মনিরার চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে যায়, অসহ্য একটা ব্যথা তার সমস্ত দেহটাকে কুঁকড়ে আনে। একি হলো– বেদনা শুরু হলো তার পেটে। অতি কষ্টে সহ্য করে রইল, কিন্তু ক্রমেই বেদনা যেন বেড়ে যাচ্ছে। অসহ্য হয়ে মনিরা উঠে দাঁড়াল পায়চারী শুরু করলো। বারবার খোদাকে ডাকতে লাগলো আমাকে মুক্তি দাও খোদা। এই অসহ্য বেদনা থেকে মুক্তি দাও খোদা! ..
ক্রমে ব্যথা বেড়ে চললো। মনিরা মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে শুরু করলো। আজ মনিরার মনে পড়ছে কেন সেদিন বৃদ্ধাকে বিশ্বাস করে বাড়ির বাইরে পা দিয়েছিল? কেন সে এমন ভুল করেছিল? বৃদ্ধা কি তাকে যাদু করেছিল? তাই হবে, না হলে সে কাউকে কিছু না বলে একজন। অপরিচিতার সঙ্গে চলে এলো কি করে! সবাই ঐ শয়তান বৃদ্ধটার চক্রান্ত। কিন্তু কে ঐ বৃদ্ধ যার কণ্ঠস্বর পরিচিত বলে মনে হয়, কিন্তু কোথায় শুনেছিল ঐ কণ্ঠস্বর তা স্মরণ করতে পারছে না মনিরা।
শয়তান তাকে হাতের মুঠোয় পেয়ে কিছুতেই রেহাই দিত না। তার সর্বনাশ করত, কিন্তু তাকে রক্ষা করেছে তার স্বামীর দেয়া উপহার–তার গর্ভের সন্তান।
শয়তান তাকে সময় দিয়েছে যতদিন না তার সন্তান জন্মলাভ করে ততদিন সে রেহাই পাবে। কিন্তু তার সন্তান জন্মাবার পর কে রক্ষা করবে! কে তাকে শয়তানের কবল থেকে বাঁচিয়ে নেবে?
মনিরা ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল।
এমন সময় সেই বৃদ্ধা কক্ষে প্রবেশ করল, আসলে সে বৃদ্ধা নয়, বয়স্কা এক মহিলা। একটু হেসে বলল– কি হলো, ব্যথা শুরু হয়েছে?
মনিরা তীব্র চিৎকার করে উঠল– বেরিয়ে যাও শয়তানী, বেরিয়ে যাও এখান থেকে
মনিরার কথায় দুষ্টামির হাসি হাসলো বৃদ্ধা–বেশ যাচ্ছি, থাক তুমি একা। দরজার দিকে পা বাড়ালো বৃদ্ধা।
মনিরা এতক্ষণে নিরুপায়, বৃদ্ধা যতই শয়তানি করুক, কিন্তু এই মুহূর্তে মনিরা তাকে যেতে দিতে পারলো না। করুণ কণ্ঠে বলল– যেও না, তুমি যেও না–
বৃদ্ধা মেয়েলোকটি এগিয়ে এলো কি, দরকার পড়বে আমাকে? তোমার পায়ে পড়ি তুমি আমাকে একা ফেলে যেওনা।
.
অন্ধকার কারাকক্ষে ফুলের মত সুন্দর ফুটফুটে একটি শিশু জন্মগ্রহণ করলো। মনিরার পুত্রসন্তান জন্মেছে।
মনিরা তাকিয়ে দেখলো, ঠিক সেই নাক, সেই মুখ, সেই উজ্জ্বল নীল দুটি চোখ। সব তার মনিরের মত।
মনিরা বুকে তুলে নিল, তার হারিয়ে যাওয়া রত্ন আবার যেন ফিরে পেল সে।
অন্ধকার কারাকক্ষে মনিরা আকাশের চাঁদ পেল হাতে, ভুলে গেল সে যত ব্যথা বেদনা দুঃখ।
বেশ কিছুদিন কেটে গেল। মনিরা তার নবজাত শিশুকে নিয়ে বেশ আনন্দেই দিন কাটাতে লাগল হঠাৎ মনে পড়ল সে শয়তানের কথা, বলেছিল সে যতদিন না তোমার শিশু জন্মগ্রহণ করে ততদিন আমি তোমাকে রেহাই দিলাম কিন্তু তারপর আমার হাত থেকে তোমার উদ্ধার নেই। শিউরে উঠলো মনিরা, দু’হাতে বুকের মধ্যে শিশুকে চেপে ধরল।
কিন্তু অনেকগুলো দিন পেরিয়ে চলল শয়তানের সাক্ষাৎ নেই। মনিরা আতঙ্কভরা মন নিয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগল কখন কোন দণ্ডে সে এসে পড়বে কে জানে!
