ময়না মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো, তারপর বললো আমরা আর চাকরি করবো না।
চাকরি করবি না, কেন?
তোমার সরকারকে সব বলেছি।
কায়েসকে বলেছ তোমরা আর চাকরি করবে না?
হ্যাঁ মা-মনি, আমরা এ বাড়িতে আর চাকরি করবো না।
মনিরা, তখনই কায়েসকে ডেকে পাঠালো।
কায়েস এলো–আমাকে ডেকেছেন বৌরাণী?
বনহুরের অনুচরগণ মনিরাকে বৌরাণী বলে ডাকতো।
মনিরা লক্ষ্য করলো, কায়েস আসতেই ময়না সরে পড়েছে।
মনিরা এবার কায়েসকে লক্ষ্য করে বললো–কায়েস বাড়ির দাস-দাসীরা নাকি এ বাড়িতে আর চাকরি করবে না?
না, ওরা আর চাকরি করতে চাচ্ছে না। তা যাক না, ঝিন্দ শহরে কি লোকের অভাব আছে? নতুন দাস-দাসী জোগাড় করে নেব।
কিন্তু ওরা চলে যাবে কেন?
মাথা চুলকায় কায়েস– একটা কথা—
কি কথা বলো?
থাক, নাইবা শুনলেন বৌরাণী?
না, বলতেই হবে তোমাকে।
হাতে হাত কচলে বলল কায়েস–ওরা আপনাকে সন্দেহ করছে বৌরাণী।
সন্দেহ! আমাকে?
হ্যাঁ।
কেন?
আপনার পেটে বাচ্চা এসেছে, তাই।
আমার পেটে বাচ্চা।
হ্যাঁ বৌরাণী। তাই ওরা–কথা শেষ না করে মাথা নিচু করে আনন্দের হাসি হাসে কায়েস।
কে বলল তোমাকে এ কথা? রাগত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো মনিরা।
কায়েস পূর্বের ন্যায় মাথা নীচু করে জবাব দিল ডাক্তার বাবু বলেছিলেন।
ডাক্তার বাবু!
হ্যাঁ।
মনিরা ধীরে ধীরে দৃষ্টি নিচু করে নিল। একটা দুঃখ বেদনা আনন্দ ভরা লজ্জা তার মুখমণ্ডল ছেয়ে গেল। কায়েসের দিকে মুখ তুলে চাইতে পারলো না। হাজার হলেও প্রথম মেয়েদের একটা লজ্জার সময়।
কায়েস একটু হেসে চলে যাচ্ছিল, মনিরা পিছু ডাকলো–শোন।
কায়েস থমকে দাঁড়ালো।
মনিরা বললো–কায়েস, তুমিও কি আমাকে কোন রকম সন্দেহ করছ?
কায়েস দু’হাতে কান ধরে জিভ কাটলো–ছিঃ ছিঃ ছিঃ।
কায়েস!
বৌরাণী!
কি করবো বলো? সবাই যখন আমাকে ভুল বুঝছে তখন আমার কি কর্তব্য বলো? দুদিন পর হোক দু’বছর পর হোক যখন দেশে ফিরে যাব, তখনও লোক সমাজ আমাকে এমনি সন্দেহের চোখে দেখবে। আমি আত্মহত্যা করবো কায়েস আত্মহত্যা করবো।
বৌরাণী, এমন কাজ করবেন না যেন, এমন কাজ করবেন না! ডাক্তারের কথায় আমার কি যে আনন্দ হয়েছে, তা খোদা জানেন। আমি ডাক্তার বাবুকে পাঁচশ টাকা বখশীস দিয়েছি।
কায়েস, সে চলে গেছে, কেন সে তার স্মৃতি রেখে গেল? কেনো সে আমাকে মরতে দিল না।
বৌরাণী মরবো বললেই কি মরা যায়? দুনিয়ার সবাই সন্দেহ করুক, সবাই অবিশ্বাস করুক, কিন্তু সেই দয়াময় জানেন সব, তিনিই আপনার মান ইজ্জত রক্ষা করবেন। চলে যাক আজই দাস-দাসী সব চলে যাক, আমি নিজে সব করবো।
কায়েস!
