মেয়েলোকটি বলল–দেখলে তো, যেমন কম বয়স, তেমনি রূপের ডালি—কত দেবে বল?
এবার পুরুষটার কণ্ঠ–আট হাজারের বেশি পারব না। কারণ ওকে বাগে আনতে আমার আরও অনেক কাঠ কয়লা পোড়াতে হবে।
মেয়েলোকটি গলার আওয়াজ কাঠ কয়লা পোড়াতে হবে বলেই তো দশ হাজার, নইলে বিশ হাজারের কমে যেত না। বল পারবে—না অন্য খরিদ্দারকে দেখাব?
লোকটা বুঝি মাথা চুলকাচ্ছে, খস্ খস্ শব্দ হচ্ছে। তার সঙ্গে একটা ঘোৎ ঘোৎ শব্দ, এবার লোকটা বলল–কিছু কম কর বাঈজী দিদি।
কম–চাপাকণ্ঠে হুঙ্কার ছাড়ল মেয়েলোকটি, তারপর বলল–বেরিয়ে যাও, হবে না।
আরে শুনো বাঈজী দিদি, শুনো। চটো কেন? আস্তে কথা বল, জেগে উঠবে ছুড়ী। যাক, তাহলে ঐ দশ হাজার ছাড়া দেবে না?
না, না, না, বরং দু’দিন রেখে আরও বেশি টাকা পাবো। বাচ্চটাকে আগে সরিয়ে ফেলতে দাও–
মেয়েলোকটির কথায় মনিরার হৃদয় কেঁপে উঠল, বলে কি—বাচ্চাটাকে সরিয়ে ফেললে তার দাম আরও বাড়বে! মনিরা কি করবে ভেবে অস্থির হল।
লোকটা বুঝি ভাবছে, দশ হাজারে নিলে ঠকবে নাতো। এবার বুঝি মনস্থির করে ফেলেছে লোকটা, বলল–যাক, দশ হাজার টাকাই পাবে, কিন্তু ছেলেটা তোমাকে রাখতে হবে বাঈজী দিদি।
এর জন্য আবার চিন্তা, এ তো ভাল কথা, বাচ্চাটাকে আর একজনের কাছে দু’পাঁচ হাজারে চালিয়ে নেব—
লোকটা এবার বলল–তাহলে আমি রাজী।
মনিরা এবার আচমকা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসল এবং তীব্র কণ্ঠে বলল–না, কিছুতেই তোমরা আমাকে বিক্রি করতে পারবে না। আমি সব কথা পুলিশকে জানিয়ে দেব।
মেয়েলোকটি কটমট করে তাকায় দাঁতে দাঁত পিষে বলল—পুলিশকে জানাবে! পুলিশ কোথায় বাছাধন! পুলিশ কোথায়?
মনিরা নূরকে কোলে আঁকড়ে ধরে বলে উঠল–আমি এসেছি।
তোমাদের এখানে রাতের মত একটু আশ্রয় পাব বলে। আর তোমরা আমাকে বিক্রি করে টাকা নেবে—এত বড় শয়তান তোমরা?
মেয়েলোকটি রাক্ষসীর মতো হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল। দু’চোখে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। দাঁত-মুখ খিচিয়ে বলল–বাঘের গুহায় পা দিয়েছ মেয়ে, আর ফিরে যাবার উপায় নেই। মেয়েলোকটি এবার হাতে তালি দিল।
সঙ্গে সঙ্গে একটি বিকৃত আকার মেয়েলোক কক্ষে প্রবেশ করে এক পাশে দাঁড়াল।
বিশাল বপু মেয়েলোকটি এবার তাকে ইংগিত করল মনিরার কোল থেকে বাচ্চাটাকে কেড়ে নিতে।
দু’হাত প্রসারিত করে বিকৃত আকার নারীটি মনিরার কোল থেকে ঘুমন্ত নূরকে কেড়ে নিতে গেল।
মনিরা অমনি নূরকে বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলো—কিছুতেই তোমরা আমার কাছ থেকে আমার ছেলেকে কেড়ে নিতে পারবে না। যাও, যাও তোমরা–
বিকৃত আকার মেয়েলোকটি তখনও কঙ্কালের মত হাত দু’খানা প্রসারিত করে এগুচ্ছে।
মনিরা পিছিয়ে যাচ্ছে, বুকের মধ্যে তার ঘুমন্ত নূর। সেকি অদ্ভুত দৃশ্য!
