মাঝে মাঝে নির্জনে বসে চিন্তা করে, বিমর্ষ হয়ে যায় তার মন, অমনি সিন্ধীরাণী এসে হাজির। হয় তার সামনে। নানারকম হাসি-গল্পে ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। কখনও বা স্বচ্ছ বাধের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে দু’জনে সাগরতলের অদ্ভুত মাছ ও জীবের খেলা দেখে। আরও দেখে নানা জাতীয় উদ্ভিদ, ঝিনুক আরও কত কি!
সিন্ধিরাণী মাঝে মাঝে তার সহচরীগণসহ দস্যু বনহুরকে নাচ দেখায়, গান গেয়ে শোনায়। বনহুরের গম্ভীর মুখ দেখেই সিন্ধীরাণীর মন আতঙ্কে শিউরে ওঠে। কেমন করে ওর মুখে হাসি ফোঁটাবে, কেমন করে ওকে খুশি রাখবে, এই চিন্তাই সিন্ধীরাণীকে অস্থির করে তোলে।
এমনি করে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেটে যায়। অস্থির হয়ে পড়ে বনহুর।
সিন্ধীরাণীর কিন্তু আনন্দের সীমা নেই। বনহুরকে পেয়ে সাগরতল তার কাছে স্বর্গের চেয়েও বেশি সুন্দর ও সুখময় হয়ে উঠেছে।
একদিন মায়া সিন্ধীরাণীকে নিরালায় ডেকে বললো– রাণীজী, একি আপনার ঠিক হচ্ছে?
সিন্ধীরাণী ভ্রু কুঁচকে বললো–কোটা?
যাকে আপনি মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছেন সে যে আপনার বন্দী একদিন তাকে আপনি মৃত্যুদণ্ড দিতে চেয়েছিলেন, মনে আছে সে কথা?
আছে। কিন্তু আমি কোনদিন ওকে মৃত্যুদণ্ড দেব না মায়া।
সে আমি জানি। কিন্তু এ কথা মহারাজ যদি জানতে পারেন?
তোরা না বললে সে কিছুতেই জানতে পারবে না।
কিন্তু কত দিন গোপন রাখা সম্ভব হবে রাণীজী? হয়তো একদিন মহারাজ জেনে ফেলবেন।
মায়া তুইতো জানিস আমি ওকে ভালবেসে ফেলেছি। শুধু ভালবাসা নয়, ওকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না।
রাণীজী!
হ্যাঁ মায়া, আমার মন প্রাণ আমি ওকে সঁপে দিয়েছি।
রাণীজী!
এখন তোরাই আমার ভরসা। তোদের হাতেই আমার জীবন। তোরা যদি মহারাজের কাছে কথাটা গোপন রাখতে পারিস তবেই আমি ওকে চিরদিনের জন্য–
এমন সময় বনহুর সেখানে উপস্থিত হয়।
কথা শেষ না করেই থেমে যায় সিন্ধীরাণী।
মায়া নতমস্তকে সেখান থেকে চলে যায়।
বনহুর আড়াল থেকে সিন্ধীরাণীর সব কথাই শুনতে পেয়েছিল, বললো সে– রাণী, তুমি ভুল করছ!
কেন?
কাউকে কোনদিন বিশ্বাস করতে নেই। তুমি চিরদিন আমাকে লুকিয়ে রাখতে পারো না, তা হয় না।
হবে। কেন হবে না?
অসম্ভব।
না, আমি ওসব শুনতে চাই না।
.
ক’দিন হলো এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে মনিরার। শুধু পরিচয় নয় মনিরাকে তিনি মেয়ের মত ভালবাসেন।
সে এক ঘটনা। কায়েসের অনুরোধে একদিন মনিরা ঝিল শহরে একটি সিনেমা হলে ছবি দেখতে গিয়েছিল। ছবি শেষে মনিরা যখন কায়েসের সঙ্গে হল থেকে বেরিয়ে আসছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক মনিরাকে সম্বোধন করে ডাকলেন–একটু শুনবে?
