অদূরে পাহাড়িয়া নদী কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে।
বনহুর আর নূরী নদীতীরে এসে দাঁড়াল। নদীর উচ্ছল জলরাশির বুকে জোছনার রূপালী আলোর ছটা নেচে নেচে এগিয়ে চলেছে। কতগুলো পদ্মফুল দোল খাচ্ছে সেই রূপালী আলোর বন্যায়। অপূর্ব দৃশ্য!
বনহুর আর নূরী নদীর তীরে পঁড়িয়ে প্রাকৃতিক অপরূপ দৃশ্য তাকিয়ে দেখতে লাগল। মাথার ওপর, অনন্ত আকাশ। চারপাশে বৃক্ষরাজি। সামনে পাহাড়িয়া নদী।
নূরীর দক্ষিণ হাতখানা বনহুর হাতের মুঠোয় চেপে ধরল, তারপর আবেগভরা কণ্ঠে ডাকল-নূরী!
এমন করে বনহুর কোনদিন তাকে ডাকেনি। নূরীর মনে দোলা লাগল। নূরী ছো্টবেলা থেকে ওকে দেখে এসেছে; কিন্তু আজ যেন নতুন করে দেখতে পাচ্ছে। কি বলতে চায় সে তাকে? নূরী জবাব দেয়-বল?
নূরী, মেয়েরা সব পারে, না?
নূরী হেসে বলল-ভাত রাঁধা থেকে দস্যুবৃত্তি পর্যন্ত সব পারে।
তা বলছি না নূরী।
তবে কি?
নারী ছলনাময়ী—এ কথা সত্যি, না?
কেন, আমি কি তোমার সঙ্গে কোনরকম ছলনা করেছি? অভিমানে নূরীর কণ্ঠ ভরে ওঠে।
বনহুর একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলল—একমাত্র তুমিই সত্য নূরী। তোমার ভালবাসাই সত্য–
নূরী বনহুরের বুকে মাথা রেখে মধুর কন্ঠে বলল-এত দিনে তোমার মনের কথা পেলাম হুর! তোমার অন্তরের কথা পেলাম!
বনহুর আর নূ্রী নদীতীরে কোমল দুর্বাঘাসের ওপর বসল। কতদিন পর আবার তারা এভাবে নদীতীরে বসার সুযোগ লাভ করল। বনহুর নূরীর চিবুক উচু করে ধরে বলল-নূরী, সেই গানটা এবার গাও, যে গানটা তুমি আগে গাইতে।
নূরীর মনে আনন্দের উৎস, বুনহুরকে এত আপন করে সে যেন কোনদিন পায়নি। যতই সে ওকে নিজের করে পেতে চেয়েছে ততই যেন বনহুর সরে গেছে দূরে, আরও দূরে। আজ নূরী গায় গান, অন্তরের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে গায়।
দূরীর গানের সুর শুধু বনহুরের মনেই দোলা জাগায় না, দোলা লাগে ঘন বনের শাখায়, দোলা লাগে জোছনাভরা পাহাড়িয়া নদীর উচ্ছল জলরাশির বুকে। দোলা জাগে প্রকৃতির বুকে।
বনহুর নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকে নূরীর মুখের দিকে। নূরী বনহুরের হাতখানা তুলে নেয় নিজের হাতে।
০৭.
