বেশ যাচ্ছি। কুর্ণিশ জানিয়ে বেরিয়ে গেল রহমান।
প্রহর কয়েক পর ফিরে এলো রহমান, মুখমণ্ডল বিষণ্ণ, মলিন। শরীরে কয়েক স্থানে রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে।
বনহুর বলল–একি! নূরী এলো না।
না, সর্দার। এই দেখুন–আমি ওকে জোর করে নিয়ে আসার চেষ্টা করলে ও আমাকে ঢিল মেরে আর কামড়ে এই অবস্থা করে দিয়েছে।
বনহুর কিছুক্ষণ স্থিরচোখে রহমানের দিকে তাকিয়ে বলল–আচ্ছা যাও, আমি নিজে ওকে ফিরিয়ে আনছি। বনহুর কথা শেষ করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
ঘন বনের ছায়ায় ছায়ায় এগিয়ে চলল বনহুর। মনে তার নানা চিন্তা। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া যেন তার জীবনটাকে একেবারে ওলট পালট করে দিয়ে গেছে। কি যেন ছিল, কি যেন নেই, কি যেন হারিয়ে গেছে।
অভিশপ্ত জীবন বনহুরের, তাই তার জীবনে এত দুর্যোগের ঘনঘটা।
কিছুদূর এগুতেই দেখতে পেল অদূরে একটা গাছের তলে বসে কি যেন ভাবছে নূরী। হাতে তার এলোমেলো গাঁথা একটি ফুলের মালা। আর সম্মুখে পড়ে রয়েছে কয়েকটা পাথরের ঢিল।
বনহুর বুঝতে পারল, আবার যদি নূরীকে কেউ বিরক্ত করে তাই সে আগে থেকেই প্রস্তুত রয়েছে।
বনহুর কোন রকম শব্দ না করে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
নূরী ধ্যানগ্রস্তের মত বসেছিল, সম্ভবতঃ ফুলের মালাটাই বসে বসে গাথছিল সে, অর্ধেকটা গাঁথার পর কি বুঝি ভেবে কিছু ফুল ছিড়ে ছড়িয়ে ফেলেছে আশে পাশে।
বনহুর একটা বড় ধরনের ফুল হাতে তুলে নিয়ে বাড়িয়ে ধরল নূরীর সম্মুখে নাও।
নূরী চোখ তুলে তাকালো, কিছুক্ষণ স্থির নয়নে চেয়ে থেকে হঠাৎ একটা ঢিল তুলে ছুড়ে মারলো বনহুরের মাথা লক্ষ্য করে।
বনহুর একটুও সরলো না বা নড়লো না। ঢিলটা বনহুরের মাথায় লেগে কিছুটা কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
বনহুর স্থিরভাবে তবু দাঁড়িয়ে আছে। ফুলটা তখনও বনহুরের হাতের ফাঁকে।
নূরী আর একটা ঢিল তুলে পুনরায় যেমনি বনহুরের মাথা লক্ষ্য করে ছুড়তে যাবে অমনি বনহুর প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দিল নূরীর গালে। সঙ্গে সঙ্গে ওর হাত থেকে ঢিলটা কেড়ে নিয়ে ছুড়ে দিল দূরে।
নূরীকে এভাবে আঘাত করে বনহুর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না, ওকে টেনে নিল কাছে। মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে ডাকল–নূরী–নূরী–বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো বনহুরের কণ্ঠ।
বনহুরের প্রচণ্ড চড়ে নূরী হতভম্বের মত চেয়ে রইলো ওর দিকে। উঃ বা আঃ কিছুই বলল না কিংবা কান্নায় ভেঙে পড়ল না।
বনহুর ওকে কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
নূরী এতক্ষণও হাতের মালাটা মুঠোয় আঁকড়ে ধরেছিল। বনহুর ওর সম্মুখে বসে গলাটা বাড়িয়ে দিল দাও।
নুরী স্থির নয়নে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে, মালাটা দেবে কিনা ভাবছে–কিংবা ভাবছে যে তাকে এমনভাবে আঘাত করতে পারে তাকে আবার মালা দেবে। হঠাৎ নূরী মালাটা পরিয়ে দিল বনহুরের গলায়।
বনহুর ওকে নিবিড় করে টেনে নিল কাছে, ডাকল—নূরী!
