বেশ বেশ। সময় করে একদিন যাব–
মনিরা বলল–যাবেন, গেলে অনেক খুশি হব। তারপর গাড়িতে গিয়ে বসলো। কায়েস ড্রাইভ আসনে বসে স্টার্ট দিল।
মনিরাদের গাড়ি কিছুদুর এগুতেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক তার একজন অনুচর ইংগিত করলেন।
সঙ্গে সঙ্গে অনুচরটি পাশেই থেমে থাকা একটা মোটরে উঠে মনিরাদের গাড়ি ফলো করলো।
বৃদ্ধের চোখে মুখে খেলে গেল এক অদ্ভুত হাসির ছটা।
মনিরা গাড়িতে বসে বলল কায়েস, তুমি বৃদ্ধ ভদ্রলোককে ভুল ঠিকানা বললে কেন?
বৌরাণী আপনি সরল মেয়ে মানুষ ওসব বুঝবেন না।
কয়েকদিন পরের ঘটনা।
একদিন মনিরা বাড়ির সম্মুখস্থ বাগানে বসে আছে। শরীরটা বড় ভাল নয়। মনের সঙ্গে দিন দিন স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়েছে,তবু নিজেকে খাড়া করে রাখছে মনিরা। আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল তাও পারেনি। একটা কচি মুখ ভেসে উঠেছিল তার চোখের সামনে। স্বামীর দেওয়া উপহার মনিরা নষ্ট করতে পারে না। তাকে বাঁচাতেই হবে।
মনিরা হঠাৎ দেখলো একটি সুন্দর গাড়ি তাদের বাগানের সামনে এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমে এলো এক বৃদ্ধ মহিলা। শুভ্র কেশ ধারিণী অদ্ভুত এক নারী, ললাটে সিঁদুরের টিপ সিঁথিতে সিঁদুর মুখমণ্ডল প্রতিভাদীপ্ত। উজ্জ্বল হাসির রেখা ফুটে রয়েছে বৃদ্ধার ঠোঁটের ফাঁকে।
প্রথম দৃষ্টিতেই মনিরার বড় ভাল লাগল বৃদ্ধাকে। এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলো–কে আপনি?
বৃদ্ধা মনিরার চিবুক ধরে আদর করে বলল–আমাকে চিনতে পারবিনে মা। আমার স্বামী যার সঙ্গে তোমার সিনেমা হলে পরিচয় হয়েছিল তিনি আমাকে পাঠিয়ে দিলেন।
ও আপনি সেই মহৎ ব্যক্তির—
মনিরা অভিবাদন জানিয়ে বৃদ্ধা ভদ্রমহিলাকে অন্তঃপুরে নিয়ে গেল।
অল্পক্ষণেই বৃদ্ধার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেল মনিরা, আপনজনের চেয়েও অনেক আপন বলে মনে হলো ওর কাছে।
কায়েস আজ বাড়ি নেই, মনিরা বৃদ্ধাকে যতদূর সম্ভব আদর আপ্যায়নে তুষ্ট করলো।
বিদায়কালে বলল–বড় আশা করে তিনি আমাকে পাঠিয়ে দিলেন তোমাকে নিয়ে যাবার জন্য। একা ফিরে যাচ্ছি অনেক দুঃখ পাবেন তিনি।
মনিরা এই অজানা দেশে এমন একজন আত্মীয় সমতুল্য মহিলাকে পেয়ে খুব খুশি হলো। সেদিন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের আচরণেও সে অত্যন্ত আত্মহারা হয়ে পড়েছিল। মনিরা কিছু ভাবলো তারপর বলল–আপনি অপেক্ষা করুন আমি যাব আপনার সঙ্গে।
বৃদ্ধার চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, বলল– বাঁচালে মা, বাঁচালে। উনি অনেক খুশি হবেন।
মনিরা বৃদ্ধার সঙ্গে তার সুন্দর গাড়িখানায় চেপে বসলো।
.
