যেমনি লোকটা মনিরাকে ধরতে গেল–অমনি মনিরা খাট থেকে নেমে সরে দাঁড়াল। বুকটা ধক ধক করতে লাগল তার।
লোকটার দু’চোখে লালসাপূর্ণ চাহনি। দু’হাত মেলে এগুতে লাগলো মনিরার দিকে।
মনিরা নিজেকে বাঁচাবার জন্য ব্যাকুল নয়নে চারদিকে তাকাল। হঠাৎ সৈ হাতের পাশে অনুভব করল শক্ত একটা জিনিস।
মনিরা হাতের মুঠায় তুলে নিল জিনিসটা—একটা পাথরের ক্ষুদে বাঘ সেটা।
লোকটা ক্রমেই এগিয়ে আসছে।
মনিরা পিছু হটতে হটতে দেয়ালে গিয়ে ঠেকে পড়ল, আর কোন্ দিকে সরবে। লোকটা এবার ধরে ফেলবে–মনিরা উপায় না দেখে হাতের পাথুরের মূর্তিটা ছুড়ে মারল লোকটার মাথা লক্ষ্য করে।
মনিরার লক্ষ্য ব্যর্থ হল না, লোকটার মাথায় লেগে ছিটকে পড়ল মেঝেতে।।
লোকটা আর্তনাদ করে উঠল। তারপর দু’হাতে মাথা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল।
সঙ্গে সঙ্গে মনিরা দরজা দিয়ে বেরিয়ে ছুটতে শুরু করল কিন্তু বেশিদূর এগুতে না এগুতেই দুজন লোক মনিরাকে ধরে ফেলল, বলল—পালাচ্ছ। কোথায়? দশ হাজার টাকা তোমার দাম।
টেনে হিচড়ে মনিরাকে আবার সেই ঘরে নিয়ে এল লোক দু’টি।
মনিরা তাকিয়ে দেখল তার হাতে আহত ব্যক্তি এখনও মেঝেতে বসে কাতরাচ্ছে। রক্তেরাঙা হয়ে উঠেছে তার জামা-কাপড়। কয়েকজন গুড়া প্রকৃতির লোক ওর মাথার ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে।
মনিরা বুঝতে পারল, এটা কোন গুণ্ডাদলের আস্তানা। এখানকার প্রত্যেকটা লোকের চেহারা শয়তানের মত দেখতে। যে লোকটা তাকে কিনে এনেছে এবং তার হাতে আহত হয়েছে, সেই যে এ দলের নেতা বা সর্দার তা বুঝতে বাকী রইল না মনিরার।
লোক দু’জন মনিরাকে পুনরায় সেই কক্ষে এনে পিছমোড়া করে খাটের সঙ্গে বেধে ফেলল।
ততক্ষণে দলপতির মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধা হয়ে গেছে। এবার রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল সে মনিরার দিকে, তারপর গর্জন করে বলল–চাবুক লাগাও! শরীরের চামড়া ছিড়ে ফেল।
হুজুর, চাবুক লাগালে মরে যাবে যে! বলল একটা লোক।
দলপতি হুঙ্কার ছাড়ল–মরুক—
অন্য একজন বলল—হুজুর দশ হাজার টাকা—
যেতে দাও!
