সেদিন মাহফুজ সাহেবের একমাত্র কন্যা রেবেকা কোন ফাংশন থেকে বাড়ি ফেরার পথে উধাও হয়েছে, এখন পর্যন্ত পুলিশ তার কোন সন্ধান করতে পারেনি। গোটা শহর তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে কিন্তু কোথাও রেবেকার খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ইতোপূর্বে আরও কয়েকটি যুবতী শহরের বুক থেকে নিখোঁজ হয়েছে, তাদেরও কোন পাত্তা পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত।
পুলিশমহল যদিও কিছুদিন বেশ আরামেই দিন কাটাচ্ছিলেন কিন্তু এই নারীহরণ ব্যাপার নিয়ে আবার তারা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শহরের বিশিষ্ট জননায়ক মাহফুজ সাহেবের কন্যাচুরির ব্যাপার নিয়ে পুলিশমহলে আবার আলোড়ন দেখা দিল।
দিনের পর দিন এমনিভাবে মেয়ে-চুরি বেড়েই চলেছে। এসব মেয়ে কোথায় যাচ্ছে, কোথায় তাদের চালান করা হচ্ছে এর কোন হাদিস পাওয়া যাচ্ছে না! শুধু নারীহরণই নয়, ছোট ছোট ছেলেমেয়ে চুরিরও যেন একটা হিড়িক পড়ে গেছে। আজ এর ছেলে, কাল ওর ছেলে, ওর মেয়ে—এমনি। দু’চার দিন পর পর ছেলে-মেয়ে চুরি হয়ে যাচ্ছে অথচ পুলিশ আজও তার কোন সুরাহা করতে পারছে না।
ছেলে-মেয়ে ও নারীহরণ লেগেই আছে অথচ এ ব্যাপারটার পুলিশমহল যেন তেমন গুরুত্বই দেয় না। এ নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবারও কারও সময় নেই যেন। কিন্তু নারীহরণ এবং ছেলে-মেয়ে চুরি যে দেশ ও দশের পক্ষে কত অমঙ্গল এবং ক্ষতিকর তা সত্যি ভাবার বিষয়।
এতদিন ব্যাপারটা গ্রাহ্য না করলেও এবার মাহফুজ সাহেবের কন্যা চুরির যাওয়ায় শহরে তোলপাড় শুরু হল।
অনেকেরই ধারণা, এই নারীহরণ ব্যাপারটা অন্য কারও নয়–দস্যু বনহুরেরই কাজ। সে এখন দস্যুতা ত্যাগ করে নাকি নারীহরণ শুরু করেছে।
কথাটা এক সময় রহমানের কানে এসে পৌঁছল। জনসাধারণের ধারণা এবং পুলিশমহলেরও সন্দেহ এটা দস্যু বনহুর ছাড়া আর কারও কাজ নয়।
দস্যু হলেও রহমান মানুষ, কথাটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করল সে। সত্য হলে সে কিছুই মনে করত না কিন্তু এত বড় একটা মিথ্যাকে সে কি করে স্বীকার করবে! তাদের সর্দারের সম্বন্ধে জনসাধারণের মনে এ কুৎসিত ধারণা রহমানকে ব্যথিত করে তুলল।
সেদিন বনহুর তার বিশ্রামকক্ষে অর্থশায়িত অবস্থায় উদাস মনে কি যেন চিন্তা করছিল। নূরী পাশে এসে বসল, বলল—হুর কি ভাবছ?
