আজকাল রহমান ঝিমিয়ে পড়ায় দস্যুতা একরকম বন্ধ হয়ে গেছে। সমস্ত আস্তানা জুড়ে একটা বিরহ বেদনার করুন থমথমে ভাব বিরাজ করছে।
বেশ কিছুদিন হলো ঝিন্দের সংবাদ সে পায় নি। তাই খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে রহমান। প্রভু ভক্ত অনুচর সে, প্রভুর জন্য প্রাণ দিতেও পিছপা নয়। সেই প্রভুর পত্নী আজ ঝিন্দ শহরে। কেমন আছে, তারা, কি করছে তারা কি করছে কায়েস, এসব চিন্তা রহমানের মনে সদা উদয় হয়। কিন্তু ঝিল শহর তাদের দেশ থেকে বহুদূরে। চট করে কোন সংবাদ পাওয়া সম্ভব নয়। রহমান জানে কায়েসের মত বিশ্বাসী এবং মহৎ অনুচর সেখানে আছে, কাজেই তার চিন্তার কোন কারণ নেই। নিশ্চয়ই প্রভু পত্নীর কোন অসুবিধা হবে না।
.
মিঃ জাফরী ও অন্যান্য পুলিশ অফিসার আলাপ-আলোচনা করছিলেন। গম্ভীর মুখে বসে রয়েছেন মিঃ জাফরী।
খানবাহাদুরের ছেলে মুরাদকে জামিনে মুক্তি দেবার পর সে পুলিশের কড়া পাহারার মধ্যে থেকেও উধাও হয়েছে, এ ব্যাপার নিয়েই পুলিশ অফিসারদের মধ্যে কথাবার্তা হচ্ছিল। মুরাদ নিরুদ্দেশ হওয়ায় খানবাহাদুরকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। বৃদ্ধ খানবাহাদুর সাহেব একেবারে ভেঙে পড়েছেন। পুত্রের জন্য তিনি আজ পুলিশের হাতে অপদস্ত হচ্ছেন।
সমস্ত শহর তন্ন তন্ন করে খোঁজা হচ্ছে, কিন্তু কোথাও মুরাদের টিকিটা পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। প্রায় বছর হয়ে এলো মুরাদ উধাও।
শুধু মুরাদের চিন্তাই পুলিশমহলকে ঘাবড়ে তোলেনি, মিঃ জাফরীর লাখ টাকা ঘোষণার পর পুলিশ উঠে পড়ে লেগেছে, নানাভাবে অনুসন্ধান চালিয়েও দস্যু বনহুরের কোন হদিস পায় নি। বিশেষ করে মনিরা তার বিয়ের আসর থেকে চুরি যাবার পর বনহুর যেন হাওয়ায় মিশে গেছে। তার সঙ্গেই যেন নিরুদ্দেশ হয়েছে মুরাদও।
মিঃ জাফরীর আদেশে চৌধুরীবাড়ি ও তার আশেপাশে পুলিশ অহরহ গোপনে পাহারা দিয়ে চলেছে। কিন্তু আজ পর্যন্তও তারা নতুন কোন সংবাদ দিতে পারছে না।
মিঃ জাফরী গম্ভীর মুখে শুনে যাচ্ছিলেন। কথাবার্তা হচ্ছিল মিঃ হারুন, মিঃ কাওছার, মিঃ হোসেন ও মিঃ শঙ্কর রাওয়ের মধ্যে। শঙ্কর রাও হঠাৎ এক সময় বলে উঠলেন–শহরটা যেন একেবারে ঘুমিয়ে পড়েছে।
বলে উঠল মিঃ হোসেন– হ্যাঁ, স্যার বিশেষ করে লাখ টাকা ঘোষণার পর থেকে।
মিঃ কাওসার বললেন– দস্যু হলেও সেত মানুষ। জীবনের ভয় তারও আছে।
মিঃ হোসেন বললেন– কাজেই সরে পড়েছে।
কিন্তু গেল কোথায়? দেশে আছে, না বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে, বুঝা যাচ্ছে না। বললেন শংকর রাও।
মিঃ হারুন বললেন– দেশে থাকলে সে এমন করে লুকিয়ে থাকতে পারতো না, এটা ঠিক।
এতক্ষণে কথা বললেন মিঃ জাফরী–ঠিক বলেছেন মিঃ হারুন। দেশের মাটিতে থাকলে সে নিশ্চয়ই এমন করে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারত না। ঐ যে কথায় বলে, পিপীলিকার পাখা। হলে সে কোন সময় তার বাসায় লুকিয়ে থাকতে পারে না।
