কায়েস আশ্চর্য হলো, তাকে তো কেউ দেখেনি, হঠাৎ এই লোকটা এলোই বা কোথা থেকে, আবার একেবারে সোজা ভেতরে গিয়ে বসার জন্য তাকে বলছে, ব্যাপার কি?
কায়েস অনুসরণ করলো লোকটাকে।
চুন-বালি খসে পড়া মস্তবড় হলঘর। এ বাড়িতে মানুষ বাস করে অথচ তেমন ভাবে মেরামত করা হয় নি কতকাল থেকে।
হলঘরে প্রবেশ করতেই সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক কায়েসকে অভ্যর্থনা জানালো–আসুন হঠাৎ কি মনে করে?
কায়েস প্রথমে হকচকিয়ে গেল, কি বলে কথা শুরু করবে ভাবছে, তখন বৃদ্ধই বললেন– মা মনি বুঝি আপনাকে পাঠিয়ে দিলেন আমাকে আমন্ত্রণ জানাতে?
কায়েস আমতা আমতা করে বলল– হ্যাঁ, বৌরাণীই আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। সেদিন আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছেন।
বৃদ্ধের ঠোঁটের কোনে একটা হাসির রেখা ফুটে উঠে মিলিয়ে গেল, বলল– আপনার বৌরাণী আপনাকে পাঠাবেন এ আমি জানতাম।
কায়েস ফ্যাকাশে হাসি হাসে, কোন কথা বলতে পারে না।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক বললেন– আপনার বৌরাণী নিশ্চয়ই আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন?
চট করে কি জবাব দেবে ভেবে পায় না কায়েস, একটা ঢোক গিলে বলল– হাঁ, তিনি। আপনাকে যাবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
শুনে খুশি হলাম।
বৃদ্ধ এবার কায়েসের জন্য নাস্তার আয়োজন করতে বললেন।
কায়েস বৃদ্ধের ব্যবহারে সন্তুষ্ট হলো।
অল্পক্ষণেই নানাবিধ খাদ্য সম্ভারে ভরে উঠলো তার সামনের টেবিল।
বৃদ্ধ হেসে বললেন– নিন, শুরু করুন।
.
কায়েসের জ্ঞান ফিরে এলো, উঠে বসতে গেল কিন্তু দু’চোখ তার এমনভাবে মুদে আসছে। কেন? মাথাটা ঝিমঝিম করছে। অনেক কষ্টে সোজা হয়ে বসল কায়েস, তাকালো সামনের দিকে। একি, চারদিকে এমন অন্ধকার কেন? সেকি নিজের ঘরে, নিজের বিছানায় শুয়ে নেই? ধীরে ধীরে কায়েসের মনে পড়লো,সে তো বৃদ্ধ ভদ্রলোকের হলঘরে বসে নাস্তা করছিল। কিন্তু এখানে এলো কি করে। তবে কি তাকেও বন্দী করা হয়েছে? কায়েসের মনে সন্দেহ জাল বিস্তার করলো। এবার ধীরে ধীরে সব পরিষ্কার হয়ে এলো কায়েসের কাছে। এই বৃদ্ধই তাহলে বৌরাণীকে চুরি করে নিয়ে এসেছে। নিশ্চয়ই কোন দুষ্ট লোক সে। তার সেদিনের সন্দেহ তাহলে সত্যি।
কায়েস রাগে অধর দংশন করতে লাগলো। এখন উপায়, বৌরাণীর সন্ধান করতে এসে নিজেই ফাঁদে পড়ে গেল। নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হলো কায়েস, বৌরাণী নিরুদ্দেশ হবার সংবাদটা যদি রহমানের নিকটে পাঠাতে পারত তবু কতকটা নিশ্চিন্ত হত সে। এখন বৌরাণীও নিখোঁজ, সেও উধাও। সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যায় তার কাছে। ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছা করে কায়েসের।
হঠাৎ দরজা খুলে যায়, কায়েস তাকিয়ে দেখতে পায় তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই বৃদ্ধ। যদিও কক্ষটা অন্ধকার তবু বুঝতে পারে সে।
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বৃদ্ধ।
কায়েস অন্ধকারেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে রইল।
বৃদ্ধ হাসি থামিয়ে বলল– মিথ্যাবাদী, বৌরাণী তোমাকে পাঠিয়েছে, না? কোথায় তোমার বৌরাণী?