তার চেয়ে ওকে ফেরত দিয়ে দেয়াই ভাল।
হ্যাঁ, ঠিক কথা বলেছ! তাই করব, এমন রাক্ষসী মেয়ে আমি চাইনা। যাও, ওকে আজই চালান করে দাও।
আচ্ছা হুজুর, তাই করব। করব নয়-কর।
উপস্থিত চাবুকের আঘাত থেকে বেঁচে গেল মনিরা, তার ওপর তাকে আবার সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে যেখানে তার নূর আছে। মনে মনে খুব খুশি হল সে। বুকের মধ্যে নুরের জন্য তোলপাড় শুরু হয়েছে। কিন্তু কখন নিয়ে যাবে? আর কতক্ষণ পরে? মনিরা ছটফট করতে লাগল।
কিন্তু মনিরা যত সহজে পরিত্রাণ পারে ভেবেছিল তত সহজে পেল না। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে ঐ খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হল। কিছু খেতেও দেয়া হল না।
সন্ধ্যার পর যখন গোটা পৃথিবী ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন হল তখন মনিরাকে হাত-পা-মুখ বেঁধে একটা ঘোড়ার গাড়িতে তুলে নিল ওরা।
গাড়ি চলতে শুরু করল মনিরা কিছু দেখতে পাচ্ছে না, শুধু অনুভব করছে সে গাড়িটা কোন উচুনীচু পথ ধরে এগুচ্ছে। প্রচণ্ডভাবে গাড়িখানা নড়ছে আর দুলছে।
বেশ কিছু সময় ধরে, গাড়িখানা এমনিভাবে চলার পর এবার মনে হল বেশ সমান পথ ধরে চলতে শুরু করল গাড়িটা। আর কোন রকম ঝাকুনি লাগছে না।
মনিরা গাড়ির মধ্যে থেকেই বুঝতে পারছে, যে পথ বেয়ে এখন। তাদের গাড়ি চলেছে সেটা জনমুখর রাজপথ। নানা রকম যানবাহনের শব্দ তার কানে আসছে। সময়টা রাত। গাড়ির ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে রাস্তার লাইটপোষ্টের আলোও দেখা যাচ্ছে।
বেশ কিছু সময় চলার পর গাড়িখানা থেমে পড়ল। আশায় আনন্দে মনিরার মনের মধ্যে আলোড়ন হচ্ছে। যত দুঃখ-কষ্টই হোক নূরকে সে বুকে ফিরে পাবে, এটাই তার বড় পাওয়া।
গাড়ির দরজা খুলে তাকে বের করে আনা হল। যদিও মনিরার হাতমুখ বাধা ছিল তবু দেখতে পেল এটা সেই বাড়ি যে বাড়িতে একদিন মনিরা রাতের মত আশ্রয়ের আশায় প্রবেশ করেছিল। সেই ভীমকায় মহিলার চেহারা মনে পড়তেই মনিরার বুক কেঁপে উঠল, না জানি আবার তার অদৃষ্টে কি আছে!
মনিরাকে বাড়ির ভেতর নিয়ে যাওয়া হল।
সেই কক্ষে, যে কক্ষে মনিরা প্রথম প্রবেশ করে ঐ বিরাট বপুধারিণী নারীটিকে দেখতে পেয়েছিল। মনিরাকে নিয়ে দুটি লোক সেই কক্ষে প্রবেশ করল।
একজন বলল–একে তিনি ফেরত পাঠালেন।
কর্কশ কন্ঠে গর্জে উঠল বিরাট বপুধারিণী–ফেরত পাঠাল, কেন, কি হয়েছে?
মহিলার গর্জনে লোক দুটোর বুক থর থরিয়ে কেঁপে উঠল, অন্যজন। হাতে হাত কচলে বলল—এমন রাক্ষসী মেয়ে নিয়ে আমাদের চলবে না। আমাদের মনিবকে এ আহত করেছে।
দাঁতে দাঁত পিষল বিরাট বপু ধারিণী—কি বললে!
মনিবকে জখম করে দিয়েছে—এই শয়তানী!
তাই নাকি? একটু থেমে বলল মহিলা একটা মেয়েকে বাগে আনতে পারলো না, এমন পুরুষের বাচ্চা তোদের মনিব। আরে ছোঃ, থুক দেই অমন পুরুষের মুখে। তারপর বিছানার তলা থেকে একতাড়া নোট বের করে ছুড়ে দিল সে লোক দুটোর গায়ে—নিয়ে, যা তোদের মনিবকে দিয়ে দিস। হতভাগাগুলো!
লোক দুটো টাকার তাড়াগুলো দ্রুত হস্তে কুড়িয়ে নিল তারা পালাতে পারলে যেন বেঁচে যায়।
লোক দুটি বেরিয়ে যেতেই হুংকার ছাড়ল মহিলাটি–শয়তানী, বড্ড বেপরোয়া হয়েছ! জান কার হাতে পড়েছ তুমি?
মনিরা তাকিয়ে দেখল বিরাট দেহধারিণীর দু’চোখে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। দাঁত কটমটিয়ে তাকাচ্ছে তার দিকে। . মনিরার মন তখন নূরের জন্য ছটফট করছে। মায়ের প্রাণ অস্থির হয়ে উঠেছে। আকুলভাবে কেঁদে বলল মনিরা–আমার ছেলে কোথায়? আমার ছেলে?
