মুহূর্তে মনিরার মুখমণ্ডল কাল হয়ে ওঠে।
বনহুর আগুনঝরা দৃষ্টি নিয়ে তাকায় মনিরার মুখের দিকে–অবিশ্বাসের তীব্র চাহনি তার চোখে।
মনিরা ছুটে আসে–তুমি বিশ্বাস কর, ওর কথা সত্য নয়। তুমি বিশ্বাস কর—
বনহুর ছুটে যায় দরজার দিকে।
মনিরা দৌড়ে এসে, এক হাতে নূরকে বুকে চেপে আরেক হাতে স্বামীর পা দুখানা আঁকড়ে ধরে–ওগো তুমি শোনো। শোনো–
বনহুর পদাঘাতে মনিরাকে ফেলে দিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায়।
সঙ্গে সঙ্গে নূর কেঁদে ওঠে।
মনিরা ওকে বুকে চেপে ধরে উঠে দাঁড়ায়।
কক্ষে তখন অসংখ্য লোক ভরে গেছে।
১.০৯ সর্বহারা মনিরা
০১.
সর্দার, একি হল আপনার? সারা দিনরাত ধ্যানগ্রস্তের মত এমনি করে বসে বসেই কাটাবেন? এখন রাত দ্বিপ্রহর। চলুন, শোবেন চলুন। রহমান বিনীত কণ্ঠে দস্যু বনহুরকে লক্ষ্য করে কথাগুলো বলল।
বনহুর একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলল রহমান, এই গভীর রাতে গহন বনে করুণ সুরে কে কাঁদে?
সর্দার, আপনি ফিরে আসার পর কারও সঙ্গে কোন কথা বলেননি, কারও কথা জিজ্ঞাসাও করেননি। আপনার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর নূরী পাগল হয়ে গেছে।
বনহুর বিস্ময়ভরা কণ্ঠে অস্ফুট শব্দ করে উঠল–নূরী পাগল হয়ে গেছে! কই, একথা তো তুমি আমাকে বলনি!
আপনি তো কিছুই জানতে চাননি?
নূরী আমার মৃত্যু সংবাদে পাগল হয়ে গেছে! আর তাকে তোমরা এভাবে ছেড়ে দিয়ে রেখেছ।
সর্দার, তাকে আমরা অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই ফিরিয়ে আনতে পারিনি। রাতের পর রাত, দিনের পর দিন সে এমনি করে বনে বনে কেঁদে কেঁদে ঘুরে বেড়ায়। সর্দার আশ্চর্য কোন হিংস্র জন্তু তাকে আজও খায়নি। কত বর্ষার পানি, কত রৌদ্রদগ্ধ দ্বিপ্রহর কেটে গেছে তার মাথার ওপর দিয়ে, তবু সে ফিরে আসেনি!
বলো কি রহমান!
হ্যাঁ সর্দার।
উঠে দাঁড়াল বনহুর–চলল, ওকে ফিরিয়ে আনি রহমান।
চলুন সর্দার।
বনহুর আর রহমান আস্তানা ছেড়ে বনে প্রবেশ করল রহমানের হাতে জ্বলন্ত মশালের উজ্জ্বল আলোতে চারদিকে লক্ষ্য রেখে এগুতে লাগল ওরা দুজন।
কিছু পূর্বে দস্যু বনহুরের কানে করুন একটা কান্নার সুর ভেসে এসেছিল। কোনদিক থেকে শব্দটা এসেছিল ঠিক বুঝতে পারেনি বনহুর, তাই এদিক সেদিক খুঁজতে লাগল রহমান আর সে।
গোটা বনে খোঁজাখুঁজি করে কোথাও নূরীর সন্ধান না পেয়ে বিমর্ষ মনে এগুলো বনহুর ও রহমান। হঠাৎ মশালের আলোতে ঝর্ণার দিকে দৃষ্টি চলে যায় ওদের।
থমকে দাঁড়িয়ে বলে উঠল রহমান সরদার, ঐ যে নূরী!