মনিরা অসহায়ের মত বাচ্চাটিকে বুকে করে পিছিয়ে যাচ্ছে। আর জীবন্ত কঙ্কালের মত বিকৃত আকার মেয়েলোকটি দু’হাত মেলে তার দিকে এগিয়ে আসছে।
মনিরা জানে না পেছন দিকে দাঁড়িয়ে বিরাট বপু মহিলাটি। খপ করে মনিরাকে ধরে ফেলল সে, বাঘের থাবায় যেন মেষ শাবক। মনিরার ঘাড় ধরে দাঁড় করিয়ে দিল, তারপর অতি সহজে মনিরার কোল থেকে নূরকে। কেড়ে নিল।
আর্তনাদ করে উঠল নূর।
মনিরার হৃদয় খান খান হয়ে যেতে লাগল, সে নূরের দিকে হাত বাড়ালো।
অমনি ভরঙ্কর চেহারার লোকটা মনিরাকে ধরে ফেলল। লোহার সাঁড়াসির মত ওর হাতখানা মনিরার কোমল হাতের ওপর দাগ কেটে বসে পড়ল, মনিরা শত চেষ্টা করেও নিজের হাতখানা বলিষ্ঠ লোকটার হাতের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিতে পারলো না।
লোকটা দক্ষিণ হাতে মনিরার হাত মুঠায় চেপে ধরে বাঁ হাতে পকেট থেকে একতোড়া নোট বের করে বিরাট বপু বাঈজী দিদির হাতে গুঁজে দিল।
এবার লোকটা হাঁক দিল–ভজুয়া, ভজুয়া–
অমনি কক্ষে প্রবেশ করল একটা জোয়ান বলিষ্ঠ লোক। হাতে তার একটা কাল কাপড় আর একগাছা দড়ি।
লোকটা মনিরাকে বাঁধতে আদেশ করল।
ভজুয়া মনিরাকে বেঁধে ফেলল। সেই লোকটা এবং বাঈজী দিদিও তাকে সাহায্য করল, নইলে মনিরাকে কাবু করা একজন বা দু’জনের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল।
মনিরাকে যখন মজবুত করে বেঁধে ফেলছিল, ঠিক তখন বিকৃত আকার মহিলা নূরকে নিয়ে কক্ষ থেকে চলে গেল।
অসহায় মনিরা হাজার চেষ্টা করেও নিজেকে ঐ কঠিন বাঁধন থেকে মুক্ত করে নিতে সক্ষম হল না।
ঝিন্দ শহরে নেমে এসেছে অন্ধকার ঘনঘটা। রাত গভীর। মনিরাকে নিয়ে একটা এক্কা ঘোড়ার গাড়ি দ্রুত এগুচ্ছে শহরের শেষ প্রান্তের দিকে।
গাড়ির ঝাঁকুনিতে দড়ির বাঁধনে টন টন করে উঠছে মনিরার হাতের গিরা আর পায়ের গিট! অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। মুখে একটা কাপড় গোজা থাকায় নিঃশ্বাস ফেলতেও ভয়ানক কষ্ট হচ্ছে মনিরার। তবু নীরবে পড়ে রয়েছে, উপায় নেই নড়ার বা চিষ্কার করে কাঁদার। কিন্তু এত দুঃখ-কষ্ট ছাপিয়ে বার বার মনে পড়ছে নূরের কথা। স্বামীর চিহ্নটুকুও বুঝি এবার সে হারিয়ে ফেলল। নূরের কান্নার সুর এখনও বাজছে তার কানের কাছে। না জানি ওকে ওরা কি করবে—হত্যা করে ফেলবে না তো? তাই বা কে জানে?
পাথুরে রাস্তার উপর দিয়ে গাড়িটা বোধ হয়ে যাচ্ছিলা কারণ ভয়ানক ঝাঁকুনি অনুভব করছিল মনিরা নিজের দেহে। আর কতক্ষণ এমনি করে কাটাতে পারবে, সহ্যেরও তো একটা সীমা আছে। এবার হয়তো অজ্ঞান হয়ে পড়বে মনিরা, ক্রমেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার।
