ও মায়া!
হ্যাঁ, মহারাজ। একটু থেমে বলল সিন্ধীরাণী–এবার আমাদের বিয়ে হওয়াটা একান্ত—
বেশ, তাই হোক। মায়াকে বল বিয়ের আয়োজন করতে।
মহারাজ, আমার ইচ্ছা পৃথিবীর মানুষ আমরা, আমাদের বিয়ে হবে পৃথিবীর মুক্ত আলো বাতাসে। আপনি আমাকে পৃথিবীতে নিয়ে চলুন।
আচ্ছা তাই হবে।
আজই, এখনই যাব আপনার সঙ্গে।
বেশ,তাই হোক।
মহারাজের সঙ্গে সিন্ধীরাণী তাদের ডুবন্ত মোটরবোটে চেপে বসল।
মোটর বোটখানা এবার গভীর সাগরতল থেকে সাঁ সাঁ করে উপরের দিকে উঠতে লাগল।
অদ্ভুত মোটরবোটখানা অল্পক্ষণেই সাগরতীরে এসে পৌঁছে গেল। সিন্ধীরাণী ও মহারাজ উঠে দাঁড়াল।
সিন্ধীরাণী বলল– আমাকে আগে নামিয়ে দিন মহারাজ!
মহারাজের হাত ধরে সিন্ধীরাণী সাগরতীরে নেমে দাঁড়াল। এবার মহারাজ যেমনি মোটরবোট থেকে নামতে যাবে, অমনি পিছন থেকে ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায় ভীষণভাবে বনহুর আক্রমণ করল মহারাজকে।
মহারাজ হঠাৎ আক্রমণের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। আচমকা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল সে মোটরবোটের মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে টাল সামলিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর সেও পাল্টা আক্রমণ করল বনহুরকে।
ভীষণ ধস্তাধস্তি শুরু হলো। মহারাজের মুখ থেকে নকল দাড়ি গোঁপ খসে পড়ল। সিন্ধীরাণীর কণ্ঠ শুকিয়ে গেল। এ যে সেই যুবক, মহারাজের ছদ্মবেশে..
বনহুর দাঁতে দাঁত পিষে বলল– সকলের চোখে ধুলো দিয়ে মহারাজ সেজে লোকের সর্বনাশ করতে পার, কিন্তু আমার চোখে ধুলো দিতে পারবে না শয়তান। বনহুর বজ্রমুষ্টিতে মহারাজের কণ্ঠ চেপে ধরলো।
মহারাজের দু’চোখ বেরিয়ে এলো প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে বনহুরের বলিষ্ঠ মুষ্টি থেকে মুক্ত করে নেবার চেষ্টা করতে লাগলো।
বনহুর বলে উঠলো–তোমাকে আমি এত সহজে হত্যা করবো না। সিন্ধীরাজের রাজভাণ্ডারের ধন-রত্ন তুমি কোথায় লুকিয়ে রেখেছ জানতে চাই।
মহারাজ বেশি শয়তান বলে উঠলো– দস্যু, তুমি তাহলে সব জেনে নিয়েছ। কট কট করে তাকালো সে সাগরতীরে দণ্ডায়মান সিন্ধীরাণীর দিকে এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে সে, সিন্ধীরাণীর চক্রান্তেই আজ সে এ ভাবে বিপদগ্রস্ত হয়েছে। হঠাৎ মহারাজ তার কোমরের বেল্ট থেকে সূতীক্ষ্ম ধার ছোরাখানা বনহুরের অলক্ষ্যে অতি দ্রুতহস্তে সিন্ধীরাণীর বুক লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলো।
এত দ্রুত সে এ কাজ করলো যেন বনহুর বুঝতেই পারেনি।
সিন্ধীরাণীর বুকে খচ করে বিদ্ধ হলো মহারাজের নিক্ষিপ্ত সূতীক্ষ্মধার ছোরাখানা।
আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়লো সিন্ধীরাণী।
বনহুর সিন্ধীরাণীর দিকে ফিরে তাকাতেই–এ দৃশ্য লক্ষ্য করে ধৈর্যহারা হয়ে পড়লো। ভুলে গেল সব কথা, মহারাজকে ছেড়ে দিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে মোটরবোট থেকে নেমে গিয়ে সিন্ধীরাণীর ভূলুণ্ঠিত মাথাটা তুলে নিল কোলে, একটানে ছোরাখানা খুলে ফেলল সিন্ধীরাণীর বুক থেকে।
