ছেলে! গর্জন করে উঠল মহিলা ছেলে নেবে?
হ্যাঁ, আমার ছেলে দাও?
হেসে উঠল ভীমকায় মেয়েলোকটি–ছেলেকে আর পাচ্ছো না।
কেন! কোথায় নূর?
সে এখন চলে গেছে–অনেক দূরে, বুঝেছ?
কোথায় তাকে পাঠিয়েছ তোমরা? কি করেছ তাকে?
বিক্রি হয়ে গেছে–তোমার চেয়ে তার মূল্য আমি অনেক বেশি পেয়েছি! তার দক্ষিণ বাজুতে যে কাল জট রয়েছে, সেই জটই তার মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে, বুঝেছ?
মনিরার মনে পড়ল–নূরের দক্ষিণ হাষ্ঠের বাজুর ওপর কাল একটা জট ছিল, নূরের জন্মের পর মনিরা অবাক হয়েছিল প্রথমে, এমন হয়েছে কেন! নেড়েচেড়ে দেখল সে নূরের সাদা ধবধবে ছোট বাজুর ওপর কাল একটা দাগ ঠিক একটা পয়সার মত। তবে কি সেটা, কোন লক্ষণযুক্ত, সন্তান তার? হয়তো কিছু হবে, নইলে আজ এ কথা শুনবে কেন? ব্যাকুল কণ্ঠে প্রশ্ন করল মনিরা কোথায়, কার নিকট তোমরা বিক্রি করেছ? তোমাকে আমি অনেক অনেক টাকা দেব, আমার সন্তানকে তোমরা ফিরিয়ে এনে দাও।
টাকা, ভিখারিণী দেবে টাকা! কোথায় পাবি টাকা? কর্কশ কণ্ঠে প্রশ্ন করল মহিলাটি।
মনিরা তেমনি ব্যাকুল কণ্ঠে বলল–ওর বাবা লাখ লাখ টাকার, মালিক। যত টাকা চাও, তাই পাবে তোমরা। আমার নয়নের মনিকে তোমরা ফিরিয়ে এনে দাও।
আবার মহিলাটি বিকট শব্দে হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল। তারপর ব্যঙ্গপূর্ণ কন্ঠে বলল, ওর বাবা লাখ লাখ টাকার মালিক, আর তুমি ওর মা হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিলে এতটুকু আশ্রয়ের জন্য–হাঃ হাঃ হাঃ! হাসিতে ফেটে পড়ল বিশাল বপুধারিণী। হাসি থামিয়ে বলল আবার—এতক্ষণে হয়তো তোমার সন্তানের রক্তে কাপালিক সন্ন্যাসী তার কালীপূজা শেষ করছে–
শয়তান মেয়ে লোকটার কথা শেষ হয় না, মনিরা তার বাঁধা হাত দুটি দিয়ে চেপে ধরল মেয়েলোকটার গলা–কি বললি! কি বললি পিশাচিনী–
সঙ্গে সঙ্গে মেয়েলোকটা হাতে তালি দিল, অমনি দু’জন বলিষ্ঠ লোক মনিরাকে সরিয়ে নিল।
মেয়েলোকটা তার বিরাট দেহটা নিয়ে ক্রুদ্ধ সিংহীয় ন্যায় গর্জন করে উঠলো–নিয়ে যাও! ঐ ঘরে আবার বন্ধ করে রাখ। রাক্ষসী দেখছি পুত্রশোকে ক্ষেপে উঠেছে। আমাকেও হত্যা করতে যাচ্ছিল–দাঁতে দাঁত পিষে বলল আবার—হেমাঙ্গিনীর হাতে পড়েছ। যার হাতে সাতটা জোয়ান পুরুষ ভেড়া বনে যায় তুমি তো একটা পুচকে ছুড়ী! নিয়ে যা, হা করে দাঁড়িয়ে রয়েছিস কেন?
বলিষ্ঠ জোয়ান লোক দুটি মনিরাকে একরকম শূন্যে ঝুলিয়েই নিয়ে চলল।
০৫.