হ্যাঁ বৌরাণী, আপনি আমার ওপর ভরসা রাখবেন।
.
আর কত দিন তুমি আমায় লুকিয়ে রাখবে সিন্ধীরাণী?
যত দিন শয়তান মহারাজার হাত থেকে পরিত্রাণ না পাব। কেন? তোমার কি কোন কষ্ট হচ্ছে দস্যুসম্রাট?
কষ্ট হচ্ছে না, কিন্তু—
বলো কিন্তু কি?
আমার তো কাজ আছে।
তা আছে, কিন্তু আমি যদি কোনদিন তোমাকে ছেড়ে না দেই?
তাহলে আমি নাচার সিন্ধীরাণী। আচ্ছা, তোমার সে মহারাজ আর আসছে না কেন?
আমিও সেই কথা ভাবছি। তবে না আসাই তোমার পক্ষে মঙ্গল।
কিন্তু—
আবার কিন্তু কি দস্যুসম্রাট?
তাকে যে আমার প্রয়োজন। বনহুর আনমনা হয়ে যায়, কারণ আজ কত নিরুপায় হয়ে তবেই না বনহুর এই সাগরতলে দিন কাটাচ্ছে। এখন মহারাজনামী শয়তান একবার এলে হয়, দেখে নেবে সে তাকে।
কিন্তু সেই যে মহারাজ সিন্ধীরাণীকে শাসিয়ে রেখে গেছে, তারপর আর আসেনি। হয়তো কোন রহস্যপূর্ণ ব্যাপারে আটকা পড়ে গেছে। এবার এলে বনহুরের হাতে তার নিস্তার নেই।
সিন্ধীরাণী বিস্ময়ভরা গলায় বলল ঐ শয়তানকে তোমার প্রয়োজন?
হ্যাঁ।
কেন?
শুনেছি সে না এলে এখান থেকে বের হবার কোন উপায় নেই।
হ্যাঁ, সে কথা সত্য, মহারাজ না এলে বা সে ঐ মোটর বোটখানা না পাঠালে এই সাগরতল থেকে বের হবার কোন উপায় নেই।
সে জন্যই তো তাকে আমার দরকার সিন্ধীরাণী।
কিন্তু আমি তোমায় যেতে দেব না দস্যুসম্রাট। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না—
সিন্ধীরাণী তার সুকোমল বাহু দু’টি দিয়ে দস্যু বনহুরের গলা জড়িয়ে ধরলো–বলো, তুমি আমায় ছেড়ে আর চলে যাবে না।
সিন্ধীরাণীর মায়াময় দুটি চোখে আবেগভরা চাহনি। রক্তাক্ত গণ্ডদ্বয় আরও রাঙা হয়ে উঠেছে। ঠোঁট দু’খানা মৃদু কেঁপে ওঠে। বনহুরের দক্ষিণ হাতখানা মুঠোয় চেপে ধরে বললো, তুমি আমাকে একা ফেলে আর চলে যাবে না?
বনহুরের মুখে একটা ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠে মিলিয়ে যায়, গম্ভীর গলায় বলে, দস্যু বনহুরকে তুমি বন্দী করতে চাও?
হ্যাঁ, আমার হৃদয় কারাগারে।
উঁহু, লৌহ কারাগার যাকে আটক রাখতে সক্ষম হয় নি, তাকে তুমি হৃদয় কারাগারে আটকে রাখতে সক্ষম হবে না সিন্ধীরাণী।
ওকথা বলো না দম্রাট। লৌহ কারাগার তোমাকে বন্দী করে রাখতে না পারলেও আমি তোমাকে বন্দী করব। কিছুতেই তুমি আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারবে না।
বনহুর সাগরতলে অসহায় এক শিশুর মতই নিরুপায় হয়ে দিন কাটাতে লাগলো। কি করবে। সে, গভীর সাগরতলায় তার কোন শক্তি বা বুদ্ধি কাজে আসছে না। তবু বনহুর সব সময় নানাভাবে উপায় অন্বেষণ করে, কিভাবে এখান থেকে বের হওয়া যায়। চির-চঞ্চল বনহুর শান্ত সুবোধ বালকের মত কি আর দিন কাটাতে পারে?
