০৩.
আজ প্রায় বছর হয়ে এলো কায়েস এই অন্ধকার কারাকক্ষে বন্দী। প্রথম প্রথম একটু কিছু খাবার সে পাচ্ছিল। হয়তো কোনদিন শুকনো রুটি কিংবা ভাত। এখন কিছুদিন হলো তাও আর পায় না কায়েস। কেউ আর আসে না বা খাবার দিয়ে যায় না তার কারাকক্ষে। একটা মাটির হাঁড়িতে কিছু পানি ছিল সেই পানি খেয়ে কোনরকমে জীবনে বেঁচে রয়েছে। সে পানির মধ্যেও ছোট ছোট এক রকম কীট জন্মে গেছে। পানির রংটাও পাল্টে, সবুজ আকার ধারণ করেছে। তবু চোখ বন্ধ করে তৃপ্তির সঙ্গে সেই পচা দুর্গন্ধযুক্ত পানি পান করে কায়েস।
চেহারা কঙ্কালসার হয়ে গেছে। চোখ দুটো গর্তের মধ্যে বসে গেছে। চোয়াল দুটি উচু হয়ে উঠেছে কেমন বিশ্রীভাবে দাঁতগুলো বেরিয়ে এসেছে। মুখে একমুখ দাড়ি, মাথায় জটাধরা একমাথা চুল। আংগুলের নখগুলো মস্ত বড় বড় হয়ে গেছে। হঠাৎ কেউ কায়েসকে দেখলে মানুষ বলে চিনতেই পারবে না। একটা অদ্ভুত জীবের মত দেখতে হয়েছে সে।–
মানুষের প্রাণ এত শক্ত, এত কঠিন, এত কষ্টেও সে এখনো বেঁচে আছে—মরে যায়নি।
কিন্তু আর কতদিন সে এই নরক-যন্ত্রণা এমনি করে তিলে তিলে ভোগ করবে। কায়েস জীবনের আশা ছেড়েই দিয়েছে। বাঁচার সখ আর তার নেই। এ অবস্থাতেও কিন্তু কায়েসের মনে সদাসর্বদা মনিব-পত্নী মনিরার কথা উদয় হচ্ছিল। না জানি সে এখন কোথায়, কেমন আছে। তার গর্ভে সর্দারের সন্তান—না জানি সে সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার পর তার অবস্থা কেমন আছে। পুত্রসন্তান জন্মেছে না কন্যাসন্তান জন্মেছে কে জানে। বেঁচে আছে না মরে গেছে তাই বা কে জানে! কায়েসের মনে একটা ক্ষীণ আশার আলো মিটমিট প্রদীপের মত জ্বলতে থাকে। তার সর্দারের পত্নী মনিরার গর্ভে কন্যা না জন্মে যদি ছেলে জন্মগ্রহণ করে থাকে তাহলে একদিন আবার তার সর্দারের আসন পূর্ণ হবে–অন্ধকার কারাকক্ষে কায়েসের নিষ্প্রভ চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠল।
কায়েস যে কক্ষে বন্দী ছিল, সে কক্ষে মাত্র একটা দরজা ও হাওয়া প্রবেশের একটি ছোট গর্ত ছিল। গর্তটাও প্রায় ছাদের কাছাকাছি। সে গর্ত দিয়ে সামান্য আলো আসতো কারাকক্ষে। কখনও কখনও সে গর্তে সূর্যের ক্ষীণ আলোর ছটা দেখতে পেত কায়েস। বেশ কিছুদিন এ আলোর রশ্মি দেখতো আবার হয়তো ধীরে ধীরে আলোর ছটা মিশে যেত আর দেখা যেত। কায়েস বুঝতে পারতো.মাস পাল্টে যাচ্ছে তাই প্রকৃতির এই পরিবর্তন।
কিন্তু আর কত দিন এই অমানুষিক যন্ত্রণা ভোগ করবে। কেউ তো আর আসে না, কেউ তো আর তার সন্ধান নেয় না। তবে কি শয়তানের দল সব মরে গেছে না চলে গেছে এ দেশ ছেড়ে। তাকে হত্যা না করে জীবিত রেখেই চলে গেছে। তবু কায়েস কারও আগমন প্রতীক্ষায় দিন গোনে।
