মনিরার অপূর্ব রূপরাশি পথিকদের মনে প্রশ্ন জাগাল। সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল কে এই মেয়েটি কোথায়ই বা চলেছে। কেউ বা শিস দিল, কেউ বা বিদ্রুপ করল। মনিরা কোনদিকে না তাকিয়ে আপন মনে এগিয়ে চলেছে।
এমনি করে কতক্ষণ পথে পথে ঘুরে বেড়াবে সে? সন্ধ্যা আসন্ন প্রায়, তার পূর্বেই একটা কোন নিরাপদ স্থানে তাকে আশ্রয় নিতে হবে। তাছাড়া কচি নূর ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, বিশ্রামের প্রয়োজন এখন তার।
মনিরা সামনে একটা বাড়ি দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেল। মস্ত বড় গেট গেটের ওপাশেই গাড়ি–বারান্দা।
মনিরা গেটের নিকটে পৌঁছতেই একটা লোক বলল–কি চাও?
মনিরা বলল–রাতের মত থাকার একটু জায়গা চাই। লোকটা একটু ভেবে বলল–আচ্ছা, দাঁড়াও ভেতরে জিজ্ঞাস করে আসি।
একটু পরে ফিরে এলো লোকটা বলল–এসো।
মনিরার পা দুখানা হঠাৎ কেঁপে উঠল, অজানা একটা আশঙ্কায় বুকের ভিতরটা টিপটিপ করে উঠল। না জানি এ কার বাড়ি। বাড়ির মালিক কেমন মানুষ কে জানে। কিন্তু এত ভেবে কি হবে, রাতে পথের বুকে রাত কাটানো তার সম্ভব নয়! আশ্রয় তার চাই, কাজেই ভয় পেলে তো চলবে। না। মনিরা লোকটাকে অনুসরণ করল।
কয়েকখানা কক্ষ পেরিয়ে একটা কক্ষে এসে প্রবেশ করল লোকটা কাল কাপড়ের পর্দা উচু করে ধরে বলল–যাও!
মনিরা নূরকে কোলে করে কক্ষে প্রবেশ করল। কক্ষে প্রবেশ করেই ভয়ে বিস্ময়ে চমকে উঠল। একটা চৌকির ওপর তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে আছে এক প্রৌঢ় মেয়েলোক। বিরাট বপু। মাথায় একরাশ চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। মোটা পুরু দুখানা ঠোঁট। ঠোঁটের ফাঁকে তামাকের নল গোজা রয়েছে। চোখ দুটো যেন আগুনের ভাটা, দপ দপ করে জ্বলছে। মেয়েমানুষ নয়, যেন পুরুষের বাবা।
মনিরা ভয়বিহবল দৃষ্টিতে তাকাল মহিলাটির দিকে।
মনিরাকে দেখতে পেয়ে মেয়েলোকটা তার বিপুল বপুখানা নাড়াচাড়া দিয়ে সোজা হয়ে বসল। বাঁ হাতে নলটা একপাশে সরিয়ে বলল–তুমিই রাতের জন্য আশ্রয় চাও?
মনিরা ঢোক গিলে বলল–হ্যাঁ।
গম্ভীর ভারী গলায় বলল মহিলাটি–তোমার কোলে কি ওটা?
নূর তখন মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
মনিরা বলল–আমার ছেলে!
