কাপালিকের যজ্ঞ শুরু হবার মাত্র কিছুক্ষণ পূর্বে এই সন্ন্যাসীদ্বয় নূরকে নিয়ে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। বড়ই ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছে সন্ন্যাসীদ্বয়। এ ক’দিন অবিরাম পথ চলেছে তারা।
নূরকে দেখে কাপালিক খুশি হল।
কিছুক্ষণ পূর্বেই কাপালিকের চোখমুখ হতাশায় ভরে উঠেছিল। এবার বুঝি তার যজ্ঞ নষ্ট হয়ে যাবে! সন্ধ্যা আগতপ্রায়, তবু তো কোন শিশু নিয়ে। তার অনুচরদ্বয় ফিরে এলো না। এক্ষণে তার মনমত শিশু পেয়ে আনন্দে। কাপালিকের চোখ দুটো আগুনের ভাটার মত জ্বলে ওঠে। তার চেয়েও শুভ নিদর্শন শিশুর হাতে মঙ্গলজট রয়েছে। এবারের নরবলি মা কালী মনপ্রাণে গ্রহণ করবেন!
যজ্ঞ শুরু হয়েছে।
ভস্মমাখা কাপলিকের সামনে প্রকাণ্ড একটা অগ্নিকুণ্ড দপ দপ করে জ্বলছে। বেদীর ওপর জমকালো পাথরের তৈরি কালীমূতি। দক্ষিণ হাতে সুতীক্ষ্ণধার খর্গ, বাম হাতে নরমুন্ডু। অন্য দুটি হাতে শঙ্ক আর চক্র রয়েছে। লকলকে রক্তরাঙা একটি জিহ্বা। চোখ দুটি সোনার তৈরি। অগ্নিকুণ্ডের লেলিহান জিহ্বা। উজ্জ্বল আলোয় কালীর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।
মাথায় জট, শরীরে বাঘের চামড়াপরা কাপালিক অদ্ভুত শব্দে মন্ত্র পাঠ করে চলেছে। বাঘের চামড়ার ওপর বসা রয়েছে সে।
সামনের বেদীর ওপর অন্য এক সন্ন্যাসী শিশু নূরকে কোলে করে বসে আছে। নূর দু’হাত নেড়ে খেলা করছে। অত্যন্ত নিদ্রার জন্য এখন তার চোখের ঘুম চলে গেছে। এখানে পৌঁছার পরই খুব কেঁদেছিল, সন্ন্যাসীদ্বয় জোর করে বেশ কিছুটা দুধ ওকে খাইয়ে দিয়েছে, তাই চুপচাপ খেলা করছে।
নুরের অপূর্ব সুন্দর নাদুস-নুদুস চেহারা দেখে কাপালিকেরই জিভে পানি এসে যাচ্ছিল। মা কালীর জিভে যে রস আসবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কাপালিক খুশিতে ডগমগ হয়ে মন্ত্রপাঠ করছে।
রাত দ্বিপ্রহর তখন, যজ্ঞশেষে নূরকে কালী দেবীর চরণে বলি দেয়া হবে।
অগ্নিকুন্ডের উজ্জ্বল আলোতে গোটা বনভূমি আলোকিত হয়ে উঠেছে। আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছে ধূপের গন্ধে। সে এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তখন সেখানে।
সন্ন্যাসীর কোলে নূর এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছে।
কচি হাতখানা ঝুলে পড়েছে একপাশে। মাথাটা কাৎ হয়ে সন্ন্যাসীর বুকে লেগে রয়েছে। স্বপ্নের ঘোরে নূর ফিক্ কি করে হাসছে। কখনও বা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নূরের কচি মুখখানা পবিত্র ফুলের মত সুন্দর লাগছে।
সন্ন্যাসী বাবাজী মন্ত্রপাঠ করে চলেছে।
০৯.