আবার সেই কক্ষ।
মেঝেতে গালিচা পাতা। কতগুলো তাকিয়া ছড়ানো রয়েছে গালিচার একপাশে। কয়েকটা মদের বোতল এপাশে ওপাশে কাৎ হয়ে পড়ে আছে, কাঁচের কয়েকটা গ্লাসও বিক্ষিপ্ত ছাড়ান। কক্ষে তখনও ইলেকট্রিক আলো জ্বলছে।
মনিরাকে কক্ষে ঠেলে দিয়ে লোক দুটো দরজায় তালা আটকিয়ে চলে গেল।
মনিরা দু’হাতে দরজায় ঝাঁকুনি দিয়ে খোলার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু একচুলও নড়লো না বা দুললো না শালকাঠের দরজাটা।
মেঝেতে পড়ে মাথা আছড়ে কাঁদতে লাগল সে। হায়, একি হল তার! একি সর্বনাশ হল। সব হারাল মনিরা–স্বামী-পুত্র সব। ছোটবেলায় পিতা-মাতাকে হারিয়েছিল, বড় হয়ে মামাকে হারাল, মামী বেঁচে থেকেও আজ নেই–মেই তার কোন আত্মীয়স্বজন। স্বামী তার স্বাভাবিক মানুষ নয়, তবু ছিল তার পাশে-সেও আজ নেই। একমাত্র নূর ছিল তার সম্বল তাকেও হারিয়েছে। শুধু হারিয়েই যায়নি সে, চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়ে চলে গেছে। কোন সন্ন্যাসীর হাতে অবোধ শিশু নূর জীবন বিসর্জন দিয়েছে–আর ভাবতে পারে না, মনিরা–বুকটা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
দিনরাত মাথা ঠুকে কাঁদলেও আর সে ফিরে আসবে না। আর তার বুকে মুখ লুকিয়ে ফিক্ ফিক করে হাসবে না। আধো আধো কণ্ঠে মা-মা বলে ডাকবে না। মনিরা নিজের চুল নিজেই ছিড়তে লাগল, বুকে আঘাত করে চিৎকার করে ডাকল নূর-নূর, কিন্তু কেউ তার ডাকে সাড়া দিল না।
ক্ষুধা-পিপাসায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েছিল মনিরা, সব ভুলে গেছে। নূরের মৃত্যু-সংবাদে সব ভুলে গেছে সে।
কখন যে তার সামনে কে খাবার রেখে গেছে দেখতেই পায়নি মনিরা। পিপাসায় কণ্ঠতালু শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মনিরার দৃষ্টি পানির পাত্রে পড়তেই দু’হাত বাড়িয়ে গেলাসটা তুলে নিল এক নিঃশ্বাসে পানি পান করে শূন্য গ্লাসটা রেখে দিল মেঝেতে।
ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করল দু’টি লোক, সঙ্গে আর একটি যুবতী এবং সেই বিশাল দেহধারিণী হেমাঙ্গিনী। মনিরা লোক দুটির একজনকে দেখে চিনতে পারল, যে তাকে প্রথম দিন এ বাড়িতে আশ্রয় দেবার আশা দিয়ে নিয়ে এসে ছিল সে অন্যজুন–নতুন লোক।
মনিরা যুবতীটির দিকে তাকাল, বেশ বুঝতে পারল তাকেও জোরপূর্বক ধরে আনা হয়েছে। মেয়েটার বয়স মনিরার চেয়েও কিছু কম হবে। দেখতে, মনিরার মত এত সুন্দরী নয়, তবে একেবারে মন্দও নয়। মেয়েটার চোখে। মুখে অসহায় ভাব। সে যে কেঁদেছে তার মুখ দেখেই বুঝা গেল। যুবতী, মনিরার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে আছে।
হেমাঙ্গিনী লোক দুটিকে লক্ষ্য করে বলল-একেও এই ঘরে বন্দী করে রাখ। খদ্দের এলে আমার সঙ্গে দাম দর হবে।
যুবতীটিও যে মনিরার মতই একজন সর্বহারা এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, সে তার সমস্ত আত্মীয়-পরিজনের নিকট হতে বিচ্ছিন্ন।
হেমাঙ্গিনী তার অনুচরদ্বয়কে সঙ্গে করে বেরিয়ে গেল। যাবার সময় আর একবার তীবকটাক্ষে মনিরাকে দেখে নিল। সে কি জ্বালাময় বিষভরা চাউনি। মনিরার হৃৎপিণ্ডের রক্ত যেন জমে এলো।