মনিরা থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালো–আমাকে ডাকছেন?
হ্যাঁ।
কায়েস আর মনিরা এগিয়ে গেল।
বৃদ্ধের শরীরে মূল্যবান পোশাক, মুখে একমুখ শুভ্র দাড়ি। মাথায় পাকা চুল, হেসে বললেন– একটু পূর্বে তোমাকে আমি আমার কন্যা বলে ভুল করেছিলাম। তোমার নাম কি মা?
মনিরা একবার কায়েসের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল– আমার নাম মনিরা।
বৃদ্ধের চোখ দুটো আনন্দে চক চক করে উঠলো, হেসে বলল–খুব সুন্দর তোমার নাম। একটু পর রুমালে মুখ মুছলেন বৃদ্ধ।
মনিরা বলল–কি হলো আপনার?
বৃদ্ধ বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন– আজ আমার কন্যা জীবিত থাকলে—
আপনার কন্যা বুঝি মারা গেছে?
হ্যাঁ, আজ বছর হয়ে এলো আমার মা মণি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আবার রুমালে মুখ মুছে বৃদ্ধ।
কয়েকটি লোক, বোধ হয় আত্মীয় হবে বৃদ্ধের পেছনে দাঁড়িয়েছিল, তারা বলল–চলুন, বৃথা শোক করে লাভ নেই।
ওরে তোরা বুঝবিনে, আমার মনের ব্যথা তোরা বুঝবিনে। দাঁড়া, ওকে আর একবার দেখতে দে।
মনিরা বৃদ্ধের ব্যবহারে মুগ্ধ হলো। বৃদ্ধের ব্যথা সে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করল, বলল– আপনি কে?
আমি ঝিন্দের হতভাগা এক নাগরিক। এ দুনিয়ার আমার কেউ নেই। একমাত্র কন্যাকে আমি হারিয়েছি। একটু থেমে বললেন বৃদ্ধ ভদ্রলোক তুমি যদি কিছু না মনে কর,তবে আমি তোমাকে কন্যা বলে মনে করবো।
বৃদ্ধা ভদ্রলোকের কথাবার্তা মনিরার ব্যথা কাতর মনে একটা সান্ত্বনার প্রলেপ এনে দিয়েছে। এ অজানা অচেনা দেশে সে যেন এতদিন পর এক আপনজনের সন্ধান পেল। বলল– নিশ্চয়ই আপনি আমাকে কন্যা বলে মনে করতে পারেন।
অনেক খুশি হলাম তোমার কথা শুনে।
কায়েস বলল– বৌরাণী, রাত বেড়ে যাচ্ছে।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক বলে উঠলেন, হাঁ রাত বেড়ে যাচ্ছে। যাও মা, ঘরে ফিরে যাও,তোমার স্বামী হয়তো রাগ করবেন।
মনিরার চোখদুটো ছল ছল করে উঠলো, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল– আমার অদৃষ্ট মন্দ।
সে কি মা!
হ্যাঁ বাবা আমার স্বামী নেই।
ছিঃ দুঃখ কর না মা। কিন্তু তোমার স্বামী গেছেন কোথায়?
মনিরা বলে উঠলো–তিনি জীবিত নেই।
বৃদ্ধ ভদ্রলোকের ঘোলাটে চোখে যেন একটা বিদ্যুৎ চমকে গেল–চট করে কণ্ঠস্বর মোলায়েম করে নিয়ে বললেন–যে গেছে তার জন্য দুঃখ করে লাভ নেই, কোন লাভ নেই।
কায়েস মনে বেশ বিরক্তি বোধ করছিল, বলল– পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে কথা বলা উচিৎ নয়। বৌরাণী।
বৃদ্ধ লোকটিই বলে উঠলেন– হ্যাঁ, ঠিকই বলছো। আচ্ছা যাও মা। কিন্তু তোমার বাড়ির ঠিকানাটা বললে না তো মা? কোন দিন যদি–
মনিরা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু কায়েস বলে উঠল–ঝিল শহরের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে যে বড় বাড়িটা আছে সেটা।