নূরী কিন্তু অবাক হয়ে বারবার তাকাচ্ছে বনহুরের মুখের দিকে। হয়তো স্মরণ করতে চেষ্টা করছে কখনও কোথাও একে দেখেছে কিনা। বনহুরের। ললাটে গড়িয়ে পড়া রক্তের দিকে তাকিয়ে নূরী হঠাৎ নিজের চোখ দুটো হাত দিয়ে ঢেকে ফেলল, তারপর আংগুলের ফাঁক দিয়ে বনহুরের কপালের রক্ত লক্ষ্য করে শব্দ করল-ইস।
বনহুর বুঝতে পারলো নূরীর একটু একটু জ্ঞান হচ্ছে। আশায় আনন্দে বনহুরের নিরাশ হৃদয় ভরে উঠলো। নূরীর মঙ্গল চিন্তাই এখন তার একমাত্র কামনা। যা ছিল সব হারিয়ে ফেলেছে সে। সিন্ধী নদীতে তার জীবন সঙ্গিনী মনিরাকে বিসর্জন দিয়েছে। বনহুর এখন সর্বদা মনিরার স্মৃতি এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে। যতক্ষণ মনিরাকে ভুলে থাকে ততক্ষণ তার মনে কিছুটা শান্তি থাকে। ওর কথা স্মরণ হতেই বিষিয়ে ওঠে অন্তরটাঅসহ্য ব্যথার কাঁটা খোচা দিয়ে চলে তখন ওর হৃদয়ে। তার মনিরা ব্যাভিচারিণী–অসতী–যখনই এই চিন্তা বনহুরকে অস্থির বিচলিত করে তোলে তখনই সে নিজের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চায়। ভুলে থাকতে চায় পুরোন স্মৃতি।
একদিন অবিরত ভেবেছে বনহুর, শুধু একমাত্র মনিরার কথাই সে ভেবেছে সর্বক্ষণ। ভেবে ভেবে কোন কূল-কিনারা পায়নি—একটা অসহ্য যন্ত্রণা তার সমস্ত অন্তরকে দগ্ধীভূত করে দিয়েছে, তাই বনহুর আজ অন্য চিন্তায় মগ্ন থাকতে চায়–নিজকে ভুলিয়ে রাখতে চায়, এমন সময় নূরীর পুনঃ আবির্ভাব বনহুরের জীবনে আনে অভাবনীয় একটা পরিবর্তন। দস্যু বনহুর একটা নতুন আলোর সন্ধান লাভ করে তার জীবনে। সত্যি নূরী তাকে কত–ভালবাসে বনহুর নূরীর মুখখানা তুলে ধরে বলে—নূরী, আমি মরিনি; আমি মরিনি। চেয়ে দেখ আমি তোমার হুর।
নূরী এবার গভীর মনোযোগ সহকারে তাকাল কতক্ষণ কোন কথাই তার মুখ দিয়ে বের হল না। হঠাৎ এবার বলে উঠল–তুমি বেঁচে আছ?
হ্যাঁ হ্যাঁ নূরী আমি–আমি তোমার—বলবল তুমি কে? বল–বল–
নূরী হাঁপাতে শুরু করলো—কিছু বলতে চাইল কিন্তু বলতে পারছে না।
বনহুর আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল, বলল—দেখ, ভাল করে চেয়ে দেখো, বল–বল–একবার নাম ধরে ডাকো নূরী।
এবার নূরী অস্ফুট শব্দ করে উঠল—হু! নূরী! আবেগভরে বনহুর টেনে নিল নূরীকে!
এতক্ষণ নূরী চিনতে পেরেছে বনহুরকে। নূরী বনহুরের বুকে মাথা রেখে বলল তুমি বেঁচে আছ! তুমি মরে যাওনি?
না, না নূরী আমি মরে যাইনি।
