হোটেলে দুদিন কাটানোর পরই টের পেল বনহুর, এই হোটেলের কোন এক গোপন কক্ষে বাস করে তারা। সঙ্গে তাদের একটা চাকরও রয়েছে। বনহুর সেই চাকরের সঙ্গে ভাব করে নিল। সেদিন চাকরটা খাবার নিয়ে যাচ্ছিল, তাকে কিছু টাকা বকশিস দেবার লোভ দেখিয়ে বনহুর বলল খাবারের ট্রে আমার হাতে দাও। আমি যাই, তুমি আমার কাজটা করে নিও। তোমাকে দশ টাকা বকশিস দেব।
দশ টাকা কম কথা নয়, শিখ চাকরটা বনহুরের হাতে খাবারের ট্রে দিয়ে হোটেলের কাজে চলে গেল।
বনহুর নিজেকে একেবারে তাদের শিখ চাকরটার মত করে সাজিয়ে নিল। দেখলে যেন তাকে চিনতে না পারে, বা কোন রকম সন্দেহ না করে। ছদ্মবেশের নিপুণ অভিজ্ঞতা ছিল বনহুরের কাজেই কোন অসুবিধা হল না।
এবার খাবারের প্লেটসহ ট্রে হস্তে সেই গোপন কক্ষে প্রবেশ করল। শিখ চাকরের বেশে বনহুর। কক্ষে প্রবেশ করেই থমকে দাঁড়ালো মনিরার মুখে দৃষ্টি পড়তেই কঠিন হয়ে উঠল তার মুখমণ্ডল। দাঁত অধর চেপে ধরে ট্রে হাতে এগুলো।
মনিরার পাশের লোকটার মুখে নজর পড়তেই হিংস্র বাঘের চোখের মত জ্বলে উঠল ওর চোখ দুটো– এ সেই শয়তান!
লোকটি বলল– এসো, অমন হা করে কি দেখছ। আজ কি খাবার এনেছ দেখি?
শিখ চাকরবেশী বনহুর, মনিরা ও লোকটার সম্মুখস্থ টেবিলে খাবারের ট্রে রাখল। সে দেখতে পেল অদূরে একটি শয্যায় শায়িত সুন্দর ফুটফুটে একটি শিশু অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ওর মনের ভেতরে একটা গুমোট আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো অতি কষ্টে নিজেকে সংযত করে নিয়ে ট্রে থেকে খাবারের প্লেটগুলো মনিরা আর লোকটার সম্মুখে সাজিয়ে রাখতে লাগল।
লোকটা এবং মনিরা কেউ তেমনভাবে লক্ষ্য করলে বনহুরের আসল রূপ ধরা পড়ে যেত। কারণ বনহুরের মুখোভাব স্বাভাবিক ছিল না।
একটু পূর্বেই মনিরা আর শয়তান লোকটার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। মনিরা নিজে পরিত্রাণ আশায় এবং তার নূরের রক্ষার্থে নানারকম কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। জানে মনিরা, শয়তানের কবল থেকে তার রক্ষা নেই। যতই ওর সঙ্গে অসৎ ব্যবহার করতে যাবে ততই অমঙ্গলের আশঙ্কা বেশি। এমনকি তার নূরের জীবন পর্যন্ত যেতে পারে। সে কারণেই মনিরা শয়তানের সঙ্গে মিষ্টি ব্যবহার দেখিয়ে নিজেকে রক্ষা করে চলেছে, মনিরা কথা দিয়েছে নূর একটু বড় হলেই দেশে তার মামীর কাছে পাঠিয়ে দেবে এবং নিজে তাকে বিয়ে করবে। এর পূর্বে সে যেন তার উপর কোনরূপ অত্যাচার না করে, এই তার অনুরোধ।
শয়তান মনিরার কথামতই এতদিন প্রতীক্ষা করে এসেছে। এখন সে কিছুতেই মনিরার কথা মানতে রাজি নয়। এ হোটেলেই তাদের বিয়ে হবে, এ জন্য এখানে তাদের আসা।
কিন্তু মনিরা আরও ক’দিন সময় চেয়ে নিয়েছে।
নূর এখনও কচি, আর একটু বড় হোক।
এ নিয়েই শয়তান মনিরার কক্ষে রোজ একবার করে হানা দেয়। এখানে বসেই রাতে খাবার। খায় সে।
