এমন সময় একটা গাড়ি এসে থামলো হোটেলের সম্মুখস্থ রাস্তায়। বনহুর একটু সরে দাঁড়াল।
গাড়ি থেকে নেমে এলো একটা যুবক, ক্যাপ দিয়ে লোকটার মুখের অর্ধেক ঢাকা। যুবকের পেছনে নেমে এলো একটি যুবতী, কোলে তার একটি শিশুসন্তান।
বনহুর চমকে উঠলো, এ যে মনিরা!-না, না, তার চোখে ভ্রম হতে পারে! মনিরার কোলে সন্তান এলো কোথা হতে? ঐ যুবকটাই বা কে? পরক্ষণেই বনহুরের চোখ দুটো ধক ধক করে জ্বলে উঠলো। এ যে তারই মনিরা–ততক্ষণে যুবকটির সঙ্গে মনিরা হোটেলে প্রবেশ করেছে।
তবে কি বহু দিনের ব্যবধানে তার দৃষ্টির বিভ্রান্তি ঘটেছে? না, না, এ মনিরা নয়, অন্য কোন যুবতী হবে। তার মনিরার কোলে সন্তান আসবে কোথা থেকে।
বনহুর কালবিলম্ব না করে সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য একটা গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। দেখতে পায় ড্রাইভার তার মালিকের ফিরে আসার প্রতিক্ষায় গাড়িতে বসে ঝিমুচ্ছে। বনহুর আচম্বিতে এক ঘুষি বসিয়ে দেয় তার নাকে, তারপর সে চিৎকার করার পূর্বেই তাকে গাড়ি থেকে টেনে পথে ফেলে দিয়ে ড্রাইভ আসনে চেপে বসে। এবার তাকে কে পায়।
ড্রাইভারের আর্তনাদে সঙ্গে সঙ্গে স্থানটি সরগরম হয়ে উঠল। কিন্তু যখন সেখানে লোকজন। জমা হল তখন গাড়ি নিয়ে বনহুর উধাও হয়েছে।
বনহুর যখন তার বড় সখের বাড়িখানায় গিয়ে হাজির হলো তখন রাত অনেক হয়ে এসেছে। গাড়ি রেখে দ্রুত এগিয়ে গেল সদর গেটের দিকে। অমনি একজন বন্দুকধারী পাহারাদার গর্জে উঠল– তুম কোন্ হ্যায়? বনহুর প্রচণ্ড এক ঘুষিতে ওকে ধরাশায়ী করে বন্দুকটা ছুঁড়ে ফেলে দিল দূরে তারপর প্রবেশ করলো অন্তঃপুরে। জোরে জোরে ডাকলো—মনিরা–মনিরা– মনিরা।
বনহুরের বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বরে চমকে উঠলো বনহুরের অনুচরগণ। এ স্বর যে তাদের অতি পরিচিত। যে সেখানে বসেছিল বা ঘুমাচ্ছিল সবাই উঠিপড়ি করে ছুটে এলো। কিন্তু সবাই এসে। থমকে দাঁড়ালো, বনহুরকে চিনতে না পেরে সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল দু’একজন ভয়ে কাঁপতে লাগল তাদের সর্দার তো মরে গেছে, এ কি তবে তাদের সর্দারের প্রেতাত্মা।
সবাই যখন মুখ চাওয়া চাওয়ি শুরু করেছে তখন বনহুর গর্জে বলল, বদমাইশদের উপযুক্ত শাস্তির দরকার।
এবার অনুচরগণ থর থর করে কেঁপে উঠল, এ যে তাদের মালিক স্বয়ং। একজন বলল– সর্দার আপনি!
বনহুর হুঙ্কার ছাড়লো– মনিরা কই? চৌধুরীকন্যা মনিরা?
আবার সকলের মুখ চুর্ন হয়ে গেল। সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল।
বনহুর গর্জে ওঠল কোথায় সে?