বনহুর কোন কথা না বলে স্থিরচোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত এ দৃশ্য! ঝর্ণার দিকে মুখ করে নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত বসে আছে নূরী।
বনহুর পা বাড়াল নূরীর দিকে।
রহমান মশাল হাতে সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো।
বনহুর ততক্ষণে নূরীর পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটা পাথরখণ্ডে বসেছিল নূরী, বনহুর ওর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রাখল।
ধীরে ধীরে ফিরে তাকাল নূরী।
রহমানের হাতের মশালের আলোতে বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল বনহুর নূরীর একি চেহারা হয়েছে! রুক্ষ্ম এলায়িত চুল, কোটরাগত চোখ, শুষ্ক গণ্ডদ্বয়। বনহুর আর নূরী কিছুক্ষণ উভয়ে তাকিয়ে রইল উভয়ের দিকে। বনহুরের চোখে মুখে রাজ্যের ব্যাকুলতা আর নূরীর দৃষ্টি উদাস, ভাষাহীন।। নূরীর এই চেহারা বনহুরের মনে দারুণ আঘাত করল, কিছুক্ষণ কোন কথা তার মুখ দিয়ে বের হল না। চোখ দুটো শুধু অশ্রু ছলছল হয়ে উঠলো। এবার বনহুর অস্ফুট কণ্ঠে ডাকল-নূরী!
নূরী নিশ্চল স্তব্ধ নয়নে তাকিয়ে ছিল, সে বনহুরকে চিনতেই পারেনি। রহমানের মশালের আলোতে তাকিয়ে দেখছিল; বনহুরের ডাকে চমক ভাঙে, ঠোঁট দু’খানা কেঁপে ওঠে একটু বলতে পারে না কিছু।
বনহুর পুনরায় বলে উঠল-নূরী আমায় তুমি চিনতে পারছনা?
এতক্ষণে নূরী কথা বলে–কে তুমি?
নূরীর কণ্ঠ স্বরে খুশি হয় বনহুর, বলে–আমি তোমার হুর!
তীব্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল নূরী–না, না, না, সে বেঁচে নেই, সে বেঁচে নেই। বেঁচে নেই–দু’হাতের মধ্যে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল নূরী।
রহমান বলল–সর্দার, চলে আসুন। আজ হঠাৎ ও আপনাকে চিনতে পারবে না। আসুন সর্দার।
বনহুর কিছুক্ষণ নূরীর দিকে তাকিয়ে থেকে ফিরে দাঁড়াল–চলো রহমান।
আস্তানায় ফিরে এসে বনহুর অন্তরে অসহ্য ব্যথা অনুভব করতে লাগল কিছুতেই সে স্বস্তি পেল না।
গোটা রাত পায়চারী করেই কাটিয়ে দিল বনহুর।
ভোরের আলোতে পৃথিবী ঝলমল করে উঠল। গাছে গাছে পাখির কলরবে মুখর হল। সোনালী সূর্যের আলো এসে পৌঁছল বনহুরের আস্তানার গোপন কক্ষের চোরা শার্সি দিয়ে।
বনহুর কলিংবেলে হাত রাখতেই দু’জন অনুচর কক্ষে প্রবেশ করে কুর্ণিশ জানাল।
বনহুর বলল–রহমানকে ডাক।
বেরিয়ে গেল অনুচরদ্বয়। একটু পরে কক্ষে প্রবেশ করল রহমান, কুর্ণিশ জানিয়ে নতমস্তকে দাঁড়াল—সর্দার!
বনহুর রহমানের সম্মুখে এসে দাঁড়াল।
রহমান বনহুরের চোখের দিকে দৃষ্টি তুলে ধরতেই চমকে উঠল, আশ্চর্য হয়ে বলল—সর্দার, সারারাত আপনি ঘুমান নি? চোখ দুটো যে আপনার জবাফুলের মত লাল হয়ে গেছে!
বনহুর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে কি যেন চিন্তা করল, তারপর বলল–রহমান, নূরীকে আস্তানায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কর।
রহমান বলে উঠল—সর্দার, অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি।
যাও আবার চেষ্টা কর।