ওদিকে শয়তান মহারাজ তার মোটরবোটখানা নিয়ে অদৃশ্য হয়েছে।
সিন্ধীরাণীর বুক থেকে তখন ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
বনহুর তাকিয়ে দেখল সাগরতীর শূন্য, মহারাজ মোটরববাটসহ উধাও।
সিন্ধীরাণীর করুণ মর্মস্পর্শী অবস্থা বনহুরের কঠিন হৃদয়েও আঘাত করল। দু’চোখ ছাপিয়ে পানি ঝরে পড়তে লাগল বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে ডাকল– সিন্ধীরাণী একি হলো।
সিন্ধীরাণী ব্যথারুণ জড়িত কণ্ঠে বলল কেঁদো না দস্যুসম্রাট। মরেও আমি শান্তি পাবো যে, তোমাকে আমি সাগরতল থেকে মুক্ত করে আনতে পেরেছি, এটাই আমার আনন্দ।
কিন্তু তোমার আমি কিছুই করতে পারলাম না সিন্ধীরাণী। কত আশা ছিল তোমার পিতার শূন্য আসনে তোমাকে প্রতিষ্ঠা করবো। সিন্ধীরাজ্যের রাণী হবে তুমি–কিন্তু সব আশা আমার ধূলিস্যাৎ হয়ে গেল। কিছুই তোমাকে দিতে পারলাম না–
না–তুমি আমাকে যা– দিয়েছ তাই আমার পক্ষে–যথেষ্ট দস্যুসম্রাট–আর আমার কোন। সাধ নেই–ই–
বনহুরের কোলে সিন্ধীরাণীর মাথাটা ঢলে পড়লো।
বনহুরের গণ্ড বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু নীরবে ঝরে পড়লো সিন্ধীরাণীর মৃত্যুবিবর্ণ মুখের ওপর।
সিন্ধীরাণীর মৃতদেহ দু’হাতের ওপর তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো বনহুর। এগিয়ে চললো সাগরের দিকে।
উচ্ছল জলরাশি কলকল করে এগিয়ে আসছে।
বনহুর সিন্ধীরাণীর মৃতদেহটা নিয়ে আলগোছে রেখে দিল সাগরের জলে। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঢেউ সিন্ধীরাণীর সুকোমল ফুলের মত সুন্দর দেহটা নিমিষে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল, বনহুর অনেক চেষ্টাতেও আর দেখতে পেল না।
.
মনিরা বন্দিনী অবস্থায় এক অন্ধকার কারাকক্ষে দিন কাটাতে লাগল। স্বাস্থ্য তার ভেঙে গেছে। কিছুই ভাল লাগে না। কোন সাধ আহ্লাদ আর তার জীবনে নেই। এই বয়সে যেন তার সবকিছু নিঃশেষ হয়ে গেছে। সেদিন আত্মহত্যা না করে ভুলই করেছিল মনিরা। ভাবে সে, এ বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু তার অনেক ভাল ছিল। যে মেয়ের জীবন অভিশপ্ত তার আবার আশা ভরসা!
যতই নিজের জীবন সম্বন্ধে চিন্তা করে মনিরা, ততই অদৃষ্টের প্রতি আসে তার বিতৃষ্ণা, ঘৃণা, অবহেলা। কতই বা বয়স হয়েছে তার। জন্মাবার পরই তার স্নেহময় পিতা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। তারপর ছোটবেলায় মায়ের ইচ্ছায় তাদের বিয়ের কথা পাকা হল। বিয়ের বয়স না হতেই তার বালক ভাবী স্বামী হারিয়ে গেল কোন অজানায়। তারপর বিদায় নিলেন স্নেহময়ী মা। মামা-মামী ভালবাসতেন তাদের সেবাই ছিল তার একমাত্র সম্বল, এ সুখও তার সইলো না। পিতা সমতুল্য মামাও তাকে ফেলে চলে গেলেন। চিরবিদায় নিয়ে, এত ব্যথা বেদনা সব মনিরা ভুলে গেল তার হারিয়ে যাওয়া রত্মকে খুঁজে পেয়ে। সব দুঃখ তার লাঘব হলো স্বামীর বুকে মাথা রেখে। কিন্তু সে সুখও তার অদৃষ্টে সইলো না।
