিক শোকে অধীর হয়ে খাট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন মরিয়ম বেগম—মনির! মনির! এ তুই কি বলছিস!
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলল মরে না গেলেও সে মরে যাবার মতই। লোক সমাজে তার স্থান নেই।
সে কি, কি বলছিস বাবা? আমি বুঝতে পারছি না তোর কথা?
মনিরাকে তুমি পুত্রবধু করে ভুল করেছিলে মা।
কেন, কি হয়েছে মুনির?
আজ আর জানতে চেও না মা। তোমার এবার কি প্রয়োজন বল?
আগে বল আমার মা মনিরা কোথায়? কি হয়েছে তার? কেমন আছে সে?
মা, এতটুকু জেনে রাখ, তোমার মনিরা পৃথিবীর বুকে বেঁচে আছে।
তবে তাকে নিয়ে এলি না কেন?
এ প্রশ্ন করলে আমি আর আসব না।
আসবি না! মনিরার কথা জিজ্ঞেস করলে আর আসবি না। বেশ, আমি চুপ রইলাম। বুঝেছি তোদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে।
বনহুরও নিশ্চুপ রইল।
মরিয়ম বেগম বনহুরের মাথায়-পিঠে আদর করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, কতদিন পর পুত্রকে আজ তিনি পাশে পেয়েছেন।
মা-ছেলে অনেক কথা হল অনেক রাত ধরে।
তারপর এক সময় বিদায় গ্রহণ করল বনহুর।
আজ মরিয়ম বেগম হৃদয়ে অনেকটা সান্ত্বনা পেলেন। একটা দুশ্চিন্তা অহরহ মনের মধ্যে গুমড়ে কেঁদে মরছিল, সেটা আর রইলো না! শুধু এখন চিন্তা মনিরার জন্য।
১৪.
বনহুর মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে তাজের পিঠে চেপে বসল। বহুদিন পর শহরের রাস্তায় আবার ধ্বনিত হলো সেই অশ্বপদ শব্দ খট্ খট্ খট্…..
জমকালো পোশাক পরে বনহুর তাজের পিঠে ছুটে চলেছে। দু’একজন নাগরিকের কানে এসে পৌঁছল তাজের খুরের শব্দ। কেউ কেউ দেখে ফেলল
অন্ধকার রাস্তার বুকে জমকালো অশ্বপৃষ্ঠে কালো একমূর্তি।
পরদিন পত্রিকায় বড় বড় হেডিং এ প্রকাশ পেল “দস্যু বনহুরের পুনঃ আবির্ভাব।”
কথাটা অল্পক্ষণেই মধ্যেই গোটা শহরে প্রচার হয়ে গেল। প্রতিটি নাগরিকের ঘরে পৌঁছে গেল সংবাদটা। পুলিশ অফিসে বসে পত্রিকা পড়লেন পুলিশ অফিসারগণ। দোকানে, পথে, ঘাটে, মাঠে আবার সেই কথা বনহুরের পুনরায় আবির্ভাব ঘটেছে। ধনবানদের হৃদয় উঠল কেঁপে। দুষ্ট নাগরিকদের মনে জাগল আশঙ্কা।
নগরবাসী নারীহরণ এবং শিশুচুরি ব্যাপার নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। সকলের মুখেই ঐ কথা, যুবতী মেয়ে হরণ-এটা আর কারও নয়, দস্যু বনহুরের কাজ। এবার দস্যু বনহুরের পুনঃ আবির্ভাবে সন্দেহটা একেবারে বদ্ধমূল হলো। নারীহরণ করেও বনহুরের তৃপ্তি হচ্ছে না, সৈ আবার নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
বিশিষ্ট ধনবান ব্যক্তি যাদের প্রচুর অর্থ রয়েছে তারা পুলিশের সাহায্য চেয়ে বললেন। যাতে তাদের ধনসম্পদ দস্যু বনহুরের কবল থেকে রক্ষা পায়, এটাই তাদের একমাত্র কামনা।
আজকাল যুবতী নারীরা সন্ধ্যার পর বাড়ি ছেড়ে আর বাইরে তো যায়ই, অন্দরমহলেও সদা আশঙ্কা নিয়ে বাস করে।
পুলিশ অফিসে বসে মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন সেদিনের পত্রিকা দেখছিলেন। দস্যু বনহুরের পুনঃ আবির্ভাব শুধু নগরবাসীর মনে আশঙ্কা সৃষ্টি করেনি, পুলিশমহলেও একটা আলোড়ন, জেগেছে।
মিঃ হারুন বলেন-ব্যপারটা যত সহজই মনে করুন না কেন, আসলে তা নয়। এখনই একবার মিঃ জাফরীর নিকট গিয়ে পরামর্শ করা প্রয়োজন। শহরের মধ্যে যখন দস্যু বনহুরকে সশরীরে দেখা গেছে তখন নিশ্চয়ই সে শুধু শুধু আসেনি, কোন উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছে।
মিঃ হারুনের কথায় বললেন মিঃ হোসেন-মিঃ জাফরীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হওয়া একান্ত দরকার।
তখনই মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
মিঃ জাফরীর ওখানে পৌঁছে দেখলেন শহরের ধনকুবের হাবসী মিয়া বসে আছেন। তার সঙ্গে মিঃ জাফরীর কোন গোপন কথাবার্তা চলছে।
মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন পৌঁছতেই হাবসী মিয়া একটু বিব্রত হয়ে পড়লেন।
মিঃ জাফরী হেসে বললেন-আপনি নিঃসন্দেহে কথাবার্তা বলুন, এরা আমাদের পুলিশের লোক।
অবশ্য মিঃ হারুন এবং হোসেনের শরীরে তখন সাধারণ ড্রেস ছিল।
মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেনের সঙ্গে হাবসী মিয়ার পরিচয় করিয়ে দিলেন মিঃ জাফরী।
হাবসী মিয়ার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি কিংবা কিছু বেশিও হতে পারে। জাতিতে তিনি কাফ্রি। তিনি কাঠের ব্যবসা করে এদেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনেক টাকা-পয়সা করে ফেলেছেন। আফ্রিকা থেকে তিনি প্রচুর কাঠ নিয়ে আসেন এবং বিভিন্ন দেশে চালান দিয়ে থাকেন।
হাবসী মিয়া আগে থেকেই দস্যু বনহুরের নামে আতঙ্কগ্রস্ত থাকতেন, এক্ষণে দস্যু বনহুরের পুনঃ আবির্ভাবে ভড়কে গেছেন। সর্বদা তাঁর ভয়, না জানি কোন্ সময় দস্যু বনহুর তার ওপর হামলা করে বসবে। তাই গোপনে তিনি মিঃ জাফরীর নিকটে সাহায্য চাইতে এসেছেন।
মিঃ জাফরীর সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনা চলার পর বিদায় গ্রহণ করলেন হাবসী মিয়া।
হাবসী মিয়া বিদায় গ্রহণ করার পর মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন মিঃ জাফরীর সামনে জেকে বসলেন।
মিঃ জাফরী বলেনজানি আপনারা কেন.এসেছেন। কিন্তু আপনারা জানেন কি ইনি কে?
মিঃ হারুন বললেন-ইনি কে সে পরিচয় তো আপনিই দিয়েছেন স্যার।
না, এটাই এর আসল পরিচয় নয় মিঃ হারুন।
তবে?