মিঃ কাওসার বললেন-ঘঁ, ঠিকই বলেছেন স্যার, সে পুলিশের ভয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে। জানে লাখ টাকা এবার তাকে টেনে বের করবেই, কাজেই পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে বেচারা।
শঙ্কর রাও হেসে বললেন– দেশত্যাগী হয়েছে বনহুর।
অন্য একজন অফিসার বললেন– একা নয় চৌধুরীকন্যা মনিরাকে নিয়ে।
মিঃ হারুন বললেন–শয়তান দস্যু মেয়েটির জীবন বিনষ্ট করে দিল। মেয়েটির বড় চাচা ওকে পুত্রবধু করবেন বলে দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন, সব পণ্ড করে মেয়েটাকে চুরি করে পালিয়েছে। বদমাইশটা।
মিঃ জাফরী বললেন– চৌধুরী– গিন্নী ভাগনীর জন্য নাকি উদভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন।
হ্যাঁ স্যার, বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার অবস্থা খুব খারাপ। সব সময় কান্নাকাটি করছেন। কথাগুলো বললেন মিঃ হারুন।
মিঃ জাফরী স্থিরকণ্ঠে বললেন– শুনেছি চৌধুরী সাহেব ও তাঁর স্ত্রী অত্যন্ত ভালো মানুষ। আর তাঁদেরই সন্তান এই লোকসমাজের কলঙ্ক দস্যু।
অন্য একজন প্রবীণ অফিসার বললেন–স্যার, গোবরেও পুষ্প জন্মে, আবার পুষ্পেও কীট হয়।
ভদ্রলোকের কথা সবাই সমর্থন করলেন।
শঙ্কর রাও এবার বলে উঠলেন এতদিনে শান্তি ফিরে এসেছে যা হোক। চুরি ডাকাতি, রাহাজানি, লুটতরাজ নেই বললেই চলে। এমন না হলে হয়!
মিঃ জাফরী এবার একটু হাসলেন– তারপর বললেন দেশে শান্তি ফিরে এলেও আমার মনে শান্তি ফিরে আসেনি। যতদিন দস্যুটাকে তার উপযুক্ত শাস্তি দিতে না পারব ততদিন আমার চোখে ঘুম আসবে না।
হ্যাঁ স্যার, আপনার মত মানুষকে সে নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছেড়েছে। মিঃ কাওছার দুঃখভরা কণ্ঠে কথাটা বললেন।
শুধু তাকেই নয়, সমস্ত পুলিশমহলকে শয়তান জ্বালিয়ে মেরেছে। ওকে পাকড়াও না করা পর্যন্ত পুলিশমহল নিশ্চিন্ত নয়। আবার কখন আচম্বিতে হামলা চালিয়ে বসে তার ঠিক নেই। কথাটা বললেন– অন্য একজন পুলিশ অফিসার।
মিঃ হোসেন বললেন– যেমন ঘুমন্ত অগ্নেয়গিরি হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শান্ত শহরকে চঞ্চল করে তোলে।
হ্যাঁ, অমনিভাবেই আবার সে হানা দিয়ে বসবে, যখন নগরবাসী নিশ্চিত মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে। বললেন মিঃ হারুন। একটু থেমে আবার বললেন তিনি– আমরাও সে জন্য সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকব।
বলে উঠেন মিঃ কাওসার–বসে বসে হাত-পায়ে জড়তা আসছে। পুলিশের লোক আমরা, শান্ত জীবন আমাদের কাম্য নয়।
এমনি নানা ধরনের আলাপ আলোচনার মধ্যে রাত বেড়ে আসছে মিঃ জাফরী উঠে দাঁড়ালেন–চলুন, এবার বাসায় ফেরা যাক।