কায়েস রহমানের জরুরি এক খবর পেয়ে দু’দিনের জন্য চলে গিয়েছিল, ফিরে এসে বাড়িতে মনিরাকে না দেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো।
দিন গড়িয়ে গেল, রাত হলো। রাত ভোর হলো তবু মনিরা ফিরলো না, কায়েস বুঝতে পারলে তাকে কেউ ভুলিয়ে নিয়ে গেছে।
কায়েস কি করবে। কোথায় তার সন্ধান করবে ভেবে পেল না পাগলের মত সে গোটা শহর খুঁজে বেড়াতে লাগলো। হঠাৎ মনে পড়লো, সেদিন সিনেমা দেখার দিন এক বৃদ্ধ মনিরার সঙ্গে গায়ে পড়ে আলাপ করতে এসেছিল। কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিল সেদিন, কায়েস– তাই সে বাড়ির সঠিক ঠিকানাও দেয়নি। কিন্তু কে সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক, কি তার পরিচয়? কোথায় থাকে তার কিছুই জানা নেই।
কায়েস হন্যে হয়ে অনুসন্ধান করে চললো– নানাভাবে নানা জায়গায় খোঁজ করতে লাগলো। সে মনিরার। একদিন কায়েস এক হোটেলের সামনে দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে দেখতে পেল। ভদ্রলোক হোটেল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে চেপে বসলো।
.
কায়েস তাড়াতাড়ি আর একখানা গাড়ি ডেকে উঠে বসলো।
ড্রাইভার জিজ্ঞাসা করলো কোথায় যাবেন?
কায়েস ব্যস্ত কণ্ঠে বলল– ঐ যে গাড়িখানা চলে গেল ঐ গাড়িখানাকে অনুসরণ করো।
কায়েসের গাড়ি সামনের গাড়িখানাকে ফলো করে দ্রুত চলতে লাগলো। কায়েস। ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বলল তোমাকে বখশীস দেবো তুমি ঐ গাড়িখানা যেখানে যায় সেখানে আমাকে পৌঁছে দেবে।
ড্রাইভার কায়েসের কথা অনুযায়ী কাজ করলো।
ঝিল শহর অনেক বড়। মস্ত বড় বড় বাড়ি, দালান-কোঠা দোকানপাট, শহরের মধ্যে নানা রকমের পার্ক, খেলার মাঠ, লেক, ঘোড়াদৌড়ের মাঠ স্টুডিও সব রয়েছে। কায়েসের কোনদিকে খেয়াল নেই। সে শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, গাড়িখানা যেন দৃষ্টির আড়ালে চলে না যায়।
কিছু সময় চলার পর হঠাৎ একটা বিরাট পুরোন অট্টালিকার সামনে এসে আগের গাড়িখানা থেমে পড়লো।
কায়েসের গাড়ি এবার বেশ একটু দূরে দাঁড়িয়ে পড়লো। কায়েস পকেট থেকে দশ টাকার। দুখানা নোট বের করে ড্রাইভারের হাতে দিয়ে বলল যাও!
.
কায়েস লুকিয়ে পড়লো সামনের কয়েকটি ঝাউ গাছের আড়ালে। সে আত্মগোপন করে দেখতে লাগলো–সন্দেহজনক কিছু দেখতে পায় কি না। মনিরার অন্তর্ধান ব্যাপারে এ বৃদ্ধের কোন যোগাযোগ নাও থাকতে পারে। তবু ভাল করে সন্ধান নেয়া ভাল। কায়েস বেশ কিছুক্ষণ আড়ালে থাকার পর বেরিয়ে পড়লো, তারপর সোজা এগিয়ে চলল বৃদ্ধা ভদ্রলোকের হলঘরের দিকে। এমন একটা সুন্দর শহরে দশ বছর আগের পুরোন বাড়ি দেখে কিছুটা অবাক হলো সে।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক ততক্ষণে বাড়ির ভেতরে চলে গেছেন।
কায়েস এসে দাঁড়ালো হলঘরের সামনে, অমনি একটি লোক। তার কাছে এসে বলল– আসুন ভেতরে এসে বসুন।