বনহুর মৃদু হেসে বলল–কিছু না।
আজকাল বনহুর নূরীর সম্মুখে কোন সময় নিজেকে ভাবাপন্ন বা উদাসীন রাখে না। যতটুকু পারে নিজেকে সংযত রেখে নূরীর সাথে হাসি-খুশিভাবে কথাবার্তা বলে। নূরী সত্যি তাকে কত ভালবাসে, মর্মে মর্মে তা উপলব্ধি করেছে সে। নূরী তাকে প্রাণের চেয়ে ভালবাসে। আর মনিরার কথা স্মরণ হতেই তীব্র ঘৃণা তার সমস্ত মনকে বিষিয়ে তোলে। মনিরা তাকে ভালবাসার নামে মিথ্যা ছলনা দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছিল। অবিশ্বাঙ্গিনী মনিরা–একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা বনহুরের হৃদয়কে নিষ্পেষিত করে চলে। বনহুর যতই মনিরার স্মৃতি ভুলে যাবার চেষ্টা করে ততই যেন তার মুখখানা বারবার ভেসে ওঠে মনের আকাশে। তাই বনহুর আজকাল প্রায়ই নূরীকে নিজের পাশে পাশে রাখে, নূরীকে দিয়ে ভুলে যেতে চায় মনিরাকে।
বনহুরের সংস্পর্শে নূরী এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে। আবার তার ওীবনধারা হয়েছে স্বচ্ছ স্বাভাবিক। হাসি-গানে মুখর হয়ে উঠেছে নূরী।
নূরীর জন্য ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েছিল বনহুর, এখন সে চিন্তা আর নেই। নূরী আবার স্বাভাবিক জীবন লাভ করেছে–এটা তার চরম আনন্দ। তাই বনহুর কোন সময় নূরী মনে ব্যথা পায়—এমন ধরনের কথা বলে না বা সে ধরনের কাজ করে না।
নূরীর আগমনে বনহুর মনের চিন্তা দূরে ঠে ঠলে দিয়ে বলল–নূরী, তুমি আমাকে অনেক ভালবাস, না?
নূরী বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে অভিমানভরা কণ্ঠে বলল–এ কথা তুমি আমাকে বারবার জিজ্ঞাসা কর কেন?
শুনতে ভাল লাগে নূরী।
কি জানি, এবার ফিরে আসার পর তুমি যেন কেমন হয়ে গেছ।
কেমন হয়ে গেছি নূরী? মন্দ না ভাল?
অনেক ভাল।
বেশ।
তার মানে।
মানে তোমার ভাল লাগাই যে, আমার ভাল লাগা, আমার আনন্দ নূরী। যাক, চলো একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
নূরীর হাত ধরে বনহুর তার পাতালপুরীর গোপন আস্তানা থেকে সুড়ঙ্গপথে এগুতে থাকে।
হাজার ফিট মাটির তলায় দস্যু বনহুরের গোপন আস্তানা। কান্দাই বনে আস্তানা থাকাকালীন বনহুর এ ভূগর্ভে গোপন আস্তানা তৈরি করেছিল। লাখ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে এ আস্তানা তৈরি করতে!
বনহুরের এ আস্তানা এমন জায়গায় যেখানে কোনদিন পুলিশ বা সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না। অদ্ভুত কৌশলে তৈরি এ আস্তানাটি।
মিঃ জাফরী, যখন পুলিশ ফোর্স নিয়ে বনহুরকে কান্দাই বনের আস্তানায় হামলা করেছিলেন, তখন বনহুর তার এই পাতালপুরীর গোপন আস্তানায় নিশ্চিন্ত মনে সরে পড়েছিল। মিঃ জাফরী এবং তার দলবল অনেক অনুসন্ধান চালিয়েও বনহুরকে খুঁজে পাননি।
এই সেই আস্তানা।
নূরী আর বনহুর যখন বাইরে এসে পৌঁছল তখন পৃথিবীর বুকে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। বনের পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে পূর্ণিমার চাঁদ, পূর্ণচন্দ্রের জোছনার আলো বনভূমিতে সোনালী আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। একটা নির্মম স্নিগ্ধ হাওয়া সাদর সম্ভাষণ জানাল নূরী আর বনহুরকে। বনহুরের শরীরে স্বাভাবিক ড্রেস। সাদা ধবধবে পাজামা আর পাঞ্জাবী। বড় সুন্দর লাগছিল ওকে। পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে বনহুর আর নূরী!
