কিন্তু ওরা যে বলেছিল–
ওরা জানতো না।
বড় শয়তান ওরা। দেখ হুর আমাকে ওরা—
নূরী ওদের আমি ভীষণ শাস্তি দেব। চল ঘরে চল নূরী–বনহুর নূরীর হাত ধরে নিয়ে চলল।
নূরী ব্যথাকরুণ সুরে বলল–আবার তো চলে যাবে না?
নূরী, আর তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।
বনহুরের হাত ধরে নূরী আস্তানায় প্রবেশ করল।
০২.
হতবাক স্তম্ভিত মনিরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে ভূলুণ্ঠিত শয়তান মুরাদের রক্তমাখা দেহখানা। কোলে শিশুপুত্র নূর। তখনও মনিরার দৃষ্টি ওদিকের মুক্ত জানালার দিকে, যে পথে একটু পূর্বে তার চির আকাঙ্ক্ষিত প্রাণাধিক স্বামী দস্যু বনহুর অন্তর্ধান হয়েছে।
মুরাদের আর্তচিঙ্কারে কক্ষটি তখন লোকজনে ভরে উঠেছে। সকলের চোখে মুখেই আতঙ্কের ছাপ। কেউ কেউ চিৎকার করে বলছে খুন, খুন, খুন–
অল্পক্ষণেই পুলিশ এসে হাজির হল সেখানে।
হোটেলের সবাই জানত মনিরা মুরাদের স্ত্রী। ঐ রকমই পরিচয় দিয়েছিল মুরাদ হোটেলের মালিকের কাছে এবং আসল নাম পালটে নিজের নাম শাহ হোসেন এবং মনিরার নাম মর্জিনা হোসেন রেখেছিল।
এক্ষণে শাহ হোসেনের মৃত্যুতে হোটেলের মালিক ভয়ে মুষড়ে পড়ল। তার হোটেলে খুন!–এটা হোটেলের বিরাট একটা বদনাম।
হোটেলের মালিক কম্পিত কণ্ঠে বলল–মিসেস হোসেন, কে আপনার স্বামীকে হত্যা করেছে বলতে পারেন? কে এসেছিল এখানে?
কিন্তু কি আশ্চর্য, শাহ হোসেনের স্ত্রীর চোখে এতটুকু পানি নেই। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে ব্যাপার কি, হোটেলের সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।
পুলিশ পুনঃ পুনঃ প্রশ্ন করে চলল–আপনার স্বামী কিভাবে নিহত হলেন আমরা জানতে চাই। কে তাঁকে হত্যা করল আপনি নিশ্চয়ই তা জানেন? আপনি যদি আপনার স্বামীর হত্যাকারীকে পাকড়াও করে শাস্তি দিতে চান তবে আমাদের নিকটে কোন কথাই গোপন করবেন না।
এত কথার পরও মনিরা নীরব! একটা কথাও তার মুখ দিয়ে বের হচ্ছে। কিন্তু এভাবে নিশ্চুপ থাকাও তার পক্ষে সম্ভব নয়, পুলিশ তাকে অন্যভাবে সন্দেহ করতে পারে। তাই বলল মনিরা–কে ওকে হত্যা করেছে আমি জানি না।
পুলিশ ইন্সপেক্টার রাগত কণ্ঠে বলেন–আপনার সামনে আপনার স্বামীকে হত্যা করা হল অথচ আপনি জানেন না? এ কথা আমরা বিশ্বাস করি না।
মনিরা আবার বলল–ওকে যে হত্যা করেছে তাকে আমি দেখেছি কিন্তু চিনি না।
সেদিন এর বেশি কিছু প্রশ্ন না করে লাশ মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে পুলিশ ইন্সপেক্টার বিদায় গ্রহণ করলেন।
হোটেলের মালিক নিজে মনিরার দায়িত্বভার গ্রহণ করল।
পরদিন পুনরায় পুলিশ এলো, মনিরাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চললেন–আচ্ছা লোকটাকে আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন মিসেস হোসেন?
