বনহুর মুহূর্তে বুঝে নিল ব্যাপারটা, সে নূরীকে লক্ষ্য করে বলল-নূরী, তুমি এখানে থাক। তারপর অশ্ব থেকে নেমে দ্রুত অগ্নিকুণ্ডের নিকটে অগ্রসর হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল খর্গধারী সন্ন্যাসীটার ওপর।
অচমকা আক্রমণে খর্গধারী উবু হয়ে পড়ে মাটিতে। ছিটকে পড়ল ওর হাতের খর্গ।
বনহর খর্গধারীর বুকে চেপে বসল।
সঙ্গে সঙ্গে কাপালিকের মন্ত্র থেমে গেল, চট করে উঠে কুড়িয়ে নিল ভূপা৩৩ খৰ্গখানা, ঝাপিয়ে পড়লো বনহুরের ওপর।
ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুর লাফিয়ে সরে দাঁড়াল।
সঙ্গে সঙ্গে কাপালিকের হাতের সুতীক্ষ্ণধার খর্গ বিদ্ধ হলো ভূপতিত সন্ন্যাসীর মাথায়। দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল সন্ন্যাসীর মাথাটা। রক্তের বন্যা ছুটলো, টু শব্দ করার মত সময় পেল না সে।
প্রথম সন্ন্যাসীর মৃত্যুতে দ্বিতীয় সন্ন্যাসী নূরকে ছেড়ে দিয়ে ছুটে পালাতে যাচ্ছিল, বনহুর তাকে ধরে ফেলল, তারপর প্রচণ্ড এক ঘুষিতে ধরাশায়ী করল।
কাপালিক তার অনুচরটির রক্তাক্ত দ্বিখণ্ডিত মাথাটার দিকে তাকিয়ে একটু হকচকিয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুর বেদীর ওপর উঠে। কালীমূর্তির হাত থেকে ধারালো খৰ্গটা তুলে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিশালদেহী কাপালিকের ওপর।
সে কি ভীষণ ধস্তাধস্তি!
রক্তপিপাসু কাপালিকের শরীরে কি অসীম শক্তি। বনহুর তাকে সহজে কাবু করতে সক্ষম হচ্ছে না। কাপালিকের হাতে পূর্বের খড়গটা রয়েছে। কাপালিক আঘাত করছে বনহুর, তার খড়গ দ্বারা প্রতিরোধ করে চলেছে। বনহুরের আঘাতও অতি কৌশলে প্রতিরোধ করছে কাপালিক!
ওদিকে নূর মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে। মুখটা তার কাপড় দিয়ে বাঁধা কাঁদবার শক্তি নেই।
অপর সন্ন্যাসী এই সুযোগে পুনরায় সরে পড়ার চেষ্টা করতেই নূরী তার খোপা থেকে বিষযুক্ত সুতীক্ষ্ণধার ক্ষুদ্র ছোরাখানা তুলে নিয়ে লোকটাকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল।
নূরীর লক্ষ্য অব্যর্থ, ক্ষুদ্র ছোরাখানা আমূল বিদ্ধ হল পলাতক সন্ন্যাসীর পিঠে। একটা তীব্র আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল সন্ন্যাসীটি। কিছুক্ষণ যন্ত্রণায় ছটফট করে স্থির হয়ে গেল তার দেহটা।
নূরী নিজেকে রক্ষার জন্য সদাসর্বদা একটি বিষযুক্ত তীক্ষ্ণধার ছোরা রাখে নিজের খোপায় গুঁজে। বিপদে পড়লে সে ওটা ব্যবহার করে। আজ নূরীর বিষযুক্ত ছোরাখানা খুব কাজে লাগল।
যতই শক্তিশালী লোকই হোক না কেন, দস্যু বনহুরের কাছে পরাজয় বরণ না করে উপায় নেই। নররক্তপিপাসু কাপালিক বনহুরের হাত থেকে বেশিক্ষণ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হল না। বনহুরের হাতের খড়গ তার মস্তক দ্বিখণ্ডিত করে ফেলল।
বিরাট জটাজুটভরা মাথাটা কাপালিকের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিটকে পড়ল দূরে। রক্তে রাঙা হয়ে গেল বনভূমি।
অগ্নিকুন্ডটা তখনও দপ দপ করে জ্বলছে।
