বনহুর নীরবে রহমানের কথাগুলো শুনে যাচ্ছিল, এবার একটা শব্দ করল—হুঁ।
রহমান বলে চলেছে-সর্দার, শহরে আজকাল নারীহরণ–আর ছেলেমেয়ে চুরির যে হিড়িক পড়ে গেছে, এসব নারী এবং ছেলেমেয়ে যাচ্ছে কোথায়?
বনহুর সোজা হয়ে বসে বলল—এটা গভীরভাবে চিন্তা করার বিষয়। রহমান, তুমি আজই আমার অনুচরগণকে শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দাও। যেন শিগগিরই এর সন্ধান সংগ্রহ করে আমাকে জানায়।
আমি এখনই এর ব্যবস্থা করছি সর্দার।
হ্যাঁ, তাই কর।
এতদিন শুধু আপনার আদেশের প্রতীক্ষায়ই ছিলাম। আজ থেকেই আমরা কাজে নেমে পড়ব।
আর শোন।
বলুন সর্দার।
অনেক দিন চৌধুরী বাড়ি যাইনি, যাবার সুযোগ হয়নি। আমার মায়ের কাছে যেতে চাই।
খুব ভাল কথা সর্দার, আমি তাজকে প্রস্তুত করব?
হ্যাঁ, আজ রাতেই যাব মায়ের কাছে–বনহুর উঠে দাঁড়াল।
রহমান তার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল।
১৩.
বিরাট বাড়িখানায় শুধুমাত্র একাকিনী মরিয়ম বেগম। ঝি-চাকর যদিও অনেক রয়েছে কিন্তু তবু মরিয়ম বেগম নিজেকে সব সময় অসহায় নিঃসঙ্গ মনে করেন। বৃদ্ধ, সরকার সাহেব রয়েছেন বলেই তিনি আজও বেঁচে আছেন। অসুখে ডাক্তার ডাকেন, সেবা-যত্নের জন্য নার্সের ব্যবস্থা করেন। পথ্যা-পথ্যের সতর্ক দৃষ্টি রাখেন, চিন্তার সময় সান্ত্বনা দেন।
কিন্তু তিনি পুরুষ মানুষ, কতক্ষণ বিবি সাহেবার পাশে পাশে থাকতে পারেন। সংসারের নানা কাজে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। বিরাট সংসারে কত ঝামেলা সহ্য করে তবেই না চৌধুরী সাহেবের বিষয়-আশয় সবকিছু ঠিক রেখেছেন সরকার সাহেব।
রাজ প্রাসাদের মত বাড়ি, গাড়ি, ঐশ্বর্য, দাস-দাসী কোন কিছুর অভাব নেই মরিয়ম বেগমের, শুধু অভাব সন্তান-সন্ততির। একমাত্র পুত্রকে। হারানোর পর মনিরাকে পেয়ে কতকটা সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মনিরাকেও যখন হারিয়ে ফেললেন তখন তার আপন বলে কিছুই রইলো না। সংসার অসহনীয় হয়ে উঠলো তাঁর কাছে। কোনরকমে স্বামী-শোক সহ্য করে চলেছিলেন, মনিরাকে বুকে নিয়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছিলেন—সেই মনিরাও আজ নেই।
শোকবিহ্বলা মরিয়ম বেগম দিন দিন ভেঙ্গে পড়ছিলেন। একমাত্র সন্তানকে বহুদিন পূর্বে হারানোর পর ভুলেই এসেছিলেন তার কথা, আবার সেই হারানো রত্ন ফিরে পেয়ে হারানোর ব্যথা আরও গভীরভাবে মরিময় বেগমকে বিচলিত করে তুলেছিল। বেশ ছিলেন তিনি। মনির মরে গেছে, আর তো ফিরবে না। কিন্তু সেই মনিরকে আবার কেন পেলেন, আর পেলেনই যদি তবে তাকে স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে না পেয়ে পেলেন অস্বাভাবিকরূপে। যার জন্য সদা ভয় না জানি কখন কোন মুহূর্তে তার জীবন বিনষ্ট হতে পারে। আজ কতদিন তাকে দেখেননি, তার সন্ধান জানেন, মরে গেছে না বেঁচে আছে তাও তিনি জানেন না। মায়ের প্রাণ তো, অহরহ সদা ঐ চিন্তা-তার মনির এখন কোথায়, কেমন আছে।
