মনিরা যখন সন্তানের মঙ্গল কামনায় খোদার কাছে করুণা ভিক্ষা। করছিল তখন নদীতীরে নূরীর পাশে বসে বনহুরে মন উতলা হয়ে উঠছিল। বসে থাকতে মোটেই ভাল লাগছিল না। তাই নূরীকে নিয়ে তাজের পিঠে বসেছিল। একটা অজানিত টানে ছুটে চলছিল বনহুর কোন অজানার পথে।
গহন বনে কাপালিক সন্ন্যাসীর কোলে বলির জন্য অসহায় নূর। খড়গহস্তে দণ্ডায়মান সন্ন্যাসী। মন্ত্রপাঠরত রক্তপিপাসু কাপালিক। সামনে জমকালো কালীমূর্তি, লকলকে জিহ্বা প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে।
অশ্বপৃষ্ঠে ছুটে আসছে বনহুর আর নূরী।
বদ্ধকক্ষে অশ্রুসিক্ত নয়নে দু’হাত তুলে দোয়া করছিল মনিরা।
সবকিছুর সঙ্গে একটা অদ্ভুত সংযোগ ছিল। অপূর্ব সে যোগাযোগ। কখন যে, মনিরা জায়নামাযের ওপর ঢলে পড়েছে খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙতেই সূর্যের আলো তাকে সাদর সম্ভাষণ জানাল পাশের ক্ষুদ্র জানালাটা দিয়ে। ভোরের সূর্যের এক টুকরা আলো এসে পড়ছিল তার মুখে। মনিরা হৃদয়ে যেন একটা শান্তি অনুভব করল।
মনিরা জায়নামায থেকে উঠে দাঁড়াল। আজ যেন মনটা তার অনেক শান্ত হয়ে এসেছে। ক্ষুদ্র জানালা দিয়ে তাকাল বাইরে। ওখান থেকে আকাশের যতটুকু দেখা যায় প্রাণভরে তাই দেখতে লাগল। ঐ আকাশের তলায় কোথাও রয়েছে তার নূর।
মনিরা যখন ক্ষুদ্র জানালায় দাঁড়িয়ে নূরের কথা ভাবছে, তখন নূরকে নিয়ে বনহুর আর নূরী মেতে উঠেছে।
শিশু নূরকে কোলে করে বনহুরের শয্যার পাশে এসে দাঁড়াল নূরী, হেসে বলল-দেখ হুর কে এসেছে!
হাই তুলে গা মোড়া দিয়ে চোখ মেলে তাকাল বনহুর–কে?
নূরী হেসে বলল-মনি।
মুহূর্তে বনহুরের মুখমণ্ডল গম্ভীর থমথমে হয়ে পড়ল, মুখ ফিরিয়ে কি যেন ভাবতে লাগল। মুনি তার মনিরাকেও সে মনি বলে ডাকত। একটা। ঘৃণা তার সে নামকে চিরতরে বিষাক্ত করে দিয়েছে। মনিরা ব্যভিচারিণী,, ভ্ৰষ্টা, অন্যের সন্তান তার পেটে জন্মগ্রহণ করেছে। মনিরা তাই চিরদিনের জন্য মুছে গেছে তার মন থেকে….
নূরী হেসে বলল-কি হলো হুর? অমন গম্ভীর হয়ে পড়লে কেন? এ নামটা তোমার পছন্দ হলো, না বুঝি?
বনহুর এবার মুখ তুলে তাকাল নূরীর দিকে। দিনের আলোয় স্পষ্টভাবে এই প্রথম সে দেখল নূরকে। বড় ভাল লাগল ওকে। হাত বাড়িয়ে নূরের হাতখানা ধরে মৃদু নাড়া দিয়ে বলল-না জানি কার সন্তান, কে ওর বাবামা। নূরী, কেন মায়া বাড়চ্ছে?
সেকি হুর, তুমি একি বলছ! যারাই ওর বাবা-মা তোক আমরা তো; আর চুরি করতে যাইনি বা কেড়েও আনিনি। নিয়তির চক্রে যখন ও আমাদের হাতে এসে পড়েছে তখন বুকে তুলে নেব না? তুমি যাই বলো হুর, মনিকে আমি আর কাউকে দেবো না।
বনহুর এবার রাগত কণ্ঠে বলে উঠলমনিমনি—ঐ নাম ছাড়া আর নাম নেই?
