অফিসের ডিউটি যাদের রয়েছে তারা ছাড়া সবাই উঠে পড়েন। পুলিশ অফিসের ঘড়িতে তখন রাত ন’টা পঁচিশ বেজে গেছে।
.
যাকে নিয়ে তোক সমাজের এত আতঙ্ক, যার জন্য পুলিশমহলে আশঙ্কার সীমা নেই, যার তুলনা হয় আগ্নেয়গিরির সঙ্গে সেই সিংহপুরুষ শান্তশিষ্ট বালকের মত সাগরতলে শান্ত হয়ে রয়েছে। নাওয়া-খাওয়া আর ঘুমানো ছাড়া তার যেন কাজ নেই। গোসলের সময় ফোয়ারার পানিতে গোসল করা, খাবারের সময় নানাবিধ খাদ্যদ্রব্য সম্ভারে ভরে উঠে বনহুরের সম্মুখস্থ। টেবিল। অবসর সময়ে সাগরতলে স্বচ্ছ কাঁচের আবরণীর পাশে গিয়ে বসে দৃশ্য দেখা। নর্তকীদের নাচ আর গানে সময় কাটানো। ঘুমাবার সময় দুগ্ধফেননি সুকোমল শয্যায় গা এলিয়ে ঘুমানো। এসব এখন দস্যু বনহুরের কাজ।
মাঝে মাঝে বনহুর যখন মন খারাপ করে বসে থাকে বা চিন্তা করে, তখন সিদ্ধীরাণী তাকে নানাভাবে খুশি করার চেষ্টা করে। হাসি খুশিতে মুখর করে তুলতে চায় ওকে।
কিন্তু বনহুর তো সত্যি সত্যিই অবোধ শিশু নয়, সে সব বুঝে উপলব্ধি করে, নিজেকে যতদূর সম্ভব প্রসন্ন রাখার চেষ্টা করে। এমনি করে কতদিন কাটানো যায় বনহুর ক্রমে হাঁপিয়ে পড়ে। চঞ্চল হয়ে ওঠে সে–সাগরতল থেকে উদ্ধারের উপায় খুঁজে।
প্রায় বছর হয়ে আসে।
মহারাজের পাত্তা নেই, সেই যে সিন্ধিরাণীকে শাসিয়ে রেখে চলে গেছে, তারপর আর ফিরে আসেনি সে।
মহারাজ না আসায় সিন্ধিরাণীর আনন্দ আর ধরে না। কিন্তু বনহুর মহারাজের আগমন আসায় প্রহর গুণে চলে।
একদিন বনহুরের শয্যার পাশে বসে বসে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সিন্ধিরাণী। বনহুর চোখ দুটো মুদে নিশ্চুপ হয়ে পড়ে। সিন্ধিরাণী নীলাভ আলোয় বনহুরের সুন্দর মুখমণ্ডলের দিকে নির্বাক নয়নে তাকিয়ে আছে। ভাবছে সিন্ধিরাণী ওকে চিরদিন এমনি করে ধরে রাখবে আর কোনদিন ছেড়ে দেবে না। কোন বাধাবিঘ্ন তার কাছ থেকে দস্যু সম্রাটকে কেড়ে নিতে পারবে না–
হঠাৎ সিন্ধিরাণীর চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে যায়। দরজার বাইরে মায়ার ব্যস্তকণ্ঠ শোনা যায়– রাণীজী, রাণীজী, মহারাজ এসেছেন। মহারাজ এসেছেন।
বনহুর বিদ্যুৎ গতিতে উঠে দাঁড়াল।
সিন্ধিরাণী বলল– শিগগির লুকিয়ে পড়, শিগগির। লুকিয়ে পড়—
রাণী, শোনো, এবার আমি চাই তোমার সহায়তা।
বল, কি করব?