মনিরা বললো–দেখেছি।
ওর চেহারা কেমন ছিল?
মুখে চাপদাড়ি, মাথায় পাগড়ী, গালপাট্টা বাধা, চোখে হিংস্র চাউনি—
এর পূর্বে আপনি কোনদিন তাকে দেখেছিলেন?
না।
আরও কিছুক্ষণ পুলিশ ইন্সপেক্টার মনিরাকে জেরা করার পর বিদায় গ্রহণ করলেন।
মনিরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। মস্ত একটা বিপদ থেকে যেন সে উদ্ধার পেল। মনিরা অত্যন্ত সাবধানে পুলিশ ইন্সপেক্টারের প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাচ্ছিল, কাজেই তার কথাবার্তা বা আচরণে তাকে কোন রকম সন্দেহ করতে পারেননি পুলিশ ইন্সপেক্টার।
মুরাদের হাত থেকে রক্ষা পেল মনিরা। রক্ষা পেল পুলিশের হাত থেকে। সবচেয়ে বড় শান্তি তার স্বামী বেঁচে আছে। অনাবিল একটা আনন্দস্রোত মনিরার মনকে আল্লুত করে দিয়েছে। যদিও তার স্বামীর মনে মুরাদের কথাগুলো অবিশ্বাসের আগুন ধরিয়ে দিয়েছে তবু এতটুকু দমে যায়নি সে। একদিন না একদিন, এ ভুল তার স্বামীর ভেঙ্গে যাবে, একদিন ফিরে আসবে সে তার পাশে। আবার বলিষ্ঠ বাহু দুটি দিয়ে আলিঙ্গন করবে–ঐ দিনটির প্রতীক্ষায় প্রহর গুণবে মনিরা। অনন্তকাল ধরে প্রতীক্ষা করবে সে।
কয়েক দিন পর পুলিশের অনুমতি নিয়ে মনিরা হোটেল থেকে বিদায় গ্রহণ করল। কিন্তু এখন সে যাবে কোথায়? ঝিন্দ শহর তার কাছে নতুন। যদিও এ শহরে তার বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়েছে, তবু দিনগুলো মণিরার স্বাভাবিকভাবে কাটেনি। কিছুদিন কেটেছে বনহুরের কেনা বাড়িতে, কিছুদিন মুরাদের বন্দীশালায় কিছুদিন কেটেছে বিভিন্ন স্থানে। মনিরা শহরের কোন জায়গা বা লোকজন কাউকেই চেনে না বা পরিচয় নেই।
এক রাতে নুরকে বুকে নিয়ে গাড়িতে চেপে বসল মনিরা। ড্রাইভার জিজ্ঞাসা করল–কাঁহা জায়েঙ্গী মাইজী?
মনিরা চট করে কিছু বলতে পারলো না, একটু চিন্তা করে নিল। যা হোক এখন তার স্বামীর দেয়া সেই বাড়িখানাতেই ফিরে যাওয়া উচিত। সেখানে তাদের অনেক অনুচর আছে, দাসদাসী আছে, নিশ্চয়ই কোন অসুবিধা হবে না তার। মনিরা তাদের বাড়ির ঠিকানা বলল।
কিন্তু বাড়িতে পৌঁছে অবাক হল মনিরা অপরিচিত এক পরিবার বাড়িটাতে বাস করছে।
মনিরা এবার কোথায় যাবে, কি করবে ভেবে পায় না। বাড়ির মালিক জানিয়ে দিলেন বাড়িখানা তারা কিনে নিয়েছেন, যারা তাঁর নিকট বাড়ি বিক্রি করেছে তারা চলে গেছে এদেশ ছেড়ে।
মনিরার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। চোখে অন্ধকার দেখছে, এখন সে কোথায় যাবে। ঝিন্দ শহরে তার আপন জন কেউ নেই, কাউকেই সে চেনে না, জানে না।
মনিরা নূরকে বুকে চেপে ধরে পথের বুকে নেমে দাঁড়ালো। দিশেহারা পথিকের মত পথ বেয়ে এগিয়ে চলল সম্মুখ দিকে।