জটাজুটধারী দু’জন সন্ন্যাসী দ্রুত পাহাড়িয়া পথ ধরে গহন বনের দিকে এগুচ্ছে। শরীরে তাদের ভস্মমাখা। ললাটে চন্দনের তিলক। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা।.দক্ষিণ হাতে লোহার চিমটা। দু’জনের কাঁধেই এক একটা ঝোলা। সামনের সন্ন্যাসীর হাতে ঝোলার মধ্যে মনিরার নয়নের মনি নূর।
নূরকে দুধের সঙ্গে সামান্য ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দেয়া হয়েছে। তাই নূর ঝোলার মধ্যে অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
সন্ন্যাসীদ্বয় দ্রুত এগুচ্ছে।
পূর্ণিমা রাতের তৃতীয় প্রহরে তাদের মা কালিকা পূজা। প্রতি পূর্ণিমা রাতেই এই সন্ন্যাসীদ্বয় যেখান থেকে হোক একটি নরশিশু সংগ্রহ করে আনে। গহন বনের মধ্যে বাস করে এক কাপালিক সন্ন্যাসী। তার সামনেই হাজির করে ওরা সেই শিশুকে। কাপালিক ঐ শিশুকে কালীর চরণে সমর্পণ করে সিদ্ধিলাভ করে। শিশুটিকে কালীদেবীর সামনে বলি দেয়া হয়, তারপর সেই রক্ত এক নিঃশ্বাসে পান করে কাপালিক। তখন তার সাধনা জয়যুক্ত হয়।
প্রতি মাসে যেখান থেকেই হোক একটি নিখুঁত শিশু তাদের চাই। এবং সে শিশুর শরীরে কোন সংকেতপূর্ণ চিহ্ন থাকতে হবে।
এই নর-রক্তপিপাসু কাপালিকের জন্য প্রতি মাসে পূর্ণিমা রাতে কালীপূজার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে এ ধরনের নিখুঁত এবং শরীরে কোনো সংকেত চিহ্নযুক্ত শিশু সংগ্রহ করে আনার জন্যই এই সন্ন্যাসীদ্বয় অহরহ ঘুরে বেড়ায়।
চুরি করে হোক, দস্যুতা করে হোক, অর্থ দিয়ে হোক, শিশু, তাদের চাই!
এবার বহু অনুসন্ধান করেও পূর্ণিমা রাতের কালী পূজার জন্য কোন শিশু সুগ্রহ করতে না পারায় সন্ন্যাসীদ্বয় বিফল মনে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ একটা লোকের কোলে নূরকে দেখতে পেয়ে চমকে উঠেছিল সন্ন্যাসীদ্বয়। তারপর ওর পিছু লেগেছিল, এবং নূরকে বহু টাকা দিয়ে কিনে নেয় ওরা।
অবিরাম গতিতে পথ চলছিল সন্ন্যাসীদ্বয়।
ঝিন্দ শহর থেকে বসুন্ধরা পর্বত, তারপর ভগগদিয়া নদীতীর, তারপর আরও কত বন-পাহাড়-জঙ্গল অতিক্রম করে সন্ন্যাসীদ্বয় এগিয়ে চলেছে।
মাঝে কয়েকদিন কেটে গেছে।
নূর জেগেছিল, একবার নয়, কয়েক দিনের মধ্যে অনেকবার আবার তাকে ঔষধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে।
অবোধ শিশু নূর জাগলেই কাঁদতে শুরু করে। মায়ের জন্য চারদিকে তাকায়, কথা সে বলতে শেখেনি এখনও। বয়স মাত্র আট-ন’ মাস হবে। শুধু মাকেই চিনেছিল সে।
ঘুমের ওষুধের গুণ নষ্ট হবার সঙ্গে সঙ্গেই জেগে ওঠে নূর। কাঁদতে শুরু করে, তখন নরপিশাচদ্বয় আবার তাকে কিছু দুধ খাইতে দেয়, সঙ্গে থাকে একটু ঘুমের ওষুধ। চতুর শয়তানদ্বয় লক্ষ্য রাখে, যেন শিশুর কোন ক্ষতি না হয় বা মরে না যায়। তাহলে তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে। কাপালিক বাবাজীর পূজা না হলে তাদের গর্দান যাবে। কাজেই নূরের যেন কোন ক্ষতি না হয়, সেদিকে ছিল সন্ন্যাসীদ্বয়ের নিপুণ দৃষ্টি।
০৮.
এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশ।
বন, নদী, প্রান্তর, পাহাড়, পর্বত পেরিয়ে সন্ন্যাসীদ্বয় তাদের কাপালিকের আশ্রয়ে পৌঁছতে সক্ষম হল। আজ দোল পূর্ণিমা। নরশিশুর রক্তে কাপালিক তার কালীমায়ের চরণ রাঙা করবে।
সন্ধ্যা থেকে কাপালিকের সাধনা শুরু হয়েছে। সবাই নরবলি দিয়ে থাকে অমাবশ্যা রাতে, আর এই কাপালিক নরবলি দেয় পূর্ণিমা রাতে। তার কালীমায়ের নাকি নির্দেশ রয়েছে।