এ তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে চলেছ হুর? রাত কত হল জান, চল এবার ফেরা যাক।
তাজের পিঠে বসে নূরী আর বনহুর ছুটে চলেছে অজানার পথে। নূরী বনহুরের দক্ষিণ হাতের ওপর হাত রেখে কথাটা বলল।
বনহুরের দক্ষিণ হাতে তখন তাজের লাগাম ধরা রয়েছে; বাঁ হাতে নূরীকে ধরে রেখেছে সে।
জোছনাভরা পৃথিবী।
বনহুর আর নূরীর মধ্যে নদীতীরে বসে বসে গল্প হচ্ছিল। বনহুর বলছিলচল নূরী দূরে-অনেক দূরে কোথাও যাই।
নূরী বলেছিল-কোথায় যাবে হুর?
যেদিকে দু’চোখ যায় চল সেইদিকে যাই।
বনহুরের প্রস্তাবে নূরী অমত করতে পারেনি।
তাজের পিঠে বনহুর আর নূরী উঠে বসেছিল। জোছনাভরা রাত। আলোর বন্যায় বসুন্ধরা যেন স্নান করে চলেছে।
বনহুর আর নূরী তাজের পিঠে ছুটে চলেছে! রাত বেড়ে আসছে সেদিক খেয়াল নেই কারও। হঠাৎ বলে উঠল নূরী হুর, এখন রাত গভীর, চল ফেরা যাক।
উঁহু, আজ আমার ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না নূরী।
আমারও না। তবে আর কত দূর যাবে শুনি?
যতদূর মন চায়।
বেশ চল।
আজ মনিবের আনন্দে অশ্ব তাজও যেন আত্মহারা। দিশেহারা ভাবে সেও এগুচ্ছে। কোন বাধাবিঘ্নই আজ তাজের পথ রোধ করতে সক্ষম হচ্ছে না।
প্রান্তর ছাড়িয়ে এবার এক নতুন বনে প্রবেশ করল বনহুরের অশ্ব। নূরী বলল-অজানা অচেনা এক বনে এত রাতে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না হুর।
কেন, ভয় হচ্ছে তোমার?
না, তুমি তো জান, আমার হুর পাশে থাকলে আমি যমকেও ভয় করি না।
ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুর বলে উঠল নূরী, দেখ বনের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যাচ্ছে।
বিস্ময়ভরা চোখে তাকাল নূরী–দূরে, অনেক দূরে গভীর বনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে জ্বলন্ত আগুনের শিখা। নূরী বলল—চল হুর। আর যেয়ে কাজ নেই।
কিন্তু ওখানে অমন আগুন জ্বলছে কেন?
হয়তো কোন শিকারীর দল শিকার করতে এসে বনের মধ্যে রাত হয়ে যাওয়ায় আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়ে নিজেদের হিংস্র জন্তুর কবল থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
তাও হতে পারে কিংবা কোন… যাক, চল দেখে আসি আসল ব্যাপারটা কি!
আমার কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে, যদি শিকারীদল না হয়ে অন্য কোন দস্যুদল হয়?
মোকাবিলা হবে।
তুমি যে নিরস্ত্র?
ততক্ষণে বনহুরের অশ্ব অগ্নিকুন্ড লক্ষ্য করে দ্রুত এগুতে শুরু করেছে।
বনহুর আর নূরী যতই এগুচ্ছে ততই অগ্নিকুণ্ড স্পষ্টতর হয়ে উঠছে।
এবার বনহুর অশ্বের গতি কমিয়ে নিল।
কারণ সে জানতে চায় কিসের আগুন ওটা, কে বা কারা রয়েছে সেখানে? অশ্বপৃষ্ঠ থেকেই এবার লক্ষ্য করল অগ্নিকুণ্ডের পাশে একজন জটাজুটধারী বসে আছে। আর দু’জন দাঁড়িয়ে, কি যেন করছে ওরা।
হঠাৎ নূরী তীব্রকণ্ঠে বলে উঠল—হুর দেখ, দেখ, একটা ছোট্ট শিশুকে একজন উবু করে ধরে আছে।
চমকে উঠল বনহুর, এতক্ষণ সে তা লক্ষ্যই করেনি। ওপাশে এক সন্ন্যাসী একটি শিশুকে উবু করে ধরে রয়েছে। আর এক জন একটা খর্গ তুলে ধরেছে। হয়তো এক্ষুণি শিশুটাকে হত্যা করা হবে! যে সন্ন্যাসী মন্ত্রপাঠ করছে তার সামনে বেদীর ওপর একটা জমকালো কালিমূর্তি।