কেন এ নাম তোমার এত অপছন্দ? আমার কিন্তু এ নামটা বড় ভাল লাগছে।
বেশ রাখ! গম্ভীর কণ্ঠে বলল বনহুর।
তাই রাখলাম। বলল নূরী।
নূরের নাম বদলে গেল—নাম হলো মনি। নূরীর নয়নের মনি।
মনিকে পেয়ে নূরী আনন্দে আত্মহারা। সদা-সর্বদা ওকে নিয়েই মেতে থাকে সে। নাওয়া, খাওয়া, গোসল করানো, বুকে নিয়ে ঘুম ঘুমপাড়ান যতকিছু সব করে নূরী। মনিকে ছাড়া নূরীর যেন এক মুহূর্ত আর চলে না।
মনিকে পেয়ে বনহুর যে খুশি হয়নি তা নয়। তাদের নীরস জীবনে মনি যেন একটা নতুন আস্বাদ এনে দিয়েছে।
সেদিন নূরী মনিকে নিয়ে আনন্দে মেতে ছিল। কাজল পরিয়ে দুধ খাইয়ে কোলে নিয়ে দোল দিচ্ছিল। এমন সময় বনহুর এসে হাজির হয়। নূরীর কক্ষে। মৃদু হেসে বলল—নূরী, মনিকে পেয়ে তুমি দেখছি আমাকে একেবারে ভুলে গেছ?
নূরী মনির মুখে ছোট্ট একটি চুমু দিয়ে দোলনায় শুইয়ে রেখে এগিয়ে এলো বনহুরের পাশে, দু’হাত বাড়িয়ে বনহুরের গলা জড়িয়ে ধরে বলল–রাগ করেছ হুর? মনিকে পেয়ে তোমাকে আমি ভুলে যাব–কি যে বলো–তবে ওর জন্য সত্যিই বড় মায়া হয়, ওর তো বাবা-মা কেউ নেই এখানে।
নূরীর চিবুকে মৃদু টোকা দিয়ে বলল বনহুর–তাই তুমিই মা বনে গেছ, না?
হ্যাঁ, তাতে দোষ কি, মেয়েরাই তো মা হয়।
হাসে নূরী, হাসে বনহুর। দোলনায় শুয়ে হাসে মনি, দু’হাত মুখের মধ্যে গুঁজে দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করে মা, স্মা, স্মা!..
নূরী বনহুরের গলা ছেড়ে দিয়ে ছুটে যায় দোলনার পাশে, দু’হাত বাড়িয়ে তুলে নেয় বুকে, চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয় রাঙা টুকটুকে ঠোঁট দু’খানা।
এমন সময় রহমান এসে দাঁড়ায় সেখানে।
বনহুর বলে–কি খবর রহমান?
কয়েকটা কথা আছে আপনার সঙ্গে।
কথা! বেশ চল। একবার নূরী আর মনির মুখের দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যায় বনহুর।
রহমানও একবার অলক্ষ্যে নূরী আর মনিকে দেখে নেয়। নূরীর হাসিখুশিভরা সুস্থ জীবন রহমানের মনে আনন্দ দান করে। নূরীকে রহমান প্রাণ দিয়ে ভালবাসে, তাই ওর মঙ্গলই সে চায়। মনির জন্য নূরীর নির্দেশমত সে শহর থেকে অনেক কিছু এনে দিয়েছে। দোলনা, খেলনা, দুধ খাবার বোতল, চুষনী অনেক কিছু। নূরীর মুখে হাসি দেখলে রহমানের বুক খুশিতে ভরে উঠে। প্রাণে সে শান্তি পায়।
নূরী আর মনিকে দেখে নিয়ে বনহুরের পেছনে পেছনে সেও বেরিয়ে যায়।
১২.
সর্দার, সবাই জানে, এই নারীহরণ ব্যাপারটা আপনারই কাজ। কিন্তু আমি কথাটা শুনেও এত দিন নিশ্চুপ রয়েছি, আপনার মনের অবস্থা বুঝে বলিনি। এখন আর চুপ থাকতে পারলাম না, কারণ শুধু আপনার বদনামই নয়, এটা দেশ ও দশের এক মস্ত বিপদজনক ব্যাপার।