মনিরা শিশুর নাম রাখলো নূর। তার অন্ধকারময় জীবনে আলোর বন্যা এনেছে এ শিশু। খোদার দান, তাই ওর নাম খোদার নূর হিসেবেই রাখলো সে নূর।
অন্ধকার কারাকক্ষেই নূর শশীকলার মত বেড়ে চলল।
যদিও মনিরা বন্দিনী কিন্তু তার যেন কোন অসুবিধা না হয় সেজন্য সুন্দর ব্যবস্থা ছিল। কাজেই মনিরার কোন অসুবিধা হল না।
একদিন মনিরা মরার জন্য আকুল হয়ে উঠেছিল। আজ মনিরা বাঁচতে চায়। মরলে তার চলবে না–নূরকে তার বড় করতে হবে, মানুষ করতে হবে। নূর তার মনিরের স্মৃতিচিহ্ন।
.
বনহুরের অসাধ্য কিছুই নেই।
সিন্ধি পর্বত অতিক্রম করে একদিন বনহুর ঝিন্দ শহরে এসে পৌঁছল। শরীরের বসন ছিন্ন ভিন্ন মলিন। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মাথায় একরাশ কোঁকড়ানো চুল, তেলবিহীন রুক্ষ।
ঝিন্দ শহরে পৌঁছে বনহুরের মনে একটা আনন্দের উৎস বয়ে গেল। নিশ্চয়ই তার মনিরা এখন সেই বাড়িতেই রয়েছে। তার অনুচরবর্গ, তার বিশ্বস্ত অনুচর কায়েস সবাই রয়েছে। হঠাৎ তার আগমনে ওরা আশ্চর্য হয়ে যাবে। না জানি মনিরা কেঁদে কেঁদে কেমন জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে। হঠাৎ এভাবে দেখলে তাকে কেউ চিনতে পারবে না।
মনিরার সঙ্গে মিলন আশায় বনহুর চঞ্চল হয়ে উঠল। ক্ষুধা পিপাসায় অত্যন্ত কাতর ছিল সে, তবু ভুলে গেল সবকিছু। আত্মহারা হয়ে ছুটে চলল। কতদিন পর দেখা হবে তার মনিরার সঙ্গে।
কিন্তু নিজের পরিধেয় বস্ত্রের এবং ক্ষুধাকাতর চেহারার দিকে তাকিয়ে ক্ষান্ত হল। হাজার হলেও সেখানে তার অনুচরবর্গ রয়েছে, দাস-দাসী রয়েছে, এ বেশে যাওয়া তার উচিত হবে না।
পকেটে হাত দিল বনহুর, একটি পয়সাও নেই সেখানে। যে লাখ লাখ টাকার মালিক, যার ভাণ্ডারে ধনরত্নের সীমা নেই, সেই দস্যু বনহুর আজ কপর্দকশূন্য রিক্ত।
হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি চলে গেল নিজের আংগুলে। মনিরার দেয়া সেই হীরার আংটি তার আংগুলে চক্ চক্ করছে। কিন্তু এ আংটি হারানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। এ কাজ সে করতে পারে না। তবু একটা উপায় তাকে করতে হবে, এ বেশে কিছুতেই বাড়িতে যাওয়া চলবে না। সে দস্যু সর্দার– তার এ অবস্থা অনুচরদের মনে দারুণ ব্যথা জাগাবে। মনিরাও দুঃখ পাবে অনেক।
বনহুর দস্যু, পয়সা জোগাড় করে নিতে তার কষ্ট হবে না। একটা হোটেলের সম্মুখে এসে দাঁড়াল সে।