হিংস্র একটা হাসির আভাস ফুটে উঠল–ভীমকার মহিলার ঠোঁটের ফাঁকে।
মনিরা শিউরে উঠল। একটা অমঙ্গল আশঙ্কায় কেঁপে উঠল তার বুকটা। নিজের জন্য মনিরা এতটা ভীত নয়, কেমন যেন ভয় হল তার নূরের জন্য। মনিরা বুকে আঁকড়ে ধরল কচি নূরকে।
মহিলা মেঘের মত গর্জন করে উঠল–বেশ, ওকে নিয়ে যা, পাশের ঘরে ওর থাকার জায়গা করে দে।
মনিরার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। এখানে কেন এসেছিল সে! এমন আশ্রয়ের চেয়ে ফুটপাতের আশ্রয় তার অনেক ভাল ছিল। এমন ভয় হচ্ছে কেন তা বুঝতে পারে না মনিরা। পালাবার জন্য মন তার অস্থির হয়ে উঠল।
লোকটা এবার মনিরাকে সঙ্গে করে একটা ছোট ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। ঘরের দরজায় তালা লাগান।
মনিরার সামনে যেন আর একটা নতুন বিপদের ঘন ছায়া নেমে আসছে। কে যেন অদৃশ্য হাতে গলাটা টিপে ধরছে তার।
লোকটা ততক্ষণে দরজা খুলে ধরেছে–যাও, এ ঘরে রাত কাটাও।
মুনিরা নিরুপায়ের মত নূরকে কোলে করে কক্ষের দরজার পা রাখল। কক্ষে প্রবেশ করে দেখল খুব বড় নয় কক্ষটা। কক্ষের মেঝেতে গালিচা পাতা। একপাশে কয়েকটা বালিশ বিক্ষিপ্ত ছড়ান রয়েছে। মনিরার দৃষ্টি হঠাৎ চলে গেল এক পাশে—একি! চমকে উঠল সে। গালিচার এক ধারে একটা রেকাবির উপর কয়েকটা কাঁচের গ্লাস আর খালি কয়েকটা বোতল পড়ে রয়েছে। মনিরা মুহূর্তে বুঝে নিল ওগুলো কিসের বোতল।
শিউরে উঠল মনিরা, সর্বনাশ, আবার সে কোন্ কু-ব্যক্তির কবলে পড়ল। তার জীবনটাই কি শুধু এমনি বিপদ আর বিপদে ভরা!
কি করবে মনিরা, এ কক্ষে আশ্রয় গ্রহণ করবেনা এখান থেকে পালাবার চেষ্টা করবে? নিশ্চয়ই তার জন্য এ কক্ষ নিরাপদ স্থান নয়, বুঝতে পারল সে।
হঠাৎ নূর কেঁদে উঠল।
মনিরা নূরকে বুকে আঁকড়ে ধরে দরজার দিকে ফিরে দাঁড়াল। কিন্তু একি! দরজা কখন বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়ে লোকটা চলে গেছে। মুনিরা ধাক্কা দিতে লাগলো আর বারবার ডাকতে লাগল—এ দরজা খোল, দরজা খোল, আমার ছেলে কাঁদছে। এই, দরজা খোল।
কিন্তু কোন সাড়াশব্দই এল না বা দরজা খোলার কোন লক্ষণই দেখা গেল না। মনিরা খাঁচায় বন্দী হরিণীর মত ছটফট করতে লাগল। নূর কিছুতেই কান্না বন্ধ করছে না।
অগত্যা মনিরা নূরকে নিয়ে মেঝেতে গালিচার ওপর বসে পড়ল। গোটা দিনটা কেটে গেল নূর কিছু খায়নি, এক্ষণে মায়ের দুধ সে প্রাণভরে পান করতে লাগল।
হাজার চেষ্টা করেও সে বদ্ধ কোঠা থেকে নিজকে বাইরে আনতে সক্ষম হল না মনিরা। নিজের এ ভুলের জন্য অনুতাপ করতে লাগল।
সারা দিনের ক্লান্তি আর অবসাদে মনিরার দেহ অবসন্ন হয়ে এসেছিল! কখন যে নূরকে বুকে নিয়ে গালিচার ওপর ঘুমিয়ে পড়েছে স্মরণ নেই। হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল সে। কক্ষে ইলেকট্রিক আলো জ্বলছিল। সে চোখ মেলে তাকাল কেউ যেন দেখতে বা জানাতে না পারে সেভাবে তাকিয়ে দেখল।
চোখ মেলে চাইতেই আড়ষ্ট হয়ে গেল মনিরার সমস্ত দেহ। সেই বিরাট বপু মেয়েলোকটি–তার সঙ্গে একটি তেমনি বিরাট শরীর বিশিষ্ট লোক। দু’জনের মধ্যে নীচুস্বরে কথাবার্তা হচ্ছিল। আলোচনা যে তাকে নিয়েই হচ্ছে বুঝতে বাকী রইল না মনিরার। কেঁপে ওঠে তার অন্তরটাহায়, একি বিপদ দিলে খোদা! মনিরা নূরকে বুকের মধ্যে টেনে নিল।