কায়েস এবার কথা বলল– শয়তান, তুমিই তাহলে বৌরাণীকে…
হ্যাঁ, আমিই তাকে চুরি করে এনেছি।
কেন, কি করেছিল সে তোমার?
সে কথার জবাব আজ পাবে না, পরে সব জানতে পারবে। কিন্তু মনে রেখ, আর কোনদিন এ অন্ধকার কারাকক্ষ থেকে তোমার পরিত্রাণ নেই। বৌরাণীর সন্ধানে এসে নিজেই বন্দী হলে!
কায়েস বৃদ্ধের কথায় ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায় গর্জে উঠলো, বলল– শয়তান, তোমার সাধ্য কি আমাকে বন্দী করে রাখ। আমি বৌরাণীকে উদ্ধার করবোই।
আবার হেসে উঠলো বৃদ্ধ– হাঃ হাঃ হাঃ তার সন্ধান পেলেতো উদ্ধার করবে!
আমি যদি জীবনে বেঁচে থাকি তবে আমি তাকে খুঁজে বের, করবোই…
সে সুযোগ তুমি আর পাবে না শয়তান। পদাঘাতে কায়েসকে মেঝেতে ফেলে দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপে অন্ধকার কারাকক্ষ হতে বেরিয়ে যায়।
কায়েস অতিকষ্টে উঠে বসে।
ততক্ষণে তার চোখের সামনে লৌহ দরজা কড়কড় শব্দে বন্ধ হয়ে যায়।
.
নূরী, ঘরে চলো নূরী, আর কতদিন বনে বনে কেঁদে বেড়াবে? নূরীর কোটরাগত চোখ, এলোমেলো রুক্ষ চুল। ছিন্নভিন্ন পরিধেয় বস্ত্র। জীর্ণ দেহটার দিকে তাকিয়ে রহমান কথাটা বলে।
রহমানের কথায় ফিরে তাকালো নূরী। উদাস কণ্ঠে বলল–আমি আর ঘরে যাব না রহমান। যতদিন না আমার হুর ফিরে আসবে ততদিন আমি যাবো না। তুমি চলে যাও রহমান..
নূরী, যে গেছে আর কি কোনদিন ফিরে আসবে?
খবরদার, ও কথা বলবে না। আমার হুর মরে যায়নি, আমার মন বলছে সে মরে যায়নি। রহমান, দেখ সে আবার ফিরে আসবে। আমার হুর মরতে পারে না, মরতে পারে না। তুমি চলে যাও রহমান, চলে যাও–
নূরী!
না না, তুমি আমাকে ডেকো না রহমান। আমাকে ডেকো না।
রহমানের দু’চোখ ছাপিয়ে পানি আসে। নূরীর অবস্থা তার হৃদয়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। সর্দার নেই,একে সে ব্যথায় অহরহ তার অন্তর গুমড়ে মরছে, তারপর নূরীর এ অবস্থা সমস্ত আস্তানাটা যেন কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। বনে বনে পাখি আর গান গায় না। গাছে গাছে ফুল ফোটে না। আকাশে চাঁদ উঠে, কিন্তু সে চাঁদের আলো যেন বিবর্ণ। ঝর্ণার পানিতে গতি আছে, কিন্তু সেই ছন্দ যেন নেই। একজনের অভাবে বনভূমি যেন সন্তানহারা জননীর মত হয়ে পড়েছে। গভীর রাতে রহমান চমকে উঠে, দূর থেকে ভেসে আসে নূরীর কান্নার করুন সুর। ঘরে বসে ছটফট করে রহমান। ছুটে যেতে ইচ্ছা করে ওর পাশে, কিন্তু কে যেন পথ রোধ করে ধরে ওর। কে যেন বলে কাঁদতে দে ওকে, প্রাণভরে কাঁদতে দে।