মনিরা কি করবে, সেও খায়। কিন্তু দিন দিন সে ধৈর্যচ্যুত হয়ে পড়ছে ভাবছে আর বুঝি নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না সে। সর্বদা খোদাকে স্মরণ করে সে। নানাভাবে নিজেকে শয়তানের হাত থেকে এতদিন বাঁচিয়ে চলেছে, এবার সব হারাবে।
আজ সে বলছে–তার কথায় যদি মনিরা রাজি না হয়, তবে নূরকে সে হত্যা করবে। তার চোখের সম্মুখে হত্যা করবে নূরকে।
মনিরা কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। আকুল মনে খোদাকে ডাকছে– হে খোদা! আমি যদি সতী নারী হই তবে তুমি আমার ইজ্জত রক্ষা কর। আমার নূরকে রক্ষা কর।
মনিরার মনে একটা অভূতপূর্ব সাহস এসেছে, নিশ্চয়ই সে শয়তানের হাত থেকে রক্ষা পাবে। একটা ছুরি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। লুকিয়ে রেখেছে কাপড়ের মধ্যে হয় নিজের। জীবন দেবে, না হয় শয়তানের জীবন শেষ করবে সে আজ।
তাই মনিরা হাসিমুখে শয়তানের সঙ্গে খাবার টেবিলে এসে বসেছে।
মনিরার সম্মুখে খাবার এগিয়ে দিচ্ছিল শিখ চাকরবেশী বনহুর। হঠাৎ মনিরার দৃষ্টি তার আংগুলে গিয়ে পড়লো।
ভীষণ চমকে উঠলো মনিরা। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি চলে গেল শিখ চাকরের মুখের দিকে। এ যে সেই চোখ, যে চোখের চাহনি আজও তার সমস্ত মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মনিরা নিজেকে কিছুতেই সংযত রাখতে পারল না, অস্ফুট আনন্দধ্বনি করে উঠলো–তুমি বেঁচে আছ!
শয়তান কেবলমাত্র মুখে খাবার দিতে যাচ্ছিল হাতখানা মাঝপথে থেমে যায়, ফিরে তাকাতেই বনহুর গর্জন করে আক্রমণ করে ওকে–শয়তান মুরাদ তুমি!
মুরাদ আরষ্ট শব্দ করে উঠলো–দস্যু বনহুর!
বনহুর প্রচণ্ড ঘুসি বসিয়ে দেয় ওর নাকে। ছিটকে পড়ে যায় মুরাদ।
মনিরা ছুটে গিয়ে নূরকে বুকে তুলে নিল।
বনহুর দাঁতে দাঁত পিষে বলল–শয়তান, আজ কোথায় পালাবে?
মুরাদ নিরস্ত্র, মুখমণ্ডল ভয়ে বিবর্ণ হয়ে এসেছে, চোখে সে সর্ষে ফুল দেখছে। বনহুর সূতীক্ষ্ণধার ছোরা বের করে ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায় এগুলো।
মুরাদও কম ধূর্ত নয়, একটা চেয়ার তুলে নিয়ে মারলো বনহুরকে লক্ষ্য করে।
বনহুর বাঁ হাতে চেয়ারখানা ধরে ছুঁড়ে ফেলে দিল দূরে, তারপর কঠিন কণ্ঠে বলল–আজ তোমার পরিত্রাণ নেই। সিন্ধরাণীকে হত্যার প্রায়শ্চিত্ত কর– কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে বনহুরের হাতের ছোরা অমূল বিদ্ধ হলো মুরাদের বুকে।
একটা তীব্র আর্তনাদ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো মুরাদ।
বিষধর সর্প যেমন মরার পূর্বে একবার তার সতেজ ফণাটা বিস্তার করে খাড়া হবার চেষ্টা করে তেমনি মুরাদ মুখ থুবড়ে পড়েও আবার একটু উঠে বসতে যায়। বনহুরকে লক্ষ্য করে বলে– শুধু সিন্ধীরাণীকেই হত্যা করিনি। তোমার প্রিয়তমা-মনিরারও সর্বনাশ করেছি –ঐ যে–ওর কোলেযে সন্তান দেখছ–সে আমার সন্তা-ন-কথা শেষ হয় না, পুনরায় মুখ থুবড়ে পড়ে। যায়।