সারাটা দিন তবু কেটে যায় নানা কাজ আর ঝি-চাকরের সঙ্গে, রাতে আর সময় কাটতে চায় না। বিছানায় শোবার সঙ্গে সঙ্গে চোখের ঘুম কোথায় যে পালিয়ে যায় মরিয়ম বেগম নিজেই বুঝতে পারেন না।
সারাটা রাত ছটফট করে কাটে তার। সারা জীবনের নানা কথা ভেসে ওঠে একটার পর একটা করে মনের আকাশে। কত সুখ-দুঃখে ভরা দিন আর রাতের স্মৃতি—স্বামী-সংসার, পুত্রের কথা–মনিরার কথা।
সেদিন অনেক রাতেও যখন চোখে ঘুম এলো না, তখন মরিয়ম বেগম বালিশটা সরিয়ে রেখে উঠে বসলেন। আজ তাঁর বারবার মনে পড়ছে পুত্রের মুখখানা। মরিয়ম বেগম দেয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, ইলেকট্রিক লাইটের উজ্জ্বল আলোতে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন তাঁর হৃদয়ের ধন, নয়নের মণি মনিরকে।
চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল ফেঁটা ফোঁটা অশ্রু। বুকের মধ্যে অসহ্য, একটা ব্যথা গুমড়ে উঠল তাঁর। নীরবে, অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলেন তিনি।
ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করল বনহুর। গভীর রাতে মাকে তার ছবির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়। বুঝতে পারে তার মায়ের মনের ব্যথা। অস্ফুট কণ্ঠে ডেকে উঠল বনহুর-মা!
মরিয়ম বেগম চমকে ফিরে তাকালেন।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর ছুটে এসে কচি শিশুর মত মায়ের বুকে ঝাপিয়ে পড়ল–মা, মাগো!
গভীর আবেগে মরিয়ম বেগম পুত্রকে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরলেন। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল, বনহুরের মাথায়। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন মরিয়ম-ওরে নিষ্ঠুর, কোথায় লুকিয়েছিলি এতদিন, একটিবার কি মায়ের কথা স্মরণ হয়নি তোর?
মা, আমি তোমার হতভাগ্য সন্তান। আমি তোমার নরাধম সন্তান। আমাকে তুমি অভিসম্পাত দাও মা। আমাকে তুমি অভিসম্পাত দাও।
এ তুই কি বলছিস? তোকে আমি অভিসম্পাত দেব!
মা, তোমার মত মায়ের সেবা আমি করতে পারি না, একি আমার কম দুঃখ! এর চেয়ে আমার মৃত্যু অনেক ভাল।
মরিয়ম বেগম পুত্রের মুখে হতচাপা দেন-ওকি কথা বলছিস! আর কোন সময় বলবি না! ওরে, আমি তবে কি নিয়ে বেঁচে থাকব। কেঁদে ফেলেন মরিয়ম বেগম।
বনহুর মাকে সঙ্গে করে খাটের ওপর এসে বসে পড়ল, নিজের রুমালে মায়ের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল কেঁদো না মা। তুমি কেঁদ না! তোমার সন্তান চিরদিন তোমার পাশে বেঁচে থাকবে। বললা মা, কেমন ছিলে?
না-মরে বেঁচে আছি বাবা!
ছিঃ ও কথা বলতে নেই মা!
ওরে তুই বুঝবি না আমার হৃদয়ে কি জ্বালা! কই, মনিরার কথা বললি তো? সে কোথায় আছে, কেমন আছে?