তুমি মহারাজকে প্রেমের অভিনয় করে এমন আদর আপ্যায়ন করবে, যেন সে তোমার কক্ষে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে দেয়।
আমি তা পারব না।
আমাকে যদি তুমি ভালবাস রাণী, তবে এই কাজ তোমাকে করতেই হবে, আমি সেই ফাঁকে তার ডুবন্ত মোটরবোটের কোন গোপন অংশে লুকিয়ে পড়ব। এবার নিশ্চয়ই সে তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছে, তুমি আপত্তি না করে তার সঙ্গে চলে আসবে।
আমি এসব পারব না।
যদি মঙ্গল চাও তবে কথা শেষ হয় না বনহুরের দরজায় শোনা যায় ভারী জুতোর শব্দ।
বনহুর চট করে বড় আয়নার পেছনে লুকিয়ে পড়ল।
কক্ষে প্রবেশ করল মহারাজ।
সিন্ধিরাণী তাড়াতাড়ি মুখোভাব স্বাভাবিক করে নিয়ে তাকে অভিবাদন জানালো।
মহারাজ গম্ভীর কণ্ঠে বলল–বেঁচে আছ তাহলে?
আপনি কি ভেবেছিলেন আমি মরে গেছি? বলল সিন্ধীরাণী।
মহারাজ এবার এগিয়ে গেল সিন্ধিরাণীর দিকে, বলল– আশ্চর্য এতদিন একাধারে সাগরতলে বন্দিনী থেকেও তোমার মধ্যে কোন চিন্তার ছাপ পড়েনি দেখছি। বেশ ছিলে তাহলে?
না, আপনার আসার প্রতীক্ষায় দিন গুণছিলাম।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, যেদিন আপনি বলে গেছেন আমাকে আপনি বিয়ে করবেন, সেদিন থেকে আপনার চিন্তাই আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
বনহুর আয়নার পেছন থেকে সিন্ধিরাণী আর মহারাজের সব কথা শুনছিল। সিন্ধিরাণীর বুদ্ধিদীপ্ত কথায় খুশি হচ্ছিল সে। এক্ষুণি ওকে ধরাশায়ী করতে পারে, কিন্তু তা করবে না বনহুর। শয়তানটার আস্তানার সন্ধান তার নেয়া চাই, কাজেই মনের আক্রোশ মনে চেপে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাবার সুযোগ খোঁজে সে।
সিন্ধীরাণীর কথায় বলল মহারাজ–তোমার কথা শুনে খুশি হলাম রাণী। জীবনে বহু মেয়েকে পেয়েছি, সবাই এক রকম আর, একটি মেয়েকেই জীবনে চেয়েও পাইনি– সে অদ্ভুত মেয়েটি। সাপীনির চেয়েও ভয়ঙ্কর।
সিন্ধীরাণী হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল– মহারাজ, কে সেই মেয়েটি যাকে আপনি চেয়েও কোনদিন পান নি।
তুমি তাকে চিনবে না রাণী। সে অপূর্ব সুন্দরী, অদ্ভুত সে নাম তার মনিরা।
আয়নার পেছনে চমকে উঠলো বনহুর। সঙ্গে সঙ্গে দু’চোখে বিদ্যুৎ খেলে গেল। এতক্ষণে বুঝতে পারলো, কে এই শয়তান মহারাজ। এক্ষুণি ওর টুটি ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা হলো বনহুরের, কিন্তু নিজেকে অতি কষ্টে সংযত করে নিল, কারণ এখনও অনেক কিছু বাকি।
সিন্ধীরাণী বলল– মহারাজ,আপনি তাকে ভালবাসতেন?
হ্যাঁ, এখনও বাসি, কিন্তু
মহারাজ, আমি যে আপনাকে ভালবাসি। সিন্ধীরাণী মহারাজের কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরলো তার সুকোমল বাহু দুটি দিয়ে। এমন কৌশলে সিন্ধীরাণী মহারাজের গলা জড়িয়ে ধরলো যেন দরজা ও আয়নাটা তার পেছনে থাকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুর আয়নার পেছন থেকে বেরিয়ে দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করে।
হঠাৎ দরজায় একটু শব্দ হয়।
মহারাজ সিন্ধীরাণীর বাহু দুটি নিজ কণ্ঠ থেকে ছাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠল– কে কে?
সিন্ধীরাণী হেসে বলল–মহারাজ এই সাগরতলে কার সাধ্য আসে! মায়া এসে ফিরে গেল। সে আমাদের এ অবস্থায় দেখতে পেয়ে লজ্জায়