শক্তিশালী কাপালিকের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে বনহুর অত্যন্ত হাঁপিয়ে পড়েছিল। সাদা পাঞ্জাবীটা ঘামে ভিজে চুপসে উঠেছে। স্থানে স্থানে ছিড়ে ঝুলে পড়েছে। কোথাও বা রক্তের দাগ লেগে রয়েছে। পাজামার অবস্থাও তাই। বনহুর বাঁ হাতে ললাটের ঘাম মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বনহুরের নিঃশ্বাস তখনও দ্রুত বইছে। চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে।
নূরী অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে ছুটে এসে বুকে তুলে নিল নূরকে। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল বনহুরের পাশে-হুর, শিগগির এর মুখের বাঁধন খুলে দাও।
বনহুর তার হাতের সুতীক্ষ্ণধার খড়গ ছুড়ে ফেলে দিল দূরে। তারপর দ্রুতহস্তে শিশুর মুখের বাঁধন খুলে দিল।
মুখের বাঁধন মুক্ত হওয়ায় চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল শিশু নূর।
অগ্নিকুন্ডের উজ্জ্বল আলোতে বনহুর আর নূরী শিশুর অপরূপ সুন্দর চেহারা দেখে মুগ্ধ হল। নূরী বুকে আঁকড়ে ধরে সস্নেহে মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলল-দেখ, দেখকি সুন্দর শিশুটি।
যদিও বনহুরের শরীর-মন দুই ক্লান্ত তবু নূরের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা অভূতপূর্ব অনুভূতি জাগল তার মনে, বড় মায়া হলো। শিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-ভাগ্যিস ঠিক সময়ে এসে পড়েছিলাম নূরী, তাই রক্ষে। নইলে এতক্ষণ এর দেহ থেকে মাথাটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত..যেমন ঐ পাপিষ্ঠ কাপালিক সন্ন্যাসীর মাথা দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। বনহুর তাকাল সন্ন্যাসীদের মৃতদেহের দিকে।
নূরী বলল—এ কারণেই বুঝি তোমার মন আজ এখানে টেনে নিয়ে এসেছিল?
সত্যি নূরী, অদ্ভুত এ ব্যাপার। জানি না একি কাণ্ড, আজ কেন আমার মন আমাকে এভাবে গহন বনের মধ্যে এই স্থানে টেনে আনল!
নূরী শিশুটাকে বুকে চেপে ধরে বললসবই খোদার লীলা!
শিশু নুর তখন নূরীর বুকে মুখ লুকিয়ে শান্ত হয়ে এসেছে। ভাবছে। এতক্ষণে সে তার মাকে ফিরে পেয়েছে।
বনহুর আর নূরী ফিরে চলল।
নূরীর কোলে শিশু।
বনহুর এবার সংযতভাবে অশ্ব চালনা করছে।
পেছনে পড়ে রইলো বটবৃক্ষতলে পাষাণ প্রতিমা কালী দেবীর জমকালো মূর্তি। তার পদতলে তিনটি সন্ন্যাসীর রক্তমাখা দেহ রক্তপিপাসু মা কালী দেবী আজ শিশুর রক্ত পান না করে করলো তার ভক্তদের রক্তপান!
১০.
এদিকে নূরকে যখন বলির জন্য প্রস্তুত করে নেয়া হচ্ছিল ঠিক তখন ঝিন্দ শহরের একটি গোপন কক্ষে বন্দিনী মনিরা পিঞ্জিরাবদ্ধ পাখির মত ছটফট করছিল। মায়ের মনে একটা ভীষণ আলোড়ন শুরু হয়েছিল। কেন যেন মনের মধ্যে ভীষণ চঞ্চলতা দেখা দিয়েছিল। বার বার নূরের কচি মুখখানা ভেসে উঠছিল তার মানসপটে। মনিরা কি করবে, কি করে মনকে শান্ত করবে, তাই খোদার কাছে তুলে দোয়া চাইতে বসেছিল, হে দয়াময়, আমার নূরকে তুমি রক্ষা কর। তুমি ছাড়া ওকে দেখার কেউ নেই। হে করুণাময়, তুমি আমার নূরকে বাঁচিয়ে নিও…।