হঠাৎ একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। এত দিন তার মাথার উপর গর্তটা যদি আংগুল দিয়েও খুঁড়ে বড় করবার চেষ্টা করত তবু হয়তো সফলতা লাভ করতে পারত। যে কক্ষে কায়েসকে বন্দী করে রাখা হয়েছে সেটা যে মাটি নিচে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কায়েস একটু কষ্ট করলে ছাদটা নাগাল পেতে পারে। যদিও সিমেন্ট করা কিন্তু বহু দিনের পুরনো। চুন, বালু, ইট সব লোনা ধরে খসে খসে পড়ছে। কাজেই রোজ কিছু কিছু ভাঙার চেষ্টা করলেও এতদিন সে ঐ গর্ত দিয়ে বেরিয়ে যাবার মত ফাঁক করে ফেলতে পারত।
কায়েসের মনে একটা বেঁচে থাকার বাসনা উঁকি দিয়ে গেল। এবার সে তার ছাদের গর্তটা ফাঁক করার জন্য চেষ্টা নিল।
দিনরাত অবিরাম কাজ করে চলল কায়েস।
কখন রাত,কখন দিন যদিও বুঝার কোন উপায় ছিল না, তবু ঐ গর্তের সামান্য আলোতে সে বুঝতে পারত এখন রাত বা দিন হয়েছে।
সব সময় আংগুলের নখ দিয়ে লোনাধরা সিমেন্ট আর বালির চাপ খুলে ফেলত। যখন ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ত তখনই ঐ পচা দুর্গন্ধময় পানি পান করত। আবার কাজ শুরু করত। আবার যখন ক্লান্তিতে অবশ হয়ে আসত তার শরীরটা তখন মাথার নিচে হাত রেখে মাটিতে শুয়ে পড়ত। ঘুম ভাঙলে আবার চলত তার কাজ।
০৪.
মনিরার যখন জ্ঞান ফিরে এলো তখন সে চোখ মেলে দেখতে পেল একটা খাটের ওপর শুইয়ে রাখা হয়েছে তাকে। সমস্ত শরীর ব্যথায় টনটন করছে। মনিরা স্মরণ করতে চেষ্টা করল এখন সে কোথায়। কিছুক্ষণের মধ্যে সব কথা মনে পড়ল তার। নূরের কথা মনে হতেই উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে উঠল সে। না জানি এখন সে কোথায়! এতটুকু কচি শিশু—দুধ ছাড়া, কিছু সে খায় না। আহা, কেঁদে কেঁদে গলা বুঝি শুকিয়ে গেছে। মনিরা আকুলভাবে কাঁদতে লাগল।
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করল একটা লোক। হাতে তার একটা গ্লাস, মনিরার সামনে এসে দাঁড়াল—এই নাও, এতে দুধ আছে, খেয়ে নাও।
মনিরা মুখ ফিরিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
সারাদিন কিছু খেল না সে, সর্বক্ষণ কাঁদতে লাগল। বিকেলে হঠাৎ সেই লোকটা এসে হাজির হল তার কক্ষে। যে লোকটা বিরাট বপু মহিলার কাছ থেকে তাকে কিনে নিয়েছিল দশ হাজার টাকা দিয়ে এ সেই লোক।
মনিরা ওর দিকে তাকিয়ে ভয়ে শিউরে উঠল।
লোকটা দাঁত বের করে একটু হাসলো, কি ভংঙ্কর কুৎসিত সে হাসি! এবার মনিরার পাশে এসে পঁড়িয়ে বলল–কেমন আছ প্রিয়া!
মনিরার মাথা থেকে পা পর্যন্ত রি রি করে উঠল। লোকটার কথা তার শরীরে যেন আগুন ধরিয়ে দিল।
লোকটা এবার তার বিছানার একপাশে বসে পড়ল। শিউরে উঠল মনিরা। খাটের এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসল সে। হাত বাড়াল লোকল মনিরার দিকে যাবে কোথায়, তুমি যে এখন আমার!
