ওরা চলে যাবার সময় ঘরের দরজায় তালাবদ্ধ করে চলে গেল।
এবার মনিরার আর একজন সঙ্গী জুটলো। যা হোক তবু কথা বলার একজন হল।
যুবতী দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
এগিয়ে গেল মনিরা। আঁচলে নিজের চোখের পানি মুছে ফেলে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে বলল-বোন কেঁদো না, আমিও তোমার মত একজন।’
মুখ থেকে হাত সরিয়ে তাকাল যুবতী। এই নরপিশাচদের বাসস্থানে এমন একটা মধুর কণ্ঠস্বর। যুবতী কোন কথা বলতে পারল না, শুধু তাকিয়ে রইলো।
মনিরা বলল-বোন, তুমি কি করে এদের ফাঁদে পড়লে জানতে পারি?
যুবতী আকুলভাবে কেঁদে উঠল, বলল-আমাকে ওরা ফুসলিয়ে নিয়ে এসেছে।
সে কি!
হ্যাঁ, আমার বুড়ো বাপের সঙ্গে আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। বাবা আর আমি ফেরার পথে গাড়ির জন্য, পথের ধারে অপেক্ষা করছি এমন সময় একটা বুড়োমত লোক এসে বাবাকে, কোথায় যেন ডেকে নিয়ে গেল। একটু পর ফিরে এলো লোকটা, বলল-আমি তোমার বাবার বন্ধু, তোমার বাবা আমাদের বাড়িতে অপেক্ষা করছেন, তুমি আমার সঙ্গে এসো। আমি কোনরকম দ্বিধা না করে ওর সঙ্গে গাড়িতে উঠে বসলাম, কারণ একটু পূর্বে বাবা ওর সঙ্গেই যখন গেলেন তখন নিশ্চয়ই তিনি ওদের ওখানেই আছেন। কাজেই আমার কোন সন্দেহ হল না।
মনিরা ব্যাকুল আগ্রহে প্রশ্ন করল–তারপর?
তারপর আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে এলো, বাবাকে তো দেখছি না। ঐ যে ভংকর মেয়েলোকটা, আমাকে সেই আটকে রাখল। বলতে পার কেন আমাকে ওরা এ ঘরে বন্ধ করে রাখল। আর তুমিই বা কে?
মনিরা ব্যথাকাতর কণ্ঠে বলল–আমিও তোমার মত একটা অসহায় মে, আটকে রেখেছে’ আমাকেও তোমার মত-উদ্দেশ্য ওদের খুব খারাপ।
কি করবে ওরা আমদের বন্দী করে রেখে?
কোন দুষ্ট লোকের কাছে বিক্রি করবে।
তাই নাকি!
হ্যাঁ, এরা মেয়ে বিক্রির ব্যবসা করে।
সত্যি?
হ্যাঁ, নইলে তোমাকে এখানে ফুসলিয়ে এনেছে কেন?
তোমাকেও বুঝি ফুসলিয়ে এনেছে এরা?
মনিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলল-না, আমি নিজেই ভুল করে ফাঁদে পা দিয়েছি।
মনিরা অল্পক্ষণের মধ্যেই যুবতীর সঙ্গে ভাব জমিয়ে নিল। এই নির্জন কক্ষে অসহায় অবস্থায় ওকে পেয়ে ভালই হল মনিরার। মনের ব্যথা তবু একটু কমলো, নূরের কথা খুলে বলল—সেই যুবতীর কাছে।
যুবতী নিজের পরিচয় দিল নাম তার সুফিয়া। মনিরা নিজের খাবার সুফিয়াকে খেতে দিল।
সারাটা দিন কেটে গেল, রাত হল।
মনিরা আর সুফিয়া নানারকম দুঃখভরা কথা আলোচনা করল। এদের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় কিনা–এ নিয়ে কথাবার্তা হল দু’জনের মধ্যে। কিন্তু কোন উপায়ই খুঁজে পেল না ওরা।
রাতে দু’জনে পাশাপাশি গালিচায় শুয়ে পড়ল। নানা রকম ভয় ও দুশ্চিন্তা উঁকি দিয়ে যাচ্ছে মনিরার মনে। বারবার মনে হচ্ছে নূরের কথা, আর কোনদিন সে নূরকে দেখতে পাবে না, স্মরণ হতেই আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল। চোখের পানিতে গালিচা ভিজে চুপসে উঠল।
সুফিয়া মেয়েটা সারাটা দিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল। পাশে মনিরা দ্রিাহীন চোখে চিন্তার জাল বুনে চলেছে। রাত বেড়ে আসছে।
হঠাৎ একটা শব্দে মনিরা চমকে উঠল। না, ও কিছু নয়, দরজাটা ভালভাবে তালা দেয়া আছে কিনা, কেউ বোধ হয় সেটাই পরীক্ষা করে দেখে গেল।
মনিরা আবার শুয়ে পড়ল। বুকের মধ্যে তখন জমাট ব্যথা গুমড়ে কেঁদে মরছে।
লক্ষ্মী ছেলেটির মত শান্ত হয়ে পড়েছে যেন দস্যু বনহুর। ঝিন্দ থেকে ফিরে আসার পর সে একটা দিনের জন্যও দরবারকক্ষে প্রবেশ করেনি বা তার অনুচরগণকে ডেকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করেনি। কেমন যেন উদাস হয়ে গেছে দস্যু বনহুর, দস্যুতা যেন ভুলেই গেছে সে।
সর্দারের উদাসীনতা তার অনুচরগণের মনে একটা নৈরাশ্য ভাব এনে দিয়েছে। বিশেষ করে রহমান আশঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সর্দার যদি এমন হয়ে পড়ে তাহলে দল চলতে পারে না। আর কতদিন রহমান নিজে দল। চালাবে।
দস্যু বনহুরের নীরবতায় কতগুলো শয়তান মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে নানা রকম গোপন চোরা কারবার শুরু হয়েছে। নানা রকম গুপ্ত গুণ্ডামি চলছে, যা পুলিশের সুক্ষ্ম দৃষ্টিকেও হার মানিয়েছে। পুলিমহল জানে, আজকাল দেশ শান্ত, নীরব। দস্যু বনহুর নিখোঁজ হওয়ায় দেশে শান্তি বিরাজ করছে।
কিন্তু আসল ব্যাপারটা ছিল ঠিক তার উল্টো। দস্যু বনহুরের ভয়ে দেশবাসীর প্রাণে জাগে আতঙ্ক, সবাই দুর্ভাবনায় রাত কাটায় সত্য, কিন্তু আসলে কি বনহুর অন্যায়ভাবে কারও ওপর উপদ্রব করে রা করেছে? কোনদিন সে কোন অসহায় অনাথের প্রতি আঘাত হানেনি। কোন মহৎ ব্যক্তির ধনরত্ন লুটে নেয়নি। দস্যু বনহুরের প্রচণ্ড থাবা সব সময়ই টুটি টিপে ধরেছে যত অনাচারী অত্যাচারী আর বদমাইশদের, দেশের যত দুষ্টু কুচক্রী দলের ওপরই সে বারবার হামলা করেছে। দলিত মথিত নিষ্পেষিত করে তবেই ক্ষান্ত হয়েছে দস্যু বনহুর। দেশের দুষ্ট লোকদের দমন করতে গিয়েই সে সকলের কাছে হয়েছে ভয়ঙ্কর, ভয়ের কারণ। পুলিশের কাছেও সে হয়েছে দোষী অপরাধী।
কাজেই দস্যু বনহুর দেশের একজন মহান ব্যক্তি হয়েও সকলের কাছে হয়েছে ভয়াবহ।
সেই ভয়ঙ্কর ভীতিকর লোকটার এহেন নীরবতার শুধু দেশবাসীই নয়, পুলিশমহলও নিশ্চিন্ত আশ্বস্ত ছিল।
কিন্তু সম্প্রতি শহরে বা শহরের আশেপাশে একটা নতুন চঞ্চলতা দেখা দিয়েছে। নারীহরণ ব্যাপারটা যেন আজকাল আরও বেড়ে গেছে। মাঝে মাঝে এখান সেখান থেকে প্রায়ই মেয়েছেলে চুরি নিয়ে পুলিশ অফিসে ডায়েরী হচ্ছে। পুলিশ এ নিয়ে চূড়ান্ত চেষ্টা করেও এর কোন সমাধান করতে সক্ষম হয়নি।