সবাই কাঁপছে।
একজন জবাব দিল–বৌরাণী কোথায় চলে গেছেন আমরা জানি না।
চলে গেছে! অস্ফুট কন্ঠে বলে উঠল বনহুর।
হ্যাঁ সর্দার, বৌরাণী কাউকে কিছু না বলে কোথায় চলে গেছেন আমরা কেউ জানি না।
বনহুরের মাথায় এক্ষণে আকাশ ভেঙে পড়লেও সে এতখানি মুষড়ে পড়ল না। কে যেন একটা হাতুড়ি দিয়ে তার হৃৎপিণ্ডে প্রচণ্ড আঘাত করে চলেছে। আর কোন প্রশ্ন করার সাহস হল।
বনহুরের। সে তো কিছু পূর্বে নিজের চোখে দেখে এসেছে, মনিরা অন্য একটা যুবকের সঙ্গে সন্তান কোলে না না, সেকি পাগল হয়ে যাবে। পৃথিবীটা এমন টলছে কেন? দু’হাতে মাথার চুল টেনে ধরে পাশের সোফায় এসে বসল বনহুর।
রাগে-ক্ষোভে অধর দংশন করতে লাগল সে। মাথার চুল টেনে ছিঁড়তে লাগল। দুনিয়ার যত ঝড়ঝঞ্জা বনহুর মাথা পেতে গ্রহণ করতে পারে কিন্তু মনিরার এ অবস্থা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না।
তাদের সর্দারের অবস্থা দেখে অনুচরগণের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।
বনহুর ভাবলো কেন সে ফিরে এলো, না আসাই ছিলা তার ভাল। হঠাৎ কায়েসের কথা স্মরণ হল, বলল সে কায়েস বেঁচে আছে? তাকে তো দেখছি না।
একজন অনুচর বলল–হ্যাঁ সর্দার, বেঁচে ছিল—
এখন সে মরে গেছে?
না সর্দার, সেও বৌরাণীকে খুঁজতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি।
কায়েস নেই?
না সর্দার।
রহমান?
সে তো এখানে নেই।
কেন, সে এখানে আসেনি?
এসেছিল সর্দার, আপনার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে এসেছিল। অনেক সন্ধান করেছে আপনার, কোথাও আপনাকে খুঁজে পায়নি। বৌরাণীকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু কেন যেন নিয়ে যায়নি। শুনেছিলাম বৌরাণীর জন্য সেখানে তার বড় চাচা পুলিশকে…
যাক বুঝেছি।
সর্দার, আমরাও বৌরাণীকে অনেক খুঁজেছি কিন্তু—
পাওনি, না?
হ্যাঁ সর্দার।
নরাধম তোমরা!
সর্দার।
তোমাদের বৌরাণী কতদিন আগে চলে গেছে?
আপনার মৃত্যুর কিছুদিন পরই—
আমার মৃত্যু হয়েছে।
আমরা সে রকম অনুমান করে—
দিব্যি আরামে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিলে তাই না?
এক রকম তাই সর্দার। কোন কাজ কর্ম ছিল না, তাই–
এখনও তাই ঘুমাও। উঠে দাঁড়াল বনহুর। তারপর দ্রুতগতিতে বেরিয়ে এলো অন্তঃপুর থেকে।
অনুচরগণ বহুদিন পরে সর্দারকে পেয়ে খুশিতে উফুল্ল হয়ে উঠেছিল বনহুর বেরিয়ে যেতেই সবাই এক সঙ্গে বলে উঠে– সর্দার। আবার চলে গেলেন, সর্দার–।
বনহুর সোজা চলল সেই হোটেলের দিকে। যতক্ষণ মনিরা ও সেই বদমাইশটাকে উপযুক্ত সাজা দিতে না পারে ততক্ষণ তার মনে শান্তি নেই। অবিশ্বাসিনী মনিরাকে নিজ হাতে গলা টিপে মারবে!
কিন্তু মনিরার কি দোষ? বনহুর মরে গেছে তাই সে চলে গেছে। কার জন্য সে অপেক্ষা করবে, কার প্রতিক্ষায় দিন কাটাবে। বনহুর তো মরে গেছে–
বনহুর অনেক চেষ্টায় ঐ হোটেলে একটা চাকরি নিল। সারাদিন রাতের অর্ধেক পর্যন্ত তাকে কাজ করতে হয়, কোন সময় বিশ্রাম নেই। কাজ করে যায় আর প্রতিক্ষা করে মনিরার ও সেই যুবকটির। কে সেই যুবক, মনিরার সাথে কি তার সম্বন্ধ, জানতে চায় সে।
